রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) সমাজ বিজ্ঞানের অধ্যাপক একেএম শফিউল ইসলাম লিলন (৫০) হত্যা মামলার তদন্ত ঝিমিয়ে পড়েছে। ২৮ দিনেও হত্যার ক্লু ও খুনিদের বিষয়ে কোনো সুখবর নেই। বরং তদন্তে পুলিশের নির্লিপ্ত আচরণে হতাশ রাবির শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। তদন্তে গাফিলতির অভিযোগে রাবি শিক্ষক সমিতি শনিবার সকাল ১০টা থেকে ১২টা পর্যন্ত কর্মবিরতি পালন করবেন। হত্যার ক্লু এবং খুনিরা চিহ্নিত না হওয়ায় ক্ষুব্ধ সমাজবিজ্ঞান বিভাগ ও প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ। এদিকে শফিউল হত্যার সাড়ে ৩ ঘণ্টা পর ফেসবুকে দায় স্বীকারকারী জামায়াত-শিবির নিয়ন্ত্রিত জঙ্গী সংগঠন ‘আনসার আল ইসলাম বাংলাদেশ-২ এর প্রধানকে সনাক্তের দাবি সত্ত্বেও পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে পারেনি। অন্যদিকে র্যাবের হাতে আটকদের তথ্যানুযায়ী হত্যার মদতদাতা আনোয়ার হোসেন উজ্জল, রাবির হিসাব শাখার সেকশন অফিসার নাসরিন আকতার ও তার স্বামীর ঘনিষ্ট সহযোগী জামাই বাবুও পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে।
প্রসঙ্গত, গত ১৫ নবেম্বর বিকেলে নগরীর চৌদ্দপাই এলাকায় দুর্বৃত্তের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে লালনভক্ত অধ্যাপক শফিউল খুন হন। হত্যাকারিদের গ্রেফতারে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেন।
জানা যায়, শফিউল হত্যার বিষয়ে পুলিশ ও র্যাব প্রথমে দুই ধরনের বক্তব্য দেয়। আদালতে ১১ জনের পুলিশ রিমান্ডের শুনানীতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘এই হত্যায় জামায়াত-শিবির নিয়ন্ত্রিত জঙ্গিরা জড়িত।’ এরপর ঢাকা ও রাজশাহী থেকে আটক ছয় যুবদল নেতাকর্মীকে প্রধান কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সামনে হাজির করে র্যাব কর্মকর্তারা বলেন, ‘ব্যক্তিগত অপমানের জের ধরে অধ্যাপক শফিউলকে যুবদল নেতা আরিফুল ইসলাম মানিক, আব্দুস সালাম পিন্টু, কর্মী সবুজ শেখ, আল মামুন, সিরাজুল ইসলাম কালু, অটোচালক ইব্রাহিম খলিল টোকাই বাবুসহ ১১ জনে মিলে হত্যা করেছে।’এ সময় তারা অধ্যাপক শফিউল হত্যায় জড়িত বলে সাংবাদিকদের কাছে স্বীকার করেন। পরদিন রাজশাহী মেট্টোপলিটন পুলিশ (আরএমপি) কমিশনার মোহাম্মদ শামসুদ্দিন নিজ কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে শফিউল হত্যায় জামায়াত-শিবির নিয়ন্ত্রিত জঙ্গিরা জড়িত বলে ইঙ্গিত দেন। তবে তিনি র্যাবের সঙ্গে সরাসরি একমত কিংবা ভিন্নমত পোষণ করেননি। অবশ্য একদিন পরেই আরেক প্রেসব্রিফিংয়ে র্যাবের উপস্থাপিত কারণ সামনে রেখেই তদন্ত এগিয়ে নেয়ার কথা বলেন আরএমপি কমিশনার।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, যুবদল নেতা আব্দুস সালাম পিন্টুর স্ত্রী নাসরিন আকতারের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন অধ্যাপক শফিউল। এতে ক্ষুদ্ধ পিন্টু শফিউলের সঙ্গে কথা বলেন। তখন তার (পিন্টু) সঙ্গেও খারাপ আচরণ করেন শফিউল। পরে পিন্টু তার ঘনিষ্ঠ যুবদল নেতা আনোয়ার হোসেন উজ্জলকে নিয়ে অধ্যাপক শফিউলের সঙ্গে দেখা করেন। কিন্তু উজ্জলের সঙ্গেও তিনি খারাপ আচরণ করেন। এতে ক্ষুদ্ধ হয়ে তারা প্রতিশোধ নেয়ার পরিকল্পনা করেন। এ জন্য কাটাখালির যুবদল নেতা মানিককে ভাড়া করা হয়। ঘটনার পর উজ্জল, নাসরিন ও পিন্টুর ঘনিষ্ট জামাইবাবু আত্মগোপন করে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, নাসরিন আকতার নগরীর বুধপাড়ার বাসিন্দা ও রাবির গার্ড