চলমান হরতাল-অবরোধের কারণে সিরাজগঞ্জের তাঁতীরা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। হরতালের ফলে জেলার ৩টি শাড়ি-লুঙ্গির কাপড়ের হাটে বেচা-বিক্রিতে পড়েছে ভাটা। দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে বেপারীরা আসতে না পারায় সপ্তাহে প্রায় ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা লেনদেনের জায়গায় এখন লেনদেন হচ্ছে মাত্র ৫০ কোটি টাকা। এজন্য শ্রমিকের মজুরি দেয়া নিয়েও সমস্যায় পড়েছে এই অঞ্চলের প্রায় ২০ হাজার তাঁতশিল্প মালিক ও ব্যবসায়ী। অনেকেই ব্যবসার পরিধি করছেন হ্রাস। দেশের চলমান রাজনৈতিক সহিংসতা আর অবরোধের কারণে তাঁত ব্যবসার এই মন্দা অব্যাহত থাকলে অনেকেরই ব্যবসা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এই কারণে দেশের তাঁতশিল্প বাঁচাতে তাঁতীদের সংগঠন “বাংলাদেশ হ্যান্ডলুম পাওয়ার লুম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন নেতৃবৃন্দ ও কাপড়ের হাট ইজারাদারগণ দেশের প্রধান বিরোধীদলের নেত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর কাছে কাপড়ের হাট হরতালের আওতামুক্ত রাখার দাবি জানিয়েছেন।
সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প গড়ে ওঠে সেই ব্রিটিশ আমলের প্রথম দিকে। আর এই অঞ্চলে এ শিল্প প্রথম স্থাপন করেন মূলত মুর্শিদাবাদের তাঁতীরা। ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধে যখন ইংরেজদের কাছে নবাব সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হন, তখন মুর্শিদাবাদের ঐতিহ্যবাহী মসলিন কাপড় তৈরির কারিগর তাঁতী সম্প্রদায়ের উপর ইংরেজরা চালায় নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। তখন তাঁতীরা ভয়ে পালিয়ে এসে তত্কালীন পাবনা জেলার যমুনা নদীর তীর সংলগ্ন এনায়েতপুর, বেলকুচি, শাহজাদপুর এলাকায় বসতি গড়ে তোলে। নদীপথে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সরবরাহ ও তাঁত কলকাতা, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জে বিক্রিতে সুবিধা এবং আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় তারা এখানে তাঁতের শাড়ি ও লুঙ্গি তৈরি শুরু করে। সেই থেকে যুগোপযোগী নিত্য-নতুন ডিজাইনের শাড়ি-লুঙ্গি, গামছা, ধুতি, থ্রি পিছ তৈরি করে এই অঞ্চলের তাঁতীরা বাংলাদেশ তথা পৃথিবীর অন্য দেশে সুনাম অর্জন করেছে। এরপর অনেক ধাপ পেরিয়ে আজকে এই সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প।
সিরাজগঞ্জের তাঁতশিল্প সমৃদ্ধ অঞ্চলে কাপড় কেনা-বেচার জন্য দেশের বৃহত্ ৩টি শাহজাদপুর, বেলকুচি ও এনায়েতপুর কাপড়ের হাট প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এসব স্থানে সপ্তাহে ১০টি করে হাট বসে। সরেজমিনে রবিবার এনায়েতপুর কাপড়ের হাটে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় ২ হাজার তাঁতী হাটে রং-বেরংয়ের বাহারি শাড়ি-লুঙ্গি নিয়ে পসরা সাজিয়ে বসে আছেন। তবে যাদের জন্য তাদের এই আয়োজন সেই বেপারীরাই নেই হাটে। কারণ, একটাই– হরতাল-অবরোধ বিড়ম্বনা। সড়ক-মহাসড়কে যানবাহন নেই, আসতে পারছে না ভারত ও দেশের বিভিন্নস্থানের বেপারীরা।
হাটে আসা শিবপুর গ্রামের তাঁতী সাহেব আলী, রফিকুল ইসলাম, খুকনী গ্রামের খোকন, এনায়েতপুরের গোপালপুরের মোঃ আবু সামা, দৌলতপুর গ্রামের হাজী শহিদুল ইসলাম, সারটিয়া গ্রামের নাসির হোসেন, কৈজুরীর বখতিয়ার রহমান, খোকশাবাড়ীর সাহেব আলী, গোপালপুর গ্রামের কার্তিক গুণ জানান, “মাসখানেক ধরে চলা হরতাল এবং বর্তমানে টানা অবরোধের ফলে জেলার ৩টি হাটেই কাপড় বিক্রি নেই বললে চলে। আমাদের শুভক্ষণ পর্যন্ত হচ্ছে না। আবার যাওবা দাম বলে তা উত্পাদন খরচের চেয়েও কম। ১২শ টাকার শাড়ি দাম বলে ৯শ থেকে হাজার টাকা। এমতাবস্থায় আমরা শ্রমিকের মজুরি না দেয়ার পাশাপাশি নিজেদের সংসার চালানো নিয়ে চিন্তায় আছি।
জেলার দেড় লাখ তাঁতের মধ্যে বিরূপ অবস্থার কারণে প্রতি সপ্তাহে অন্তত সাড়ে ৪শ কোটি টাকার কাপড় অবিক্রিত থাকায় বেশকিছু তাঁত কারখানা বন্ধ করে দিয়েছে তাঁতীরা। এজন্য তাঁতশিল্পনির্ভর এ জেলার সামগ্রিক ক্ষেত্রেও মন্দাভাব দেখা দিয়েছে। তারা আরো জানান, উত্তরাঞ্চলের রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা জেলার প্রায় লাখো শ্রমিক নিয়োজিত রয়েছে। তাঁতশিল্প দুরবস্থার কারণে তারা এখন ঠিকমতো কাজ পাচ্ছে না।
বাংলাদেশ হ্যান্ডলুম পাওয়ারলুম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক বদিউজ্জামান বদি ও এনায়েতপুর হাট ইজারাদার আলহাজ্ব জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, অবরোধ-হরতালের কারণে বাজার মন্দা। জেলার ৩টি হাটে যেখানে সপ্তাহে প্রায় ৫শ কোটি টাকার কাপড় বিক্রি হতো, সেখানে তা দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫০ কোটিতে। এভাবে চললে এই সম্ভাবনাময় শিল্পকে টিকিয়ে রাখা যাবে না।