ছড়িয়ে পড়া তেল সরাতে স্থানীয়রাই ভরসা

আপডেট : ১৩ ডিসেম্বর ২০১৪, ০০:৩৯

সুন্দরবনের শেলা নদীতে ছড়িয়ে পড়া তেলের কারণে ঐ এলাকার জলজক্ষেত্র ও পরিবেশগত ক্ষতি নিরূপণে ঢাকা থেকে একটি বিশেষজ্ঞদল সুন্দরবনে গেছে। তারা ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে কাজ করবেন। নদীতে ভেসে থাকা তেল সরিয়ে নিতে এখন পর্যন্ত স্থানীয় লোকজনের উপর ভরসা করছে সরকার। ইতিমধ্যে স্থানীয় জনগণ হাঁড়ি, বালতি, গামলা নিয়ে তেল সংগ্রহ করছে। সংগ্রহ করা তেল গতকাল শুক্রবার থেকে রাষ্ট্রীয় তেল সংস্থা পদ্মা প্রতি লিটার ৩০ টাকা দরে কিনছে। তেল কেনার জন্য ৪টি বুথও খোলা হয়েছে সেখানে। তবে রাসায়নিক পদ্ধতিতে তেল অপসারণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলেও সুন্দরবনের ক্ষয়ক্ষতির কথা বিবেচনা করে আপতত তা স্থগিত রাখা হয়েছে।

কর্মকর্তারা বলেছেন, স্থানীয় জনগণের সাহায্যে পুরনো পদ্ধতিতে তেল যতটা সম্ভব সরানো হবে, তারপর বাকি তেলের কার্যকারিতা নষ্ট করতে নদীতে জাহাজ দিয়ে স্প্রে করা হবে। কর্মকর্তারা বলেছেন, ডুবে যাওয়া ট্যাংকারটিকে তিনদিন পর উদ্ধার করা হলেও নদীতে ৬০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে তেল ছড়িয়ে থাকার বিষয়টিই ডলফিনসহ জলজ প্রাণী এবং সুন্দরবনের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে।
খুলনা অফিস  থেকে রেজাউল করিম জানান, সুন্দরবনে ছড়িয়ে পড়া ফার্নেস অয়েল এখন থালা-বাসন, ফোম ও কলাপাতা দিয়ে সনাতন পদ্ধতিতে অপসারণের কাজ শুক্রবার সকাল থেকে শুরু হয়েছে। সুন্দরবন সন্নিহিত লোকালয়ের মানুষ ও জেলে-বনজীবীরা এভাবেই শেলা নদীসহ বিভিন্ন খাল থেকে তেল অপসারণের কাজ শুরু করেছে। বৃহস্পতিবার বিকালে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বন সংলগ্ন লোকালয়ে মাইকিং করে ভাসমান তেল তুলে নেয়ার আহবান জানানোর পর গতকাল শুক্রবার এই কাজ শুরু হয়। ভাসমান তেল সুন্দরবনে ছড়িয়ে পড়া রোধে ও তেল তোলার সুবিধার জন্য জোয়ারের সময় খালগুলোতে ফার্নেস অয়েল যাতে বের হতে না পারে সে জন্য বৃহস্পতিবারই  খালগুলোর মুখে নেট দিয়ে ব্যরিকেড দেয়া হয়।
বিআইডব্লিউটিএ’র জাহাজ ‘কান্ডারি-১০’ এসে পৌঁছালেও সেটি এখনো রাসায়নিক ছিটানোর কাজ শুরু করেনি। তারা পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতির অপেক্ষায় রয়েছে। এব্যাপারে  এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মু.শুকুর আলী। আপাতত ডিসপারসেন্ট ফোম কেমিক্যাল ছিটানোর কাজ বন্ধ রয়েছে।
এবিষয়ে পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের ডিএফও আমির হোসাইন চৌধুরী জানান, কোন অবস্থায়ই সুন্দরবনের ভাসমান তেল আপসারণে রাসায়নিক কেমিক্যাল ফোম ব্যবহার করা হবে না। রাসায়নিক কেমিক্যাল ফোম ব্যবহার করলে ডলফিনসহ জলজ প্রাণী ও সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য আরো অনেক বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মতামত দিয়েছেন। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় এ বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে দেখছে। মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের হারবার মাস্টার কে এম আকতারুজ্জামান জানান, ডুবে যাওয়া ট্যাংকারে ছিল প্রায় সাড়ে তিন লাখ লিটার ফার্নেস অয়েল। জাহাজ ‘কান্ডারি’তে মাত্র ১০ হাজার লিটার তেলের তেজস্ক্রিয়তা কমানোর মতো রাসায়নিক রয়েছে।
বন বিশেষজ্ঞদের মতে, তেলের কারণে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির স্বীকার হতে পারে ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন। আর  জোয়ার-ভাটার প্রভাবে ফার্নেস অয়েল পানিতে দ্রবিভূত অক্সিজেন হ্রাস পেয়ে সেখানকার জলজ প্রাণীর জীবনকে সংকটাপন্ন করে তুলেছে। এছাড়া নদী তীরবর্তী এলাকায় গুল্ম ও উদ্ভিদের শ্বাসমূল ভারী ফার্নেস অয়েলে জড়িয়ে যাচ্ছে। যদিও ঠিক এ মুহূর্তেই উদ্ভিদ জগতের ক্ষতির বিষয়টি চোখে পড়বে না। তবে ১৫/২০ দিনের পর গুল্ম গুচ্ছ ও উদ্ভিদদের রং বিবর্ণ হয়ে মারা যেতে পারে বলে তারা  উদ্বিগ্ন।
সুন্দরবন বিষয়ে অভিজ্ঞ পরিবেশবিদ ড: শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, সুন্দরবনের ব্যাপক এলাকা জুড়ে তেল ছড়িয়ে পড়ায় পানিতে দ্রবিভূত অক্সিজেন স্বাভাবিকভাবেই কমে গেছে। এ কারণে ডলফিনসহ অন্য প্রাণীকূল ক্ষতিতে পড়তে বাধ্য। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সেখানকার নদীতে থাকা ডলফিন যদি অনত্র্য সরে গিয়ে থাকতে পারে তবে এ ধরনের হুমকি থেকে নিজেরাই তাদের রক্ষা করতে সক্ষম হবে। বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবকে প্রধান করে গঠিত ৯ সদস্যের উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি শুক্রবার দুপুরে ঘটনাস্থল সুন্দরবন পরিদর্শন করেছেন। পরিদর্শনকালে তদন্ত কমিটির কোন সদস্য সাংবাদিকদের কাছে মতামত ব্যক্ত করেননি। এই কমিটি আগামী  ১৫ দিনের মধ্যে মন্ত্রণালয়ে তাদের রিপোর্ট পেশ করবে।
বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবনের শেলা নদীর চাঁদপাই রেঞ্জের মালবাহী জাহাজের ধাক্কায় ‘ওটি সাউদার্ন স্টার সেভেন’ নামে একটি ট্যাংকার মঙ্গলবার ভোরে ডুবে যায়। ট্যাংকারটি গোপালগঞ্জের একটি বিদ্যুেকন্দ্রের জন্য খুলনার পদ্মা অয়েল ডিপো থেকে ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৬৬৮ লিটার ফার্নেস অয়েল নিয়ে যাচ্ছিল।
হুমকিতে সুন্দরবনের প্রাণবৈচিত্র্য
বিশ্বের সর্ববৃহত্ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ও বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের প্রাণবৈচিত্র্য বিপন্ন হয়ে পড়ছে। জলবায়ুর পরিবর্তন, দূষণ, সচেতনতার অভাব ও সরকারের অবহেলায় এ বন থেকে একের পর এক হারিয়ে যাচ্ছে নানা প্রাণী।
একসময় প্রায় ৪০০ প্রজাতির পাখির বসবাস ছিল সুন্দরবনে। কালের বিবর্তনে তা এসে ঠেকেছে ২৭০ প্রজাতিতে। বিলুপ্ত হয়ে গেছে প্রায় ১৩০ প্রজাতির পাখি। বাংলাদেশ অংশে সুন্দরবনের প্রায় ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ১ হাজার ৮৭৪ বর্গকিলোমিটারই জলভাগ। এই বিস্তীর্ণ নদী-খালে রয়েছে প্রায় ১২০ প্রজাতির মাছ। শেলা নদীতে তেল বোঝাই ট্যাংকার ডুবির ঘটনায় ইরাবতী, বোতলনাক, গাঙ্গেয় ইন্দো-প্যাসিফিক হাম্পব্যাক, প্যানট্রপিক্যাল স্পটেড প্রজাতির ডলফিন বিলুপ্তির হুমকিতে পড়েছে।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ অংশে সুন্দরবনের গর্ব ডোরাকাটা রয়েল বেঙ্গল টাইগার আছে মাত্র ৪৪০টি। এর মধ্যে পুরুষ বাঘের সংখ্যা ১২১টি, নারী বাঘ ২৯৮টি ও শিশু ২১টি। ২০ বছর আগেও এর সংখ্যা ছিল ৮০০’র কাছাকাছি। 
সমীক্ষায় দেখা গেছে, ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশে বাঘ ছিল প্রায় ৪০ হাজার। এর অর্ধেকের বেশি ছিল সুন্দরবন এলাকায়। সুন্দরবনের অধিকাংশ গাছই চিরসবুজ ম্যানগ্রোভ শ্রেণীর|এই বনে ৩৩৪ প্রজাতির উদ্ভিদ আছে যার মধ্যে ১৭টি ফার্ন জাতীয়, ৮৭টি একবীজপত্রী ও ২৩০ প্রজাতি দ্বিবীজপত্রী? বিশ্বের সর্ববৃহত্ ম্যানগ্রোভ বা নোনা পানির বন হিসেবে ১৯৯৭ সালে সুন্দরবনকে ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ’ বা বিশ্ব ঐতিহ্য ঘোষণা করে জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেস্কো। পৃথিবী জুড়ে যে ৫০ প্রজাতির প্রকৃত ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ আছে, তার ৩৫ প্রজাতিই পাওয়া যায় সুন্দরবনে?সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, অবৈধ বসতি স্থাপন ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে গাছ কাটার কারণে ৩৭ বছরে সুন্দরবনের আয়তন কমেছে ১৪৪ বর্গকিলোমিটার। বনের সৌন্দর্যের প্রতীক সুন্দরী গাছ কমে গেছে ২৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
বন কর্মকর্তাদের ছুটি স্থগিত

এদিকে খুলনা অঞ্চলে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সকল কর্মকর্তার ছুটি অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। পরিবেশ অধিদফতরে শুক্রবার বিকালে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বৈঠকে সভাপতিত্বকারী পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব রাকিবুর রহমান  বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।