শামসুল আলম কাবিলের মেয়ে। ১০/১২ বছর আগে ডাসমারি চরপাড়ার আব্দুস সালাম পিন্টুর সঙ্গে নাসরিনের প্রেমের সূত্রে বিয়ে হয়। স্বামীর পরিচয়ে নাসরিন ২০০৪ সালে রাবিতে ৫৪৬ কর্মচারী গণনিয়োগের সময় হিসাব শাখায় চাকরি পান। তিনি পরিবহণ ও স্টুয়ার্ড শাখার সহায়ক ও সাধারণ কর্মচারীদের বেতন বিল তৈরি করেন। এ সম্পর্কে রাবির হিসাব পরিচালক আশরাফ-উল-হুদা বলেন, ‘অধ্যাপক শফিউল হত্যায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠার পর নাসরিন অফিসে অনুপস্থিত। তিনি প্রথমে নৈমিত্তিক, পরে অর্জিত ছুটির আবেদন ডেসপাসের মাধ্যমে পাঠান।’ কথিত অপমান সম্পর্কে হিসাব পরিচালক বলেন, ‘অধ্যাপক শফিউলের সঙ্গে নাসরিনের অফিসিয়ালি সম্পর্ক আমার জানা নেই। এখান থেকে শিক্ষকের সঙ্গে ঝামেলার সুযোগ কম। তবে যদি ব্যক্তিগত সম্পর্ক থেকে ঝামেলা হয়, তা অফিসের কারও জানার কথা নয়।’বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক এম এন্তাজুল হক বলেন, ‘নাসরিনের ছুটি কার্যকর না হলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’নাসরিনের চাচা এ্যাকাডেমিক শাখার সহকারী রেজিস্ট্রার রাব্বেল হোসেন বলেন, ‘নাসরিন আমার ভাইয়ের মেয়ে। সে কোথায়, কিভাবে আছে জানি না।‘ তবে শ্বশুরবাড়ির লোকজনের নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা। নিহত অধ্যাপকের সঙ্গে আমাদের ও তার শ্বশুর পরিবারের কোনো সম্পর্ক নেই।’
আরএমপির মুখপাত্র ইফতে খায়ের আলম বলেন, রিমান্ডে আসামীদের তথ্য পর্যালোচনা করা হচ্ছে। ফেসবুকে হত্যার দায় স্বীকার করে স্ট্যাটাস দেওয়া ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া গেছে। পলাতক ওই ব্যক্তিকে ধরতে পুলিশী অভিযান চলছে। ওই ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ায় জড়িত বগুড়ার জামায়াত কর্মী শরিফুল ইসলাম (২৮) ও ছাত্রশিবির কর্মী রায়হানুল ইসলাম স্বাধীনকে (১৮) গ্রেফতার করা হয়েছে। এছাড়া গ্রেফতারকৃত যুবদল নেতা মানিক, সবুজ, মামুন, টোকাইবাবু, সাগর, আরিফুল, জিন্নাত কাটাখালি, মির্জাপুর, ডাশমারি এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী। তারাই শিবিরের ক্যাডার ভিত্তিক অপারেশনের দায়িত্ব পালন করে। টাকার বিনিময়ে তারা যেকোনো কাজ করতে পারে বলে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে বিস্তারিত বলা যাবে না।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও মতিহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলমগীর হোসেন বলেন, ‘মামলা তদন্তে পুলিশের কোনো গাফিলতি নেই। পুলিশ সর্বাধিক গুরুত্ব সহকারে মামলাটি তদন্ত করছে। আটক ১৯ জন হত্যার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। পুলিশের হাতে আটক তিন এবং র্যাবের হাতে আটক ছয়জন হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকারও করেছে। তাদের আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি রেকর্ডের জন্য পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু তারা শেষ পর্যন্ত আদালতে স্বীকারোক্তি দেয়নি। অধ্যাপক শফিউলের মোবাইলের তথ্য সম্পর্কে তিনি কোনো কথা বলতেই রাজি হননি। অধ্যাপক শফিউলের বাসা থেকে উদ্ধারকৃত ছাত্রী রওশনারা সোনামণি ও তার বন্ধু জাহাঙ্গীরের হত্যায় সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। অধ্যাপকের সঙ্গে সোনামণির পারিবারিক সম্পর্ক ছিলো। তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। যুবদল নেতা উজ্জল, জামাইবাবু ও নাসরিনকে পেলে তদন্ত এগিয়ে যাবে।
