বিদেশি ক্রেতারা বাতিল করছেন সফর

আপডেট : ১৫ জানুয়ারি ২০১৫, ০১:০৮

টানা হরতাল আর অবরোধের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে রপ্তানিখাতে। বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশ সফর বাতিল করতে শুরু করেছেন। কিছু ক্রেতা রপ্তানিকারকদের নিজ দেশে ডেকে পাঠাচ্ছেন অথবা কাছাকাছি অন্য কোন দেশে গিয়ে ক্রয় আদেশ চূড়ান্ত করতে বলছেন। তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘমেয়াদী অনিশ্চয়তার আশঙ্কায় ক্রেতারা অর্ডার দেয়ার সময় কিছুটা রক্ষণশীল মনোভাবের পরিচয় দিচ্ছেন। ক্ষেত্রবিশেষে প্রকৃত চাহিদার তুলনায় অর্ডার ২০ থেকে ৪০ শতাংশ কমিয়ে দেয়া হচ্ছে।

এসব কারণে চলতি অর্থবছরের গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে বলে মনে করছেন বিজিএমইএ প্রেসিডেন্ট আতিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, পোশাক রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি দূরে থাক, গত বছরের সমপরিমাণ রপ্তানি হবে কি না তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো’র (ইপিবি) হিসাবে, অর্থবছরের প্রথম ছয়মাসে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে পণ্য রপ্তানিতে ঘাটতি হয়েছে অন্তত ছয় হাজার কোটি টাকা। সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে স্বাভাবিকভাবেই এ ঘাটতি আরো বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত বছর রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় বিদেশি ক্রেতারাও সহিংসতার মুখে পড়েন। ওই সময় রাজধানীর বাড্ডায় বিদেশি ক্রেতা প্রতিনিধির গাড়িতে হামলার চিত্র গণমাধ্যমে আসে। সেজন্য এবার ক্রেতারা অনেকেই ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশে আসতে চাচ্ছেন না। বিজিএমইএ’র সহ-সভাপতি শহীদুল্লাহ আজিম ইত্তেফাককে বলেন, আমার নিজের ক্রেতা বাংলাদেশ সফর বাতিল করেছেন। ওই ক্রেতার সঙ্গে অর্ডার নিয়ে আলোচনার জন্য একজন প্রতিনিধিকে হংকং পাঠিয়েছি। আমরা ক্রেতাদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলেও কিছুদিন পর পর এ ধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে তারা স্বাভাবিকভাবে নিচ্ছেন না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অন্য আরেকজন রপ্তানিকারক জানান, ক্রেতা বাংলাদেশ সফর বাতিল করায় তার প্রতিনিধিকে তৃতীয় একটি দেশে গিয়ে অর্ডারের বিষয়ে ফয়সালা করতে হয়েছে। কিন্তু সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে ওই ক্রেতা অর্ডার ৩০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছেন। তিনি (ক্রেতা) আশঙ্কা করছেন, আমরা যথাসময়ে পণ্য পাঠাতে ব্যর্থ হবো। আলোচনায় ক্রেতারা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী দিনগুলোতে অর্ডার আরো কমবে।
বিজিএমইএ’র হিসাবে গত ২০১৩ সালের রাজনৈতিক সহিংসতায় পাঁচ হাজার পাঁচশ’ কোটি টাকার পণ্য বিমানে পাঠাতে হয়। তাছাড়া মূল্য ছাড় দিতে হয় অন্তত নয় হাজার কোটি টাকার পণ্যে। প্রতিদিন হরতাল বা অবরোধের কারণে প্রায় ২১৫ কোটি টাকার উত্পাদন ব্যাহত হয়। চলতি জানুয়ারি মাসের প্রথম ১২ দিনের অবরোধে কেবল পোশাক খাতেই ক্ষতি হয়েছে ৪৫০ কোটি টাকা।

অর্থনীতিবিদ ও পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর ইত্তেফাককে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে ক্রেতারা তাদের অর্ডার প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া বা চীনে সরিয়ে নেবে। এসব ক্রেতাকে আবার ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে। কারণ সময়মত পণ্য পাওয়ার স্বার্থে তারা বাড়তি খরচ করতেও রাজি। চলমান অস্থিরতার প্রভাব সুস্পষ্ট হবে আগামী জুনের পর থেকে। তিনি বলেন, আমাদের উত্পাদকরা হয়তো সময়মত পণ্য পাঠানোর সক্ষমতা রাখেন। কিন্তু বিদেশি ক্রেতারা এ ধরনের পরিস্থিতির সঙ্গে অভ্যস্ত নন। ফলে তারা ঝঁকি নিতে চাইবেন না।  উল্লেখ্য, চলতি অর্থবছর ১১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে তিন হাজার ৩২০ কোটি মার্কিন ডলার। মোট রপ্তানির ৮১ শতাংশই গার্মেন্টস পণ্য।