পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না থাকা, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, সময়মত ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ করতে না পারা ও কাজের প্রতি তাদের অনাগ্রহ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ নানা কারণে স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন অধিদপ্তর (এলজিইডি), খুলনার আওতায় চলমান ১৭টি প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হচ্ছে। ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে গৃহীত অনেক প্রকল্পের মেয়াদ ইতিমধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে। বাস্তবায়ন না হওয়া প্রকল্পগুলো ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও অর্থ বরাদ্দ না থাকার কারণে সেগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রকল্পের ব্যয়ও বাড়ছে।
১৭টি প্রকল্প হচ্ছে: পল্লী সড়ক ও কালভার্ট মেরামত কর্মসূচি, পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন (খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলা) শীর্ষক প্রকল্প, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন শীর্ষক প্রকল্প, ইউনিয়ন অবকাঠামো উন্নয়ন (খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলা) শীর্ষক প্রকল্প, উপজেলা ইউনিয়ন সড়কে দীর্ঘ সেতু নির্মাণ প্রকল্প, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন শীর্ষক প্রকল্প, বিশ্ব ব্যাংক সহায়তাপুষ্ট জরুরি-২০০৭ ঘূর্ণিঝড় পুনরুদ্ধার ও পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় সাইক্লোন শেল্টার মেরামত (ইসিআরআরপি), আইলায় ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ অবকাঠামো পুনর্বাসন প্রকল্প (আরএএআইপি), অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্রামীণ সড়ক ও হাটবাজার অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণ প্রকল্প, ভূমিহীন ও অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের বাসস্থান নির্মাণ, অংশগ্রহণমূলক ক্ষুদ্রাকার পানি সেক্টর প্রকল্প, অফিস কমপ্লেক্স ভবন মেরামত ও সংরক্ষণ, কোস্টাল ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচার প্রকল্প, রুরাল ইমপরমেন্ট অ্যান্ড রোড মেনটেন্যান্স কর্মসূচি (আরইআরএমপি), রাজস্ব বাজেট এর আওতায় সেচ অবকাঠামো মেরামত ও সংরক্ষণ এবং আরবান প্রাইমারি হেলথ কেয়ার সার্ভিস ডেলিভারি প্রকল্প।
পল্লী সড়ক ও কালভার্ট মেরামত কর্মসূচি
পল্লী সড়ক ও কালভার্ট মেরামত কর্মসূচির আওতায় ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে ১৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৪৯টি স্কীম গ্রহণ করা হয়। এরমধ্যে ১৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩২টি স্কিম বাস্তবায়ন করা হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ১৭টি স্কিম বাস্তবায়িত না হওয়ায় ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে অন্তর্ভুক্ত হয়। এই ১৭টির মধ্যে ৫টি স্কীম ২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত হয়েছে। বাকি ১২টি স্কীম বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার সৃষ্টি হয়েছে।
অগ্রাধিকারভিত্তিক পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন
এ প্রকল্প বাস্তবায়নে ৬৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৪৪টি স্কিমের কাজ শুরু হয় ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে। এর মধ্যে নির্ধারিত সময়ে ৩৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে ১১১টি স্কিম বাস্তবায়িত হয়। বাকি ৩৩টি স্কিম চলতি অর্থ বছরে অন্তর্ভুক্ত হয়। এর মধ্যে ২ কোটি ৭ লাখ ৩৯ হাজার টাকা ব্যয়ে ৪টি স্কিম বাস্তবায়িত হয়েছে। টাকা না থাকায় বাকি ২৯টি স্কিম বাস্তবায়ন থমকে আছে।
ইউনিয়ন অবকাঠামো উন্নয়ন
ইউনিয়ন অবকাঠামো উন্নয়ন (খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলা) শীর্ষক প্রকল্পের ৮৯টি স্কিম শুরু হয় ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে। ৭৩ কোটি ৩৩ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির কাজ শুরু হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ৪০ কোটি ১১ লাখ টাকা ব্যয়ে ৭০টি স্কীম বাস্তবায়িত হয়। বাস্তবায়িত না হওয়া ১৯ স্কীমের সাথে আরো ৭টি যোগ করে ২৬টি স্কীম চলতি অর্থ বছরে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু ফান্ড শূন্য থাকায় এগুলোও স্থবির হয়ে পড়ে আছে।
উপজেলা ইউনিয়ন সড়কে দীর্ঘ সেতু নির্মাণ প্রকল্প
এ প্রকল্পের আওতায় ৬ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ৯টি স্কিম বাস্তবায়ন পুরোপুরি হয়েছে। বর্তমানে এ প্রকল্পে নতুন অর্থ বরাদ্দ নেই।
গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প
জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) অর্থায়নে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন শীর্ষক প্রকল্পে দুটি পার্ট রয়েছে। এরমধ্যে সিভিল ওয়ার্কে ১৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৬৪টি স্কিম বাস্তবায়ন শুরু হয় ২০১৩-১৪ অর্থবছরে। ওই বছরে ১১ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে ২৯টি স্কিম বাস্তবায়ন করা হয়। এছাড়া চলতি অর্থবছরে ৩৫টি স্কিমের মধ্যে মাত্র একটি বাস্তবায়ন হয়েছে।
সাইক্লোন শেল্টার মেরামত
বিশ্ব ব্যাংকের সহায়তাপুষ্ট জরুরি ২০০৭ ঘূর্ণিঝড় পুনরুদ্ধার ও পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ১২১ কোটি ৯৯ লাখ টাকা ব্যয়ে সাইক্লোন শেল্টার মেরামত প্রকল্পের ৮২টি স্কিমের কাজ শুরু হয়। ওই বছর ৬৩ কোটি ৬৯ লাখ ৬১ হাজার টাকা ব্যয়ে মাত্র ১০টি স্কিম বাস্তবায়িত হয়। চলতি অর্থবছরে ৭২টি স্কিমের মধ্যে ২৬টি স্কিমের বাস্তবায়ন কাজ চলছে।
আইলায় ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ অবকাঠামো পুনর্বাসন
১৮ কোটি ৫৪ লাখ ৬৬ হাজার টাকা ব্যয়ে ৩২ টি স্কিমের কাজ শুরু হয় গত অর্থবছরে। ওই বছর ৬ কোটি ৬৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৭টি স্কিম বাস্তবায়িত হয়। বাকি ১৫টি স্কিম চলতি অর্থবছরে অন্তর্ভুক্ত হলেও ফান্ড না থাকায় এখনো কাজ শুরু করা যায়নি।
উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণ প্রকল্প
গত অর্থবছরে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ১৪ কোটি ৮৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা ব্যয়ে ৬টি ভবন নির্মানের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। অর্থবরাদ্দ না থাকায় ওই বছরে কাজ শুরু করা যায়নি। চলতি অর্থবছরে ৬টির সাথে আরো ২টি যোগ করে মোট ৮টি ভবন নির্মাণ কাজ গ্রহণ করা হয়। এ প্রকল্পের কাজ এখনও শুরু হয়নি।
কোস্টাল ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচার প্রকল্প ঃ গত অর্থবছরে ২ কোটি ৪১ লাখ ১৭ হাজার টাকা ব্যয়ে ৬৮টি স্কিমের কাজ গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন না হওয়ায় চলতি অর্থবছরে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কর্মকর্তারা বলছেন, কিছু এলাকায় কাজ শুরু হয়েছে এবং কিছু কাজের টেন্ডার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
ইমপ-রমেন্ট অ্যান্ড রোড মেইনটেনেন্স কর্মসূচি ঃ মোট ৭ কোটি ৪৪ লাখ ৬০ হাজার টাকা ব্যয়ে প্রকল্পের ৬৮টি স্কিম গ্রহণ করা হয় গত অর্থবছরে। চলতি অর্থবছরে কাজ শুরু হলেও কাজে ধীর গতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। তবে কর্মকর্তারা বলেছেন, এটি চলমান প্রকল্প। বর্তমানে এর ৬৫ ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
সেচ অবকাঠামো মেরামত ও সংরক্ষণ
রাজস্ব বাজেটের আওতায় সেচ অবকাঠামো মেরামত ও সংরক্ষণ প্রকল্পের দুটি পার্ট রয়েছে। এর মধ্যে পিটিআই নির্মাণ প্রকল্পে খুলনায় কোন বরাদ্দ নেই।
স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন অধিদপ্তর (এলজিইডি) খুলনার সিনিয়র সহকারি প্রকৌশলী এসএম তারিকুল ইসলাম খান বলেন, ফান্ড না থাকায় কিছু প্রকল্প বাস্তবায়নে সমস্যা হচ্ছে। বিল পরিশোধ করতে না পারার কারণে কিছু কাজ ঠিকাদাররা অসমাপ্ত অবস্থায় ফেলে রেখেছে। কাজ ফেলে রাখার কারণে নির্মাণসামগ্রীর দামও বেড়ে যাচ্ছে। ফলে পূর্বের বাজেটে কাজ করতে চান না ঠিকাদাররা। এ কারণে কাজে বাধার সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়া যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ থাকায় দুর্গত এলাকায় কাজ করাও কঠিন। অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে নির্মাণসামগ্রী বহন করাও কষ্টসাধ্য।