ভয়াবহ অনিশ্চয়তায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা

আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০১৫, ২৩:৫৮

টানা অবরোধে যখন ব্যবসা-বাণিজ্যের ত্রাহি দশা, তখন হরতালের ঘোষণা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ভাবিয়ে তুলেছে। দেশব্যাপী অবরোধ ও বিভিন্ন স্থানে হরতালের কারণে অর্থনীতির স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। ভেঙে পড়েছে সরবরাহ ব্যবস্থা। কোনমতে পুলিশি পাহারায় সীমিতসংখ্যক রফতানি পণ্য বন্দরের পথে নেয়া গেলেও সার্বিক পরিস্থিতি নাজুক হয়ে পড়েছে। অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায় পচনশীল পণ্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কৃষকের উত্পাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য দূরে থাক, খরচ উঠানোও সম্ভব হচ্ছে না।

একই অবস্থা শিল্পখাতেরও। বড় বড় শিল্পখাতের শুধু নয়, যারা জীবন ধারণের জন্য ক্ষুদ্র উদ্যোগ নিয়ে বেঁচে আছেন, তাদের অবস্থা খুবই সঙ্গীন। এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তায় অজানা আগামীর পথে দাঁড়িয়ে তারা। যাদের কেউ চাকরি দেয়নি, দেয়নি আর্থিক সহায়তাও। সম্পূর্ণ নিজ চেষ্টায় সামান্য পুঁজি দিয়ে ফুটপাতে কিংবা ছোট্ট পরিসরে আয়ের ব্যবস্থা করেছে তারা। দিনের বিক্রি দিয়েই দিনের খরচ। একই অবস্থা দিনমজুর অসহায় শ্রেণীর লোকদেরও। সবার মুখে একই আহাজারি—এই অনিশ্চয়তা-অস্থিরতার শেষ কোথায়?
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অঞ্চলভিত্তিক পণ্য উত্পাদন ও ব্যবসা কেন্দ্র রয়েছে। যেসব স্থান থেকে দেশের অপর প্রান্তের ভোক্তাদের কাছে পণ্য পৌঁছানো হয়ে থাকে। অবরোধে-হরতালে সবই বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। এ অবস্থা বেশিদিন চলতে থাকলে খাদ্যপণ্যের মত জরুরি বিষয়গুলো নিয়েও চিন্তার কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। 
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী বলেন, সহিংস রাজনীতির কবলে পড়ে অর্থনীতি বারবারই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অর্থনীতি ধ্বংস করে এমন রাজনীতি করলে, দেশকে এগিয়ে নেয়ার স্বপ্ন দেখিয়েও লাভ নেই। আমাদের রাজনীতিকদের এ বিষয়টি বুঝতে হবে।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অন্যান্য খাতের মত পাট ও মত্স্য শিল্প বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে আসছে। এসব শিল্পের সঙ্গে জড়িত হাজার হাজার প্রান্তিক চাষি ও ব্যবসায়ীদের কথা কেউ মনে রাখে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে এরাও আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছে। বাগেরহাটের মত্স্য চাষি হুমায়ুন কবির বলেন, ঢাকার কাওরান বাজার, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মাছ সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। অবরোধের ফলে পরিবহন সংকট, ব্যবসায়ীদের মধ্যে এক অজানা আতঙ্কে কমে গেছে মাছের দামও। সারা বছর মাছ চাষ করে এখন তা কমদামে বাকিতে বিক্রি করতে হচ্ছে।
ইত্তেফাকের ফকিরহাট সংবাদদাতা ফটিক ব্যানার্জী জানান, দক্ষিণাঞ্চলের বৃহত্ মত্স্য আড়ত দু’টির মধ্যে ফলতিতা বাজার একটি। এ বাজারে প্রতিদিন প্রায় দেড়শ’ টন সাদা মাছ (চিংড়ি ছাড়া মিঠা পানির অন্যান্য মাছ) ও চিংড়ি কেনা বেচা হয়ে থাকে। এখান থেকে প্রক্রিয়াজাত করে বহির্বিশ্বে মাছ রপ্তানি হয়। 
এ প্রসঙ্গে ফলতিতা মত্স্য আড়তের সভাপতি তৌহিদুল ইসলাম পপলু বলেন, হরতাল অবরোধের করণে বিভাগীয় শহরসহ দেশের বিভিন্ন জেলার মোকামে মাছ পাঠানো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। হিমায়িত মত্স্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান নগদ টাকায় মাছ কিনছে না।
হিমায়িত মত্স্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান লখপুর গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম আবুল হোসেন বলেন, অবরোধের কারণে রপ্তানি কাজ বন্ধ থাকায় ১০ দিনে ১৫ লাখ ডলারের অর্ডার বাতিল হয়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে আমাদের পথে বসতে হবে।
সবজি চাষির মাথায় হাত
রংপুরের তারাগঞ্জ সংবাদদাতা খবির উদ্দিন জানান, টানা হরতাল-অবরোধে রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলায় শাক-সবজির দাম কমে গেছে। সোমবার তারাগঞ্জ কাঁচাবাজারে ঘনিরামপুর গ্রামের সবজি চাষি আবু বকর সিদ্দিক কয়েক মণ ডাটা শাক বিক্রি করতে আসেন। কিন্তু ১০ টাকার (প্রতি কেজি) ডাকা শাকের দাম দু-তিন টাকার বেশি উঠেনি। ফুলকপি বিক্রেতা মনোরঞ্জন, এমদাদ সহ কয়েকজন জানান, আগে যে ফুলকপি ২০ টাকা কেজি ধরে বিক্রি হত বর্তমানে তা ২ টাকা কেজি দামও কেউ কিনতে চাচ্ছে না। অবরোধের কারণে তারাগঞ্জে উত্পাদিত শাক-সবজি বাইরের জেলাগুলোতে পাঠাতে না পারায় এমন অনেক কৃষকই অসহায় হয়ে পড়েছেন। আবার বাইরের জেলাগুলো থেকে যেসব কাঁচামাল এখানে আনা হয়, সেগুলোর দাম হঠাত্ বেড়ে গেছে। শাক-সবজি সংরক্ষণ করতে না পারায় লোকসানে বিক্রি করতে হচ্ছে তাদের। তারাগঞ্জ কাঁচাবাজারের শফিকুল, আইনুল, ফরতাজসহ কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, অবরোধের কারণে কাঁচামাল লোকসানে বিক্রি করতে হচ্ছে। আগে প্রতি কেজি আলু ২৫-৩০ টাকায় বিক্রি হতো। এখন ৭-৮ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে।
সংকটে খুলনা অঞ্চলের পাট শিল্প
খুলনা অফিস থেকে এনামুল হক জানান, রাজনৈতিক অস্থিরতার কবলে পড়েছে খুলনা অঞ্চলের পাট শিল্প। বিপুল পরিমাণ পাটজাত পণ্য অবিক্রিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। পাশাপাশি পরিবহন সংকটের কারণে কাঁচা পাট ব্যবসায়ীরাও তাদের গুদামজাতকৃত পাট রফতানি করতে পারছেন না। এছাড়া অব্যাহত অবরোধের কারণে মিল, কল-কারখানা বন্ধসহ শ্রমিক-কর্মচারীদের বেকার হওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।
খুলনা-যশোর অঞ্চলে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ৩৫টি পাটকল রয়েছে। এরমধ্যে সরকারি ৯টি এবং বেসরকারি পাটকলের সংখ্যা ২৬টি। বর্তমানে ৯টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলে প্রায় ২শ’ কোটি টাকার পাটজাতপণ্য অবিক্রিত অবস্থায় রয়েছে। খুলনা রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো সূত্র জানায়, খুলনার পাট ও পাটজাত পণ্য চীন, ভারত, পাকিস্তান, বুলগেরিয়া, পর্তুগাল, রাশিয়া, তুরস্ক, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ড, জাপান, গ্রিস, ইটালি, স্পেন, চেক রিপাবলিক, কানাডা, জার্মানি, কোরিয়া, যুক্তরাজ্য, পোল্যান্ড, অস্ট্রিয়া ও বেলরুস সহ বিশ্বের ২৪/২৫টি দেশে রফতানি হয়।
বাংলাদেশ জুট মিল কর্পোরেশন (বিজেএমসি) সূত্র জানায়, খুলনা অঞ্চলের ৯টি রাষ্ট্রায়ত্ত জুট মিলে বর্তমানে ২১ হাজার ২০১ মেট্রিক টন হেসিয়ান, সিবিসি, ইয়ার্ন ও স্যাকিং পাটজাত পণ্য মজুদ রয়েছে। যার আনুমানিক মূল্য ২০১ কোটি টাকা। রাজনৈতিক অস্থিরতা যুক্ত হওয়ায় সুদূর প্রসারী ক্ষতির আশঙ্কা প্রকাশ করেছে মিল কর্তৃপক্ষ।

পাট ব্যবসায়ী মোঃ ফারুক হোসেন জানান, টানা অবরোধে পরিবহনের জন্য ট্রাক পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যবসা করতে না পারায় ব্যবসায়ীরা দেনার দায়ে আবদ্ধ হয়ে পড়ছেন। এছাড়া ব্যাংক ঋণ পরিশোধে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। মিল বন্ধের আশঙ্কাও করছেন কোন কোন মালিকপক্ষ। আফিল জুট মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আকরাম হোসেন বলেন, বিশ্ববাজারে পাটের চাহিদা হ্রাস ও মন্দা থাকায় মিলগুলো আগে থেকেই ক্ষতির মুখে রয়েছে। অবরোধে ঝুঁকি আরো বেড়েছে। বিজেএমসি’র আঞ্চলিক সমন্বয়কারী রফিকুল ইসলামও একই আশংকা জানিয়ে বলেছেন, খুলনা-যশোর অঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত ৯টি জুট মিলে প্রায় ২শ’ কোটি টাকার পাটজাত পণ্য মজুদ রয়েছে। অবরোধের কারণে পাট পণ্য পরিবহনে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।