সারাদেশে শীতের তীব্রতা ক্রমশ বাড়ছে। সেইসাথে বেড়ে চলেছে সাধারণ মানুষের দুঃসহ কষ্ট-দুর্ভোগ। দেশে কৃষিসহ সব ধরনের উত্পাদন কর্মকাণ্ডের মূল চালিকাশক্তি, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূলভিত্তিতে অবস্থিত জনগোষ্ঠী শীতের প্রচণ্ডতায় ক্রমাগত কাহিল হয়ে পড়ছে। তাদের বসতঘর থেকে শীতের গরম কাপড় শীত নিবারণের সব সামর্থ্য-আয়োজনই নগণ্য। তাদের জন্য রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি সাহায্য-সহায়তাও অতি সামান্য। এবং এসব তত্পরতাও প্রধানত প্রচারমুখী।
মাগুরায় প্রচণ্ড শীতে জনজীবন বিপর্যস্ত
মাগুরা প্রতিনিধি জানান, মাগুরায় শীতের তীব্রতা বেড়েছে। আগুন জ্বালিয়ে অনেকে শীত নিবারণ করছে। শীতের কারণে মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছে না। রবিবার রাত ১০টা থেকে ঘন কুয়াশায় চারিদিকে ঢাকা পড়ে যায়। কুয়াশার কারণে যানবাহন চলাচলে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটে। শিশু ও বৃদ্ধরা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। পুরনো কাপড়ের দোকানে ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড়।
ঝিনাইগাতীতে জনজীবন বিপর্যস্ত ২ জনের মৃত্যু
ঝিনাইগাতী (শেরপুর) সংবাদদাতা জানান, শেরপুরের সীমান্তবর্তী ঝিনাইগাতী উপজেলার গারো পাহাড়ে প্রচণ্ড শীত, ঘন কুয়াশা ও হিমেল হাওয়ায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। পাহাড়ি এলাকার ছিন্নমূল ও নিম্ন আয়ের লোকজন আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছে। প্রচণ্ড শীত ও ঘন কুয়াশায় সন্ধ্যার পর রাস্তাঘাট হয়ে পড়ছে জনশূন্য। শ্রমজীবী মানুষ শীতের কারণে কাজে বের হতে পারছে না। পুরনো শীতবস্ত্রের দোকানে নিম্ন আয়ের লোকদের উপচেপড়া ভিড়। শীতে জবুথবু হয়ে পড়েছে উপজেলাবাসী। ঠাণ্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশু ও বৃদ্ধরা। প্রতিদিন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। শীতে এ পর্যন্ত উপজেলায় ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতরা হচ্ছেন: উপজেলার বনগাঁ-চতল গ্রামের আব্দুর রহমান ফকির (৫৫) ও সুরিহাড়া গ্রামের ফকির আলী (৫০)। সরকারিভাবে এ পর্যন্ত ৭শ কম্বল বিতরণ করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
শীতে কাঁপছে নালিতাবাড়ী গারো পাহাড়
নালিতাবাড়ী (শেরপুর) সংবাদদাতা জানান, পৌষের শীতে কাঁপছে সীমান্তবর্তী নালিতাবাড়ী উপজেলা ও গারো পাহাড়ের মানুষজন। হতদরিদ্র পাহাড়ি মানুষ প্রয়োজনীয় শীতবস্ত্রের অভাবে রয়েছে নিদারুণ কষ্টে। পাহাড়ের অভ্যন্তরে বসবাসকারী মানুষের কষ্টের অন্ত নেই। রাতের বেলায় ঘন কুয়াশায় আচ্ছন্ন থাকে পাহাড়ি জনপদ। সারাদিন সূর্যের দেখা মিলে না।
গত কয়েকদিন ধরে সীমান্তের নালিতাবাড়ী উপজেলার সমেশ্চুড়া, মধুটিলা, বুরুঙ্গা, বারোমারী, কালাপানি, দাওধারা, কাটাবাড়ী, হাতিপাগার, নাকুগাঁও, কালাকুমা, তারানী, পানিহাটা, শ্রীবরদী উপজেলার বালিজুড়ি, রাঙাজান, খ্রিস্টানপাড়া, কান্দাপাড়া, দার্শিকোনা, দীঘলাকোনা, হারিয়াকোনা, চান্দাপাড়া, রাজারপাহাড়, ডুমুরতলা, ঝিনাইগাতী উপজেলার তাওয়াকুচা, দুধনই, পানবর, নকশী, সন্ধ্যাকুড়া, হলদিগ্রাম, রাংটিয়াসহ প্রত্যন্ত পাহাড়ি পল্লীগুলোতে প্রচণ্ড শীত। উত্তর থেকে হিমালয়ের হিমবায়ু আর ঘন কুয়াশায় জেঁকে বসেছে প্রচণ্ড শীত। এখানকার খেটে খাওয়া মানুষগুলো শীতবস্ত্রের অভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। বারমারী গারোপল্লীর প্রদীপ জেংচাম, লুইস নেংমিনজা, শেফালী চিরান, জষ্টিনা জানান, প্রচণ্ড শীতে তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। প্রতিবছর এভাবেই শীতের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকতে হয় তাদের। পাহাড় থেকে লাকড়ি সংগ্রহ করে জ্বালিয়ে আগুনে শরীর সেঁকে শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন। শিশুদের সর্দি-জ্বর, কাশি, ডায়রিয়া রোগ দেখা দিচ্ছে।
হোসেনপুরে তীব্র শীত জনজীবন বিপর্যস্ত
হোসেনপুর (কিশোরগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, হোসেনপুরে কয়েকদিনের টানা শৈত্যপ্রবাহ ও ঘন কুয়াশায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। প্রচণ্ড কুয়াশায় রাস্তায় যানবাহন চলাচলে অসুবিধা সৃষ্টি হয়েছে। রাতে কুয়াশা বৃষ্টির মত পড়ছে। এলাকার দু:স্থ মানুষ গরম কাপড়ের অভাবে কষ্ট করছে। তীব্র শীতের কারণে শিশু ও বৃদ্ধরা দুর্বল হয়ে পড়েছেন। শিশুরা নিমোনিয়া, ডায়রিয়াসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে। টানা ঘন কুয়াশায় কৃষকের বোরো বীজতলা ও পানের বরোজ নষ্ট হওয়ার উপক্রম। হোসেনপুর উপজেলা চেয়ারম্যান মো: আয়ুব আলী রবিবার রাতে ছিন্নমূল শীতার্ত মানুষের মাঝে কিছু কম্বল বিতরণ করেছেন।
ভূঞাপুরে নাকাল মানুষ
ভূঞাপুর (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা জানান, কয়েকদিনের ঘন কুয়াশা আর তীব্র শীতে বির্পযস্ত হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষ। কনকনে শীত সইতে না পেরে সড়কের পাশে লোকজন খড়-কুটো ও গাছের গুঁড়ি জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছে। একটুখানি উষ্ণতা পেতে শীতার্ত মানুষ সড়ক, বাজার, দোকান-পাটসহ বিভিন্ন জায়গায় আগুন জ্বালিয়ে হাত-পা, কাপড়-চোপড় গরম করে নিচ্ছে। সোমবার সকালে ভূঞাপুর-ঘাটাইল সড়কে এমনই দৃশ্য দেখা গেছে। কৃষকরা স্বাভাবিক কাজ করতে পারছে না। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে যাচ্ছে না শীতে কাতর লোকজন। উপজেলায় শীতজনিত রোগ দেখা দিয়েছে। এর ফলে ডায়রিয়া, আমাশয়, নিউমোনিয়া, সর্দি-কাশিসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশু ও বৃদ্ধরা। গ্রামাঞ্চলের নিম্নবিত্ত মানুষের শীতের গরম কাপড়ের অভাবে কাজকর্মে বিঘ্ন ঘটছে। কর্মহীন হয়ে পড়েছে গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষ।
চিলড্রেন ওরাল হেল্থ ডেভলপমেন্ড ফাউন্ডেশন কর্তৃক উপজেলার পুষ্পকলি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ করে।
মধুখালীতে তিনদিন পর সূর্যের আলো
মধুখালী (ফরিদপুর) সংবাদদাতা জানান, মধুখালীতে গত চারদিনের কনকনে শীত ও ঘন কুয়াশায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ৪র্থ দিনে সোমবার বেলা সাড়ে ১২টায় সূর্যের দেখা মিলল। চারদিন ধরে ঘন কুয়াশা ও কনকনে শীতে মধুখালীর সাধারণ ও খেটে খাওয়া মানুষ চরম দুর্ভোগের শিকার। ঠাণ্ডাজনিত কারণে হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। শীতের কাপড়ের অভাবে খড়-কুটো ও টায়ার জ্বালিয়ে শীত নিবারণ করতে দেখা যায়।
বামনায় শৈত্যপ্রবাহে জনজীবনে দুর্ভোগ
বামনা (বরগুনা) সংবাদদাতা জানান, বরগুনার বামনায় গত কয়েকদিনের শৈত্যপ্রবাহে জনজীবনে চরম দুর্ভোগ নেমে এসেছে। স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা যেতে পারছে না শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। কৃষক পারছে না মাঠে কাজ করতে। দিনমজুর, রিকশাওয়ালা পারছে না রিকশা চালাতে, কাজে যেতে। মিলছে না হাট-বাজার। অফিস-আদালতের কার্যক্রম হচ্ছে ব্যাহত। সরকারি-বেসরকারি কোন সংস্থাই শীতবস্ত্র নিয়ে এগিয়ে আসেনি। অসহায় লোকজন শৈত্যপ্রবাহে কষ্টে জীবন কাটাচ্ছে।
স্বরূপকাঠির জীবনযাত্রা ব্যাহত
স্বরূপকাঠি (পিরোজপুর) সংবাদদাতা জানান, তীব্র শীত আর ঘন কুয়াশায় স্বরূপকাঠির জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। গতকাল সোমবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ঘন কুায়াশায় ঢাকা ছিল এ অঞ্চলের জনপদ। তীব্র শীতের ফলে হতদরিদ্র ও ছিন্নমূল মানুষের কষ্ট বেড়ে গেছে। সন্ধ্যা হওয়ার আগেই গ্রামীণ জনপদে রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে যায়। শুধু গ্রামাঞ্চলেই নয়, শহরেও সন্ধ্যার পর বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাহির হয় না মানুষ। ফুটপাতের গরম কাপড়ের দোকানে ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড়। বৃদ্ধ নারী-পুরুষ ও শিশুরা ঠাণ্ডাজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।