দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক অধিনায়ক গ্রায়েম স্মিথ স্বীকার করে নিলেন, তার দেশের খেলোয়াড়রা বড় কোনো টুর্নামেন্টে প্রতিনিয়তই ‘চোকার’ অপবাদে ‘বিরক্তি’ অনুভব করে। দক্ষিণ আফ্রিকা কেবল বিশ্বকাপ জিতলেই এই বাজে খেতাব ঘুচবে