শেয়ারবাজার ধসের চার বছর পরও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ারে বিনিয়োগের প্রবণতা রয়েই গেছে। স্বল্প আয়, স্বল্প সম্পদ ও উচ্চ পিই রেশিও (দাম ও আয়ের অনুপাত) সম্পন্ন কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম প্রায়ই তরতর করে বাড়তে থাকে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে মৌলভিত্তি সম্পন্ন কোম্পানিগুলোর চেয়েও এ সব কোম্পানির শেয়ারের দাম বেশি হয়ে যায়। স্টক এক্সচেঞ্জ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা সতর্ক করেও এ সব কোম্পানি থেকে বিনিয়োগকারীদের দূরে রাখতে পারে না। সাম্প্রতিক সময়ে দুটি কোম্পানির ব্যাপারে সতর্ক করেও বিনিয়োগকারীদেরকে দূরে রাখতে না পেরে শেষ পর্যন্ত কোম্পানির লেনদেনই বন্ধ করে দেয়া হয়। পরে আবার লেনদেন শুরু হয়। এর পরও দেখা যায় একই চিত্র। বিনিয়োগকারীদের অসতকর্তার কারণেই এ প্রবণতা রয়ে গেছে বলে মনে করেন বাজার বিশ্লেষকরা।
তথ্যে দেখা গেছে, গত পাঁচ সপ্তাহে শীর্ষ দরবৃদ্ধির তালিকায় আসা কোম্পানিগুলোর ১৫টি কোম্পানির পিই রেশিও ৪০-এর বেশি। বাজার বিশ্লেষকরা ২০-এর বেশি পিই রেশিও সম্পন্ন কোম্পানিতে বিনিয়োগ করাকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচনা করেন। উচ্চ পিই (পিই রেশিও যত বেশি বিনিয়োগ তত ঝুঁকিপূর্ণ) সত্ত্বেও এ সব কোম্পানির প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের কারণ হলো— দাম বাড়ার গুজব। কারসাজিকারীরা বাজারে এ কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম বাড়ানোর গুজব ছড়িয়ে দেয়। এরপর বাড়তে থাকে কোম্পানির দাম।
উচ্চ পিই সম্পন্ন কোম্পানির দাম বেড়ে যাওয়া প্রসঙ্গে ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. স্বপন কুমার বালা বলেন, প্রায়ই কিছু কোম্পানির দাম কোনো কারণ ছাড়াই অনেক বেড়ে যায়। এ কোম্পানিগুলোর দাম বাড়লেই এগুলোর বড় দর পতনের আশঙ্কাও তৈরি হয়। এ ব্যাপারে সতর্ক না হয়ে বিনিয়োগকারীরা শেয়ার কিনতে থাকেন। স্টক এক্সচেঞ্জের পক্ষ থেকে সতর্ক করেও বিনিয়োগকারীদের আটকানো যায় না। বরং তখন তারা স্টক এক্সচেঞ্জকে দোষারোপ করতে থাকেন। আর যখনই শেয়ারের দাম কমে যায়, তখন আসেন স্টক এক্সচেঞ্জের কাছে। এ সব থেকে বাঁচতে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক হওয়া ছাড়া উপায় নেই। বিনিয়োগকারীরা সতর্ক না হলে অকারণে কোম্পনির শেয়ারের দাম বাড়ার প্রবণতা বন্ধ করা যাবে না। আর যারা কারসাজির সঙ্গে জড়িত, তাদের কারসাজি বন্ধ করতে সার্ভিল্যান্স সফটওয়্যারসহ নানাভাবে চেষ্টা করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই বিএসইসি জরিমানাও করছে।
এ দিকে, শেয়ারবাজারে স্মরণকালের সর্বোচ্চ ধস শুরু হয়েছিল ২০১০-এর ডিসেম্বরে। এরপর গত চার বছরে শেয়ারবাজারে নানা ধরনের কাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) এবং পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) আইনগত ও কাঠামোগত নানা উন্নতি করতে সক্ষম হয়েছে। কেউ অনিয়ম করলে ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিএসইসি জরিমানা করে। তবে যে অঙ্কের অনিময় হয়, সে তুলনায় জরিমানার অঙ্ক কম হচ্ছে বলে মনে করেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
ডিএসই ও সিএসইর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত চার বছরে ডিএসইর পুরনো সূচক বন্ধ করে আন্তর্জাতিক মানের সূচক চালু করা হয়েছে। শরিয়াহ সূচক চালু করা হয়েছে। নতুন সার্ভিল্যান্স সফটওয়্যার স্থাপন করা হয়েছে। ডিএসই ও সিএসই ডিমিউচুয়ালাইজড (স্টক এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাপনা ও মালিকানা পৃথকীকরণ) হয়েছে। উভয় স্টক এক্সচেঞ্জ স্বয়ংক্রিয় লেনদেন চালু করেছে। ঘরে বসে ইন্টারনেটে লেনদেন করার সফটওয়্যার স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া, বিনিয়োগকারীদের আইপিও (প্রাথমিক গণপ্রস্তাব) আবেদন জমার পদ্ধতি সহজ করা হয়েছে। এখন বিনিয়োগকারীরা ব্যাংকে লাইনে না দাঁড়িয়ে ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংকের মাধ্যমে আইপিও আবেদন জমা দিতে পারছেন।
এ সব প্রসঙ্গে ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. স্বপন কুমার বালা বলেন, ডিএসইকে ডিমিউচুয়ালাইজড করা হয়েছে। অতিসম্প্রতি চালু করা হলো স্বয়ংক্রিয় লেনদেন পদ্ধতি। এগুলো বাজারের জন্য বড় ধরনের অবকাঠামোগত উন্নয়ন। স্বয়ংক্রিয় লেনদেন পদ্ধতি বর্তমানে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এর চূড়ান্ত পর্যায়ের সুবিধা পাওয়া যাবে আগামী এপ্রিল থেকেই। তখন বিনিয়োগকারীরা স্বয়ংক্রিয় লেনদেন পদ্ধতির আরো সুবিধা পাবেন।
ড. স্বপন কুমার বালা বলেন, বাজারে ইসলামি বন্ড চালুর ব্যপারে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। দ্রুত ক্লিয়ারিং হাউস করা হবে। এরপরই বাজারে ডেরিভেটিভ চালু করা হবে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে সূচকের ওঠা-নামা থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের দেশে সূচক একটু কমতে শুরু করলেই বিনিয়োগকারীরা হতাশ হয়ে পড়েন। আর সূচক বাড়তে থাকলে শেয়ার ক্রয় করতে থাকেন। অথচ সূচক কমতে শুরু করলেই বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়। আর যখন সূচক বাড়ে তখন শেয়ার ক্রয় করা ঝুঁকিপূর্ণ। এ বিষয়গুলো কিছু বিনিয়োগকারী বিবেচনা করেন না। ফলে ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। এতে বাজারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক ও ঝুঁকি বিবেচনা করে বিনিয়োগ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। সচেতনতা বাড়াতে স্টক এক্সচেঞ্জ আয়োজিত প্রশিক্ষণ কর্মশালাগুলোতে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো প্রয়োজন বলেও মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। অথচ স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রশিক্ষণ কর্মশালায় বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ খুবই হতাশাজনক। এমনকি অংশগ্রহণকারী কম থাকায় প্রশিক্ষণ কর্মশালা শুরুও করা যায় না বলে মন্তব্য করেন ডিএসইর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
