ইসলামী শিক্ষার সঙ্গে সাধারণ শিক্ষার সমন্বয়ে আলোকিত মানুষ তৈরির লক্ষ্য নিয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল। অথচ ছাত্র সংগঠনগু ো। এতে সেশনজটে পড়তে হয়েছে। সাধারণ ঘটনা থেকে সংঘর্ষ, ব্যক্তি স্বার্থ আদায়ে আন্দোলনের নামে ভাংচুর, জালাও-পোড়াওয়ের মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়েরই এক শ্রেণীর শিক্ষার্থী।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ভর্তি-বাণিজ্য, শিক্ষকদের ওপর হামলা, ছাত্র গুম, অধিকার আদায়ে আন্দোলনরত ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর সন্ত্রাসী হামলা, ছাত্র শিবির-ছাত্রদল সংঘর্ষ, ছাত্রলীগ-পুলিশ সংঘর্ষ, আবাসিক হলে গণলুট, বোমাবাজি, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সম্পদ ভাংচুর, অগ্নিসংযোগসহ নানা কারণে বারবার সংবাদপত্রের প্রধান শিরোনাম হয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়।
সর্বশেষ গত ৩০ নভেম্বর বাস চাপায় ছাত্র মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিস্থিতি সামাল দিতে ক্যাম্পাস অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। অথচ প্রথম বর্ষে ভর্তি পরীক্ষা শেষ হয়েছে। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের সাক্ষাত্কার হবার কথা ছিল ৮ ডিসেম্বর। এটি পিছিয়ে ১১ ডিসেম্বর পুনঃনির্ধারণ করা হয়েছে। এই তারিখেও পরীক্ষা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এরই মধ্যে গত ৪ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নতুন কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে আবারো আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। নতুন কমিটিতে পদ না পেয়ে বিক্ষুব্ধরা এ কাণ্ড ঘটায়।
তবে ৩০ নভেম্বর শিক্ষার্থী মৃত্যুর ঘটনায় নজিরবিহীন ধ্বংসযজ্ঞ ঘটানো হয় ক্যাম্পাসে। ৩৫টি বাসে আগুন দিয়ে সম্পূর্ণ ভস্মীভূতসহ আরো অন্তত ১৫টি বাস ও মিনিবাস ভাংচুর করা হয়। সেই সাথে সমগ্র ক্যাম্পাস জুড়ে বিভিন্ন অফিস ও স্থাপনা ভাংচুরসহ ক্যাম্পাসের লাইটিং ব্যবস্থা পর্যন্ত নষ্ট করা হয়েছে।
এর আগে গত ২৪ আগস্ট শিবির ক্যাম্পাসে মিছিল করার কারণে ছাত্রলীগ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে বিভিন্ন অফিস ও ভিসির বাসভবন ভাংচুর করে। এতে বাধা দেয়ার কারণে পুলিশের উপর নেতা-কর্মীরা চড়াও হয়। সেসময় আবাসিক হলসহ ১৫ দিনের জন্য ক্যাম্পাস বন্ধ ঘোষণা করে প্রশাসন। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস-পরীক্ষা ব্যাহত হয়।
প্রসঙ্গত, ১৯৭৯ সালের ২২ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়টির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। তবে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৮৬ সাল থেকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম ব্যাচের ছাত্র ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শাহজাহান আলম সাজু বলেন, নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় অশান্ত থাকছে। যা দুঃখজনক। আমরাও আন্দোলন করেছি। সে আন্দোলন শান্ত ছিল; কিন্তু এখনকার আন্দোলনের নামে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কেউ সহ্য করবে না। তিনি বলেন, দক্ষ নেতৃত্ব থাকলে বিশ্ববিদ্যালয় স্বাভাবিকভাবে চলতে পারে; কিন্তু আমার মনে হয় বিশ্ববিদ্যালয়টিতে দক্ষ নেতৃত্ব নেই।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বছরজুড়েই এই বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছে নানামুখী অস্থিরতা। ছাত্র সংগঠনগুলোর কোন ধরনের তত্পরতা দেখলেই সাধারণ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা আতঙ্কে ভোগেন। ভিসি ও প্রো-ভিসির মধ্যে সৃষ্ট ক্ষমতার দ্বন্দ্বে শিক্ষক-কর্মকর্তারাও অসহায়। এ পর্যন্ত একটি পরিস্থিতিও সামাল দিতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
গত বছরের (২০১৩ সাল) ৮ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে অন্তত ৫০ জন আহত হন। এ ঘটনায় ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে পুলিশের অস্ত্র কেড়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। একই বছরের ১২ জানুয়ারি ছাত্রলীগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে ক্লাস-পরীক্ষা চালুর দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ভবনের সামনে গণঅনশন করে এবং একই সাথে বিশ্ববিদ্যালয় মেইন গেটের সামনে কুষ্টিয়া-খুলনা মহাসড়ক অবরোধ করে। এতে ক্যাম্পাসে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। সে সময় ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা শিক্ষক লাউঞ্জে অবস্থানরত শিক্ষকদের উপর সশস্ত্র হামলাও চালায়। এতে ৩০ শিক্ষক আহত হন।
২০১২ সাল ছিল ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলন ও সংঘর্ষের বছর। এবছর নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগে ভিসি, প্রো-ভিসির বিরুদ্ধে আন্দোলনে ক্যাম্পাস বন্ধ থাকে অন্তত ছয় মাস। শিক্ষকদের অবস্থান কর্মসূচিতে হামলা চালায় ছাত্রলীগ। এতে ৩ সাংবাদিকসহ অন্তত: ৩৫ শিক্ষক-কর্মকর্তা আহত হন।
২০১১ সালের আগস্টে হল গেটে পোস্টার লাগানোকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগ ও শিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে ৫০ নেতা-কর্মী আহত হন। এরপর ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা দুটি হলে ব্যাপক ভাংচুর ও লুটপাট করে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় দুই মাস বন্ধ ছিল। একই বছর অক্টোবর মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের লালন শাহ হলের ডাইনিং ম্যানেজার নিয়োগকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগ ও শিবিরের মারামারির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায়ও হলসহ ক্যাম্পাস এক সপ্তাহ বন্ধ থাকে ।
২০১০ সালের ৮ জুলাই আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দু’গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে জড়িত অভিযোগে পুলিশ ৩ ছাত্রলীগ নেতাসহ ৬ জনকে আটক করে। নেতাদের গ্রেফতারের প্রতিবাদে একটি গ্রুপ কুষ্টিয়া-খুলনা মহাসড়ক অবরোধ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি আটকে দেয়। সংবাদ পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছলে পুলিশ-ছাত্রলীগ ও এলাকাবাসীর মধ্যে ত্রিমুখী সংঘর্ষ হয়। এসময় পুলিশের এসআইসহ আহত হন ১০ জন।
একই বছরের ২২ জুলাই তিন দফা দাবিতে ছাত্রলীগের একাংশের বাস অবরোধে অচল হয়ে পড়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। ছাত্রলীগের নবগঠিত কমিটি বাতিল, প্রক্টরের পদত্যাগ ও গ্রেফতারকৃত নেতাকর্মীদের মুক্তির দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি বাসের চাবি ছিনিয়ে নেয় আন্দোলনরত নেতাকর্মীরা। তারা হামলা চালিয়ে তিনটি বাস ভাংচুর করে। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা শিক্ষকদেরও লাঞ্ছিত করে। এ ঘটনায় বেশ কিছু দিন ক্লাস-পরীক্ষা ব্যাহত হয়। এভাবে পর্যায়ক্রমে বাড়তে থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজট।
এসব ব্যাপারে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক আবদুল হাকিম সরকার বলেন, এ বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু দুষ্কৃতিকারী রয়েছে। যারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ফায়দা হাসিলের জন্য সাধারণ শিক্ষার্থীদের আবেগকে কাজে লাগিয়ে এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে। বিষয়টি আমরা অবগত। কিভাবে এই সমস্যার দ্রুত সমাধান করা যায়, সে বিষয়ে কাজ করছি বলে দাবি করেন ভিসি।
