তেল সংগ্রহে হাজারো মানুষ

আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০১৪, ২৩:৪৯

সুন্দর বনের শেলা নদীতে ফার্নেস অয়েলসহ ডুবে যাওয়া ট্যাংকার সাউদার্ন স্টার সেভেনের নিখোঁজ মাস্টার মোখলেসুর রহমানের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। গতকাল রবিবার সকাল ছয়টার দিকে সুন্দর বনের মৃগামারী খাল থেকে তার বিকৃত লাশ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার পাঁচ দিন পর তার মৃতদেহ পাওয়া গেল। মোখলেসুর রহমানের বাড়ি বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার লক্ষ্মীপাশা গ্রামে। তার বাবার নাম উজ্জত আলী।

পুলিশ জানায়, মোকসেদের একটি পা ভাঙ্গা ও মুখে আঘাতের চিহ্ন ছিল। পুলিশের ধারণা দুর্ঘটনার সময় বড় ধরনের আঘাতে তার মৃত্যু হয়। মংলা থানার ওসি বেলায়েত হোসেন জানান, স্থানীয় জেলেরা লাশ ভাসতে দেখে বন বিভাগ ও পুলিশকে খবর দেয়। পরে তারা মৃগামারী খাল থেকে লাশ উদ্ধার করে। লাশ উদ্ধারের সময় মোখলেছুর রহমানের ভাই উপস্থিত ছিলেন। তিনি অনেকটা বিকৃত হয়ে যাওয়া লাশটিকে তার ভাই এবং ডুবে যাওয়া ট্যাঙ্কারের মাস্টার বলে শনাক্ত করেন।
এমভি টোটাল নামে একটি ট্যাংকারের ধাক্কায় গত মঙ্গলবার সকালে এমটি সাউদার্ন স্টার সেভেন ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৬৬৪ লিটার ফার্নেস অয়েলসহ ডুবে যায়। এরপর থেকেই মাস্টার মোখলেসুর রহমান নিখোঁজ ছিলেন।
এদিকে অয়েল ট্যাঙ্কার ডুবির পর পূর্ব সুন্দও বনের  বিস্তীর্ণ এলাকার নদী-খাল থেকে তেল অপসারণে স্থানীয়দের পাশাপাশি বন বিভাগের উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) আমীর হোসাইন জানান, বনের নদী-খাল থেকে তেল অপসারণে শনিবার সকাল থেকে দৈনিক ভিত্তিতে বন বিভাগের ২শ’ শ্রমিকসহ বন সংলগ্ন হাজারো মানুষ নিজেদের উদ্যোগে তেল সংগ্রহের কাজ শুরু করেছে। কয়েশ’ নৌকা-ট্রলার নিয়ে তারা শেলা নদী সংলগ্ন বনের ছোট-বড়  নদী ও খাল থেকে তেল এবং তেল লেগে থাকা কচুরিপানা, ডাল-পালা সংগ্রহ করছে। শ্রমিক ও সাধারণ জনতা চাঁদপাই রেঞ্জের জয়মণি থেকে হরিণটানা পর্যন্ত কচুরিপানা, গাছের ডালপালা এবং নদীর বিভিন্ন ময়লা-আবর্জনায় যেসব তেল জড়িয়ে আছে সেগুলো অপসারণের কাজও করছে। এছাড়া জোয়ারের সময় শেলা নদীর মৃগমারী এবং বাদামতলা এলকায় বাঁশ ও জাল দিয়ে ভেসে আসা তেল আটকে তা অপসারণ করা হচ্ছে।
শেলা নদীর ভাসমান তেলের দাম বাড়লো
সুন্দরবনে শেলা নদীতে গত মঙ্গলবার ভোরে ‘ওটি সাউদার্ন স্টার-৭’ নামের অয়েল ট্যাংকার দুর্ঘটনার পর সুন্দরবনে ছড়িয়ে পড়ে ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৬৬৪ লিটার ফার্নেস অয়েল। সুন্দর বনের ভাসমান এই তেল জনসাধারণকে উঠিয়ে নিতে ও ৩০ টাকা লিটার দরে পদ্মা অয়েল কোম্পানি তা কিনে নেবে বলে গত বৃহস্পতিবার মাইকিং করা হয়েছিল।
গত দুদিনে ৩০ টাকা দরে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আহরিত ওই তেল কিনে নেয় পদ্মা অয়েল কোম্পানি। গতকাল রবিবার ঢাকায় আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠক শেষে নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খান সাংবাদিকদের জানান, রবিবার থেকে সুন্দর বনের ভাসমান তেল জনসাধারণের কাছ থেকে ৩০ টাকার পরিবর্তে লিটার প্রতি ৪০ টাকায় কিনে নেয়া হবে।
এডিবির সুপারিশে কান দেয়নি সরকার
সরকারের উদ্যোগে এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ২০০২ সালে এক গবেষণায় সুন্দর বনের তেল দূষণের ভয়াবহতা সম্পর্কে সরকারকে সতর্ক করেছিল। ওই গবেষণায় সুন্দও বনের সম্ভাব্য তেলের দূষণ রোধকল্পে বনকর্মীদের প্রশিক্ষণ, তেল দূষণ মোকাবেলায় পরিকল্পনা ও প্রতিরোধ পরিকল্পনা গ্রহণ করাসহ সুন্দরবন বিভাগ, মংলা বন্দর, কোস্টগার্ড, সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সমন্বয়ে আপদকালীন সময়ের জন্য আগাম সমন্বিত পরিকল্পনা কাঠামো গড়ে তোলাসহ বেশ কয়েকটি সুপারিশ করা হয়। তাছাড়া ২০০৩ সালে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে তেল দূষণ মোকাবেলায় পরিকল্পনা সনদে বাংলাদেশও স্বাক্ষর করে। কিন্তু বাস্তবে তেমন কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।
আগেও তেলে ডুবে ছিল সুন্দরবন
১৯৯৪ সালে এমভি পাবলিনা নামে একটি বিদেশি জাহাজ মংলা বন্দরের অদূরে পশুর নদীর বানিশান্তা এলাকায় ডুবে যায়। ওই জাহাজে থাকা ১৯৩ টন তেল ছড়িয়ে পড়ে সুন্দরবনে। ওই জাহাজ ডুবির সময় পশুর নদীতে ভাটা থাকায় তেলের একটি বিরাট অংশ ভেসে নেমে যায় বঙ্গোপসাগরে। সে কারণে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পায় ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজ সুন্দরবন।
সুন্দরবন নিয়ে দাবি
সেভ দ্যা সুন্দরবন ফাউন্ডেশন চেয়ারম্যান ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম গতকাল রবিবার এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানান, পলি পড়ে ঘষিয়াখালী-মংলা আন্তর্জাতিক নৌ চ্যানেলটি ২০১১ সালের এপ্রিলে বন্ধ হয়ে যায়। ঘষিয়াখালী-মংলা আন্তর্জাতিক নৌ চ্যানেলটি খননের কাজ পুনরায় ২২ মে ২০১৪ শুরু হয়। কিন্তু গত কয়েক মাসে কোন উল্লে­খযোগ্য অগ্রগতি না হওয়ায় নৌ চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। ২০১১ সালের এপ্রিল থেকে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় সুন্দও বনের ভিতর দিয়ে বলেশ্বর-জয়মণিকে বিকল্প রুট হিসাবে ব্যবহার শুরু করে। মাত্র তিন মাস নৌযান চলাচলের কথা বলা হলেও প্রায় চার বছর ধরে চলছে সব ধরনের নৌযান। সুন্দরবন বিভাগের আপত্তি উপেক্ষা করে প্রতিদিন এই বিকল্প রুট দিয়ে প্রায় দুই শতাধিক জাহাজ ও কার্গো ভ্যাসেল চলাচল করায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সুন্দরবন। ইউনেসকো, পরিবেশবাদী সংগঠন এ ব্যাপারে আপত্তি করলেও সরকার তা আমলে নেয়নি। তেলবাহী জাহাজ ডুবির পর সাময়িক নৌযান চলাচল বন্ধ করা হলেও আবার তা ভিন্ন কায়দায় চালু করার পাঁয়তারা চলছে। এই মহাবিপর্যয়ে সুন্দর বনের জীব বৈচিত্র্যের অফুরন্ত ক্ষতি হবে। হুমকির মুখে পড়বে সুন্দরবন সংলগ্ন লাখ লাখ মত্সজীবী মানুষের জীবন-জীবিকা।
ডলফিনের মৃত্যু নিয়ে গুজব
সুন্দরবনে তেল ছড়িয়ে পড়ার পর বিভিন্ন মহল থেকে আশংকা করা হচ্ছিল যে, ডলফিনের অভয়াশ্রম বলে পরিচিত ওই অঞ্চলে (যেখানে তেলের ট্যাংকার ডুবেছে) ডলফিন বিলুপ্ত হবে। গত শনিবার এই মর্মে একটি খবর প্রচারিত হয় যে, স্থানীয় একজন ফটো সাংবাদিক শেলা নদীর হরিণটানা-তাম্বুলবুনিয়া চ্যানেলে একটি মৃত ইরাবতি ডলফিনের মৃতদেহের খোঁজ পান। তেলবাহী ট্যাংকার যেখানে ডুবেছিল সেখান থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে মৃত ইরাবতিকে পাওয়া যায়। শেলা নদীতে কয়েক প্রজাতির ডলফিনের অভয়াশ্রম।
সুন্দরবনে ডলফিনের তিনটি অভয়াশ্রম রয়েছে
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সুন্দরবনের ৩৩ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ডলফিনের তিনটি অভয়াশ্রম রয়েছে। এগুলো হলো চাঁদপাই, ডাঙ্গিমারি এবং দুধকুমারি। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো চাঁদপাই। শেলা নদীর ১৫ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে চাঁদপাই বিস্তৃত। সূত্র মতে, বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ৯ সদস্যের কমিটি এ কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করছেন। তারা এতে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। অভিযানকালে নদী ও খাল থেকে তেল মিশ্রিত বিপুল পরিমাণ কচুরিপানা ডাঙ্গায় তোলা হয়েছে। তদন্ত দলের সদস্যরা বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখেছেন।
১১টি বিদেশি জাহাজে পণ্য ওঠানামার কাজ ব্যাহত
সুন্দরবনের অয়েল ট্যাংকার ডুবির পর বন্ধ শেলা নদীর চ্যানেলটি বন্ধ করে দেয়ার ফলে মংলা বন্দরে আটকা পড়েছে ২ শতাধিক কার্গো ও কোষ্টার জাহাজ। এসব জলযানের মাস্টার ও ক্রুরা অলস সময় কাটাচ্ছেন। দেশের সঙ্গে মংলা বন্দরের নৌ-যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। মংলা বন্দরে অবস্থানরত ১১টি জাহাজে পণ্য ওঠানামার কাজ ব্যাহত হচ্ছে। মংলা বন্দর হারবার মাস্টার কে এম আখতারুজ্জামান এ খবরের সত্যতা স্বীকার করেছেন।
ঘটনার বিচারের দাবিতে মানববন্ধন

তেলের ট্যাংকার দুর্ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবিতে গতকাল রবিবার মংলা পোর্ট পৌরসভার সামনে নাগরিক সমাজ ও পরিবেশবাদী সংগঠন সমূহের যৌথ আয়োজনে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) আবু নাসের খান এখানে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন। এ মানববন্ধন ও সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন মংলা নাগরিক সমাজের সভাপতি মোঃ নূর আলম শেখ।