অস্তিত্ব হারাচ্ছে চলনবিল

আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০১৫, ০০:৫৫

দখল দূষণ আর ভরাটের কবলে পড়ে অস্তিত্ব হারাচ্ছে চলনবিল। উজানের জলের প্রবাহ না থাকায় মৃতপ্রায় হয়ে গেছে চলনবিলকেন্দ্রিক প্রধান নদ-নদী আত্রাই, নন্দকুঁজা, গুমানী, বড়ালসহ ১৬টি নদ-নদী। প্রায় অর্ধকোটি মানুষ পড়েছে পরিবেশ ও সার্বিক বিপর্যয়ের মুখে।

চলনবিল রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মজিবুর রহমান মজনু জানান, নাটোরের গুরুদাসপুরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া আত্রাই, নন্দকুঁজা ও গুমানী নদীর তীর ঘেঁষে ‘নদী বাঁচাও’ শ্লে­াগানের ব্যানার নিয়ে তারা মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে আসছেন দীর্ঘদিন ধরে। এছাড়া বিশ্ব নদী দিবস উপলক্ষে নদী পাড়ের চার জেলার আট উপজেলার মানুষ ২২০ কিলোমিটার দীর্ঘ পৃথিবীর বৃহত্তম মানববন্ধন কর্মসূচিও পালন করেছে। রাজশাহীর চারঘাটে পদ্মানদীর উত্সমুখ থেকে সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ীঘাট পর্যন্ত ওই মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া পদ্মার শাখা নদ বড়াল রক্ষা, দখলমুক্তকরণ, বাঁধ অপসারণ, পুনঃখনন ও ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), বড়াল রক্ষা আন্দোলন ও চলনবিল রক্ষা আন্দোলন কমিটি।  
‘ইম্পেরিয়েল গেজেট অব ইন্ডিয়া’ থেকে জানা যায়, চলনবিল অঞ্চলে ১৭৫৭ হেক্টর জল আয়তনের ৩৯টি বিল, ৪২৮৬ হেক্টর জল আয়তনবিশিষ্ট ১৬টি নদী এবং ১২০ বর্গকিমি আয়তনবিশিষ্ট ২২টি খাল রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান নদী ৯টি, ২০টি খালসহ ছোট বিল ও খাল রয়েছে। অতীতে ২৩ হাজারের মত বড় পানির আধার ছিল, যার বেশির ভাগই বেদখল কিংবা হাতছাড়া হয়ে গেছে।
চলনবিলের নদীগুলোর মধ্যে আত্রাই, নন্দকুঁজা, গুমানী, গুড়, করতোয়া, বড়াল, তুলসী চেঁচিয়া, ভাদাই, চিকনাই, বানগঙ্গা ইত্যাদি। ১৮টি খালের মধ্যে নবীরহাজীর জোলা, হকসাহেবের খাল, নিমাইচড়া খাল, বেশানীর খাল, গুমানী খাল, উলিপুর খাল, সাঙ্গুয়া খাল, দোবিলা খাল, কিশোরখালীর খাল, বেহুলারখাড়ি, বাকইখাড়া, গোহালখাড়া, গাড়াবাড়ী খাল, কুমারভাঙ্গা খাল, জানিগাছার জোলা, সাত্তার সাহেবের খাল, কিনু সরকারের ধর।
ফারাক্কার বিরূপ প্রভাব ও ‘৮০’র দশকে পদ্মার উত্সমুখে অপরিকল্পিত স্লুইসগেট নির্মাণের ফলে চলনবিলের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত বিভিন্ন নদ-নদী ও বিল, জলাশয়, খালগুলোতে পলি জমে ক্রমশঃ ভারাট হয়ে গেছে। তাছাড়া বিলের মাঝ দিয়ে যথেচ্ছ সড়ক, ব্রিজ-কালভার্ট, নদী দখল করে বসতি, দোকানপাট নির্মাণ করায় নদীগুলো সংকুচিত হয়ে পড়েছে। পানির স্তর নিচে নামতে নামতে এমন অবস্থায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে যে, এখন নদীগুলোতে ৪/৫ মাসের বেশি পানি থাকে না। শুকনো  মৌসুমে টিউবয়েল ও শ্যালোমেশিনে পানি পাওয়া যায় না। চলনবিলে মানুষের খাবার ও সেচ দেয়ার পানি পাওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ সরকারের চলনবিল মত্স্য প্রকল্পের সমীক্ষায় দেখা যায় ১৯৮২ সালে মোট ১,৭৭,০৬১ জেলে এসব নদ-নদী ও খাল-জলাশয়ে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করত। পর্যায়ক্রমে কমতে কমতে ২০০৬ সালে এর সংখ্যা ৭৫,০০০ জনে দাঁড়ায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞানী ড. মো. রেদওয়ানুর রহমানের প্রবন্ধ থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, ২৫ বছর আগেও চলনবিলের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত নদ-নদীতে বছর জুড়ে ৬ থেকে ১২ ফুট পানি থাকত। বছর জুড়ে নৌ-চলাচল করতো। কিন্তু বছরের পর বছর বন্যায় পলি জমে এবং শুষ্ক মৌসুমে জল প্রবাহ না থাকায় এসব নদী ভরাট হয়ে গেছে। পরিসংখ্যান মতে, প্রতি বছর ২২২১  মিলিয়ন ঘনফুট পলি প্রবেশ করে ৫৩ মিলিয়ন ঘনফুট পলি বর্ষায় চলনবিলে ত্যাগ করে।
পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক ডা. আব্দুল মতিন, বড়াল রক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়কারী আবু হেনা মোস্তফা কামাল ও মিজানুর রহমান জানান, দেশের বৃহত্তম পদ্মা ও যমুনা নদী এবং বিশাল চলনবিলের মধ্যে প্রধান সংযোগ নদ হচ্ছে বড়াল। এই নদ ৪টি জেলা ও ৮টি উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। রাজশাহীর চারঘাট থেকে উত্পত্তি এবং চলনবিলের মধ্যে দিয়ে মুশাখা, নন্দকুজা, চিকনাইসহ বেশ কয়েকটি নদীর জন্ম দিয়ে সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ীর হুড়াসাগর হয়ে যমুনায় মিলিত হয়েছে। একসময় এই নদী ছিল প্রবহমান। কিন্তু ৮০’র দশকে পানি উন্নয়ন বোর্ড অপরিকল্পিতভাবে নদীর উত্সমুখ ও ৪৬ কিলোমিটার ভাটি এলাকার আটঘরিয়ায় স্লুইসগেট নির্মাণ, পাবনার চাটমোহরে তিনটি ক্রসবাঁধ ও স্লুইসগেট নির্মাণের কারণে প্রমত্ত বড়াল বর্তমানে পুকুর বা জলাশয়ে পরিণত হয়েছে। এছাড়া কয়েকটি শিল্প-কারখানার তরল বর্জ্য পানি দূষণসহ ভূমিদস্যুদের কবলে পড়ে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি স্বার্থান্বেষী মহল কতিপয় স্থানীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তার যোগসাজশে বড়াল নদকে ‘অবক্ষয়িত জলাশয়’ ঘোষণা করে খনন করে দখলে নেয়। ফলে নদ সংলগ্ন এলাকায় ফসলহানি, বদ্ধ পানিতে দূষণ-দুর্গন্ধ-রোগ-বালাই, জেলে-কৃষক, ব্যবসায়ীরা বেকার ও দিশেহারা হয়ে পড়েছে। ভূমিদস্যুরা দখল প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখায় নদী তীরবর্তী জেলে, কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বেকার বানিয়ে নদী ধ্বংসের অপকর্মে নেমেছে। ব্যবস্থাপনার নামে অকেজো হয়ে পড়া স্লুইসগেটগুলো এখন সরকারি টাকা অপচয়ের প্রধান উত্স হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগ নীরব রয়েছে। বড়াল নদকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার দাবি করেছেন নদী তীরবর্তী মানুষ।
বড়াইগ্রাম বড়াল রক্ষা আন্দোলন কমিটির সদস্য সচিব ডিএম আলমগীর জানান, বড়াল নদ চালু ও তা রক্ষার জন্য বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), বড়াল রক্ষা আন্দোলন, চলনবিল রক্ষা আন্দোলনসহ বিভিন্ন সংগঠন, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও সর্বস্তরের মানুষ গত ২০০৮ সাল থেকে আন্দোলনে নামে। নাটোর, পাবনা ও রাজশাহীর সংসদ সদস্যরাও ওই আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে জনদাবির মুখে পানি উন্নয়ন বোর্ড টাস্কফোর্স গঠন করে। নদী বিষয়ক টাস্কফোর্স এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটির সভায় বড়াল নদের সব বাধা অপসারণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। কিন্তু বাস্তবে নদী উদ্ধারে কিছুই করা হয়নি।
চলনবিলের অন্যতম প্রধান আত্রাই, নন্দকুঁজা ও গুমানীসহ ১৬টি নদ-নদীতে নৌ-চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। স্থবিরতা নেমেছে ব্যবসা-বাণিজ্যে। একসময় এসব নদীতে বছর জুড়েই পানি থাকতো। নদীতে চলাচল করতো ছোট-বড় নৌকা। নদী আর নৌকাকে ঘিরে বিলের গুরুদাসপুরের চাঁচকৈড়, নাজিরপুর, সিংড়া, বড়াইগ্রামের আহম্মেদপুর, তাড়াশের ধামাইচ, নাদোসৈয়দপুর, চাটমোহরের ছাইকোলা, অষ্টমণিষা, মির্জাপুর, ভাঙ্গুড়ায় গড়ে উঠেছিল বড় নৌবন্দর। সেসব এখন শুধুই ইতিহাস। ১৯৮৫ সালে ২০ হাজার কিউসেক পানির স্বাভাবিক প্রবাহ থাকার সময় পানি উন্নয়ন বোর্ড বড়াল নদের উত্সমুখ চারঘাট এলাকায় ৬ হাজার কিউসেক পানি প্রবাহের স্লুইসগেট নির্মাণ করে। 
নাটোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, নদীর তীরবর্তী বাঁধ বা স্লুইসগেট নির্মাণে নদীর নাব্যতা বাধাগ্রস্ত হওয়ার ধারণা ঠিক নয়। ফারাক্কায় গঙ্গা ব্যারেজের কারণে উজানে পদ্মানদীর পানি প্রবাহ কমে যাওয়ায় বড়ালের নাব্যতা কমে গেছে। এটি একটি জাতীয় সমস্যা। তবে অবৈধ দখল উচ্ছেদে অভিযান চলমান আছে।

নাটোর জেলা আ.লীগের সভাপতি (গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রাম) আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল কুদ্দুস বলেন, চলনবিলসহ বড়াল নদকে রক্ষা করতে পারলে উত্তরবঙ্গের ৮ উপজেলার অর্ধকোটি মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অব্যাহত থাকবে। বেকারত্ব থেকে মুক্তি পাবে অন্তত পক্ষে ১০ লাখ মানুষ। তাই নিজেদের স্বার্থ চলনবিল ও বিলের মধ্যদিয়ে প্রবাহিত নদীগুলো রক্ষায় সোচ্চার হচ্ছে মানুষ।