দেশের প্রধান পর্যটন কেন্দ্র কক্সবাজারে এখন লাখো পর্যটকের ভিড়। সমুদ্র সৈকতসহ জেলার অন্যান্য পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে দেখা দিয়েছে দারুণ প্রাণচাঞ্চল্য। বিপণী কেন্দ্রগুলো বেশ জমজমাট হয়ে উঠেছে। পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে ব্যবসায়ীদের দম ফেলার সময় নেই। রাস্তাঘাটেও দেখা যাচ্ছে ট্রাফিক জ্যাম। হোটেল-মোটেলের প্রায় সব কক্ষ আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বুকিং হয়ে গেছে। মাস খানেক ধরে জমজমাট হয়ে কক্সবাজারের পর্যটন শিল্প।
কক্সবাজারের অন্যতম প্রধান পর্যটন স্পট ইনানী সৈকতের কাছের হোটেল-মোটেল, কটেজ, গেস্ট হাউসগুলোতে জায়গা না পেয়ে অনেক পর্যটক কক্সবাজার থেকে এসে ইনানীর সৌন্দর্য উপভোগ করছেন।
কক্সবাজার থেকে দক্ষিণে মাত্র আধা ঘণ্টার মেরিন ড্রাইভ সড়ক হয়ে আসতে হয় ইনানী সৈকতে। সড়কের দু’ পাশের অপরূপ প্রাকৃতিক দৃশ্য পর্যটকদের দেয় ভাললাগার অনন্য অনুভূতি। এ দৃশ্য অবলোকনে প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক আসছে ইনানী সৈকতে। মেরিন ড্রাইভ সড়কের একদিকে সুউচ্চ পাহাড়, অপরপাশে ঝাউ গাছের দীর্ঘ সারি। ঝাউ গাছ পেরুলেই সমুদ্রের ঢেউ তীব্র গর্জন করে স্বাগত জানায় পর্যটকদের। এছাড়া পাটুয়ার টেক পাথরের স্তূপ, নীলাভ জলরাশির সাথে পাথর খণ্ডের লুকোচুরি খেলা পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। ইনানী সৈকত থেকে এক কিলোমিটার অদূরে সুউচ্চ পাহাড়ের মাঝখানে কানারাজা গুহা এখনো কালের সাক্ষী। পাশেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতি বিজড়িত ঐতিহাসিক ফইল্লা চাকমার মাচাং ঘর। যা দেখার জন্য অনেক পর্যটক আসছে। গতকাল শনিবার শীতের মাঝেও অনেক পর্যটককে ইনানী সৈকতে ঘুরতে দেখা গেছে।
কক্সবাজারের পর্যটন স্পটগুলো ঘুরে দেখা গেছে, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দলে দলে কক্সবাজারে বেড়াতে আসছেন পর্যটকরা। ব্যক্তিগত গাড়ি ও বিভিন্ন সার্ভিসের বাসে করে লাখো পর্যটক কক্সবাজারে আসায় রাস্তাঘাটেও সৃষ্টি হচ্ছে যানজট।
পর্যটন সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ১৬ ডিসেম্বর থেকে প্রতিদিন গড়ে এক লাখ পর্যটক কক্সবাজারে বেড়াতে এসেছেন। ৩১ ডিসেম্বর বা থার্টি ফার্স্ট যতই ঘনিয়ে আসবে ততই ভিড় বাড়তে থাকবে। ইতিমধ্যে শহরের হোটেল-মোটেল ও রেস্টহাউসের প্রায় সকল কক্ষ অতিথিপূর্ণ হয়েছে। আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত শহরের হোটেল-মোটেলে তেমন একটা খালি কক্ষ নেই বলে জানান কক্সবাজার হোটেল-মোটেল গেস্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম সিকদার। তবে জানুয়ারী থেকে ভিড় কমতে থাকবে বলে জানান তিনি।
ট্যুর অপারেটর এসোসিয়েশন অব কক্সবাজার (টোয়াক বাংলাদেশ) সভাপতি এসএম কিবরিয়া খান জানান, বছরের শেষ সময়ে আশাতীত সংখ্যক পর্যটক এসেছেন কক্সবাজারে। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত ছাড়াও শহর ও পার্শ্ববর্তী পর্যটন স্পট বিশেষ করে হিমছড়ী ঝর্ণা, দরিয়ানগর, সেন্টমার্টিন, টেকনাফ, ডুলাহাজারা বঙ্গবন্ধু সাফারী পার্কে এখন পর্যটকদের উপচেপড়া ভিড়। আদিনাথ মন্দির, অগ্গ মেধা ক্যাং এবং রামুর বৌদ্ধ মন্দিরসহ ধর্মীয় তীর্থস্থানগুলোতেও প্রচুর সংখ্যক পর্যটক ভ্রমণ করছেন।
গতকাল বিকালেও কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে গিয়ে লক্ষাধিক পর্যটকের উপস্থিতি দেখা যায়। সেখানে কথা হয় ঢাকা থেকে বেড়াতে আসা কবির আহমাদ চৌধুরী ও শারমিন চৌধুরীর সাথে। তারা জানান, প্রায় ১৬ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে শুক্রবার সকালে তারা কক্সবাজারে এসে পৌঁছেছেন। শহরের আশপাশের কয়েকটি পর্যটন স্পট ভ্রমণ শেষে শনিবার বিকালে সমুদ্র সৈকতে এসেছেন। ঢাকার চেয়ে কক্সবাজারে শীত অনেক কম, তাই কক্সবাজার ভ্রমণ তাদের কাছে বেশ উপভোগ্য হচ্ছে বলে জানান তারা।
কক্সবাজার সৈকতে পর্যটকদের স্নানকালে নিরাপত্তাদানকারী সংস্থা রবি লাইফগার্ডের ইনচার্জ ছৈয়দ নূর জানান, প্রতিদিন সকাল ও বিকালে লক্ষাধিক পর্যটক সমুদ্র সৈকত ভ্রমণে আসছেন। একই সঙ্গে হাজার হাজার পর্যটক প্রতিদিন সমুদ্রস্নানে মাতছেন। ফলে সুইমিং জোনের বাইরে কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে প্রতিদিন জলক্রীড়ায় মেতে উঠছে বিনোদনকামী পর্যটকেরা।
তবে সংশ্লিষ্টদের সতর্কতার কারণে এখনও কোন বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেনি। এদিকে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন জলপথে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচলও স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে বলে জানান টোয়াক বাংলাদেশ সভাপতি এসএম কিবরিয়া খান। তিনি বলেন, মৌসুমের শুরুতে দুটি জাহাজ চলাচল করলেও এখন চলাচল করছে পাঁচটি জাহাজ। এরমধ্যে সোনারগাঁ নামের একটি বৃহত্ জাহাজে একই সাথে হাজারো পর্যটক ভ্রমণ করতে পারেন।
ইনানী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ আলাউদ্দিন জানান, পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ট্যুরিস্ট পুলিশের পাশাপাশি তাদেরকেও অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
স্থানীয় চেয়ারম্যান আনোয়ার হোছাইন চৌধুরী জানান, ইনানীর ঝাউবাগানের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হলে পর্যটন পরিবেশের আরো উন্নতি হতো। এব্যাপারে ইনানী বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম জানান, ইনানী বীচকে পর্যটক বান্ধব হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার ব্যাপক পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
পর্যটকদের নিরাপত্তার দিকে লক্ষ্য রেখে পুলিশের টহলও বাড়ানো হয়েছে বলে জানান কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তোফায়েল আহমদ। এছাড়া র্যাব এবং সাদা পোশাকের পুলিশও দায়িত্ব পালন করছে বলে জানান তিনি।
