অনেক আক্ষেপ নিয়েই চলে গেলেন অভি

আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০১৫, ০০:১৭

বাঁচতে চেয়েছিলেন অভি। চেয়েছিলেন পড়াশোনা শেষ করতে। বাবাকে বলেছিলেন আইনজীবী হবেন। মাকে বলেছিলেন তার সব কষ্ট ঘোচাবেন। কিন্তু কিছুই করা হলো না তার। এই করতে না পারার অনেক আক্ষেপ নিয়েই গত বুধবার গভীর রাতে  চলে গেলেন তিনি না ফেরার দেশে।

সানজিদ হোসেন অভির বাবা-মা ছেলেকে হারিয়ে পাগলপ্রায়। ছেলের মৃতদেহ বুকে নিয়ে মা নূরজাহান বেগম বিলাপ করতে করতে বলেন, হে আল্লাহ! আমার বাচ্চার কি অপরাধ? আমি বাচ্চাটাকে নিয়ে বাঁচতে চেয়েছিলাম। আমার বুক থেকে তারা সেটাও কেড়ে নিয়ে গেল। আমি এখন কি করব? আমার মতন যেন আর কোন মায়ের বুক খালি না হয়।
গত ১৪ জানুয়ারি সন্ধ্যার পর গুলিস্তানের বঙ্গবাজার এনেক্স টাওয়ারের সামনের সড়ক পার হচ্ছিল অভি ও তার দুই বন্ধু। সেসময় পর পর ২টি বোমা নিক্ষেপ করা হয়। একটি বোমা অভির বাম গালের উপর বিস্ফোরিত হয়। ঝলসে যায় গাল। নষ্ট হয়ে যায় তার বাম চোখ। ক্ষত-বিক্ষত হয় মুখমন্ডল। তাকে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় প্রথমে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে চিকিত্সকরা তাকে শেরেবাংলানগর চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে পাঠান। চক্ষু বিশেষজ্ঞরা অভিমত দেন, অভির বাম চোখ নষ্ট হয়ে গেছে। মাথার আঘাত অত্যন্ত জটিল। তাকে আগে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। তাই সেখান থেকে ওই রাতেই তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগে ভর্তি করা হয়। মৃত্যুর সঙ্গে আট দিন লড়ে গত বুধবার দিবাগত গভীর রাতে অভি মারা যান।
নূরজাহান বেগম বলেন, তিনি ভাবতে পারেননি সকলকে ফাঁকি দিয়ে অভি চলে যাবে। আগেরদিনও অভি বলেছিল, মা, আব্বু আর কত কষ্ট করবে। সুস্থ হয়ে লেখাপড়ার পাশাপাশি আমাকে কিছু  একটা করতে হবে। ছেলের কথায় আর্থিক অনটনে থাকা মায়ের বুক ভরে যায়। সেই মায়ের সামনেই চলে গেলেন অভি।
নূরজাহান বেগম বলেন, আমার অভির ধাপে ধাপে উপরে উঠার কথা। সবাই আমাকে বলেছিল, অভি সেরে উঠবে, আর আমি পেলাম অভির লাশ। আমি কিভাবে অভিকে ছাড়া বাঁচবো? আমাকে আরেকটি বোমা দিয়ে মেরে ফেলা হোক। আমি আমার পুত্রের সঙ্গে থাকবো। চিত্কার করে এগুলো বলতে বলতেই নূরজাহান বেগম মূর্ছা যান।
অভির বাবা দেলোয়ার হোসেন ডিম ও তরকারির ব্যবসা করেন। তিনি চেয়েছিলেন ছেলেকে আইনজীবী বানাবেন। অভিকে কলেজে ভর্তি করে দিয়ে দেলোয়ার হোসেন বলেছিলেন, বাবা, ডিম ও তরকারি বিক্রি করি আমি যা পাই, তা দিয়েই খেয়ে না খেয়ে তোমার পড়ার খরচ আমি যোগাবো। তোমাকে আমি আইনজীবীূ বানাবোই। তুমি ঠিকমত লেখাপড়া করবে। বাবার কথা শুনে ছেলে বলেছিল বাবা, তোমার কষ্ট আমার সহ্য হয় না। আমি আইনজীবী হলে তোমাকে ডিম ও তরকারি বিক্রি করতে দিব না। গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ছেলের লাশ জড়িয়ে তার নানান স্বপ্নের কথা বলেন দেলোয়ার। অভিরা দুই ভাই। সুত্রাপুরের কলতাবাজার এলাকায় ওদের বাসা। গ্রামের বাড়ি মুন্সিগঞ্জ জেলার শ্রীনগর উপজেলার আটপাড়ায়। কবি নজরুল ইসলাম সরকারি কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন অভি।

বাদ জোহর কবি নজরুল ইসলাম সরকারি কলেজ প্রাঙ্গনে অভির নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। কলেজের শিক্ষক, ছাত্র ও স্থানীয় সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ জানাজায় উপস্থিত ছিলেন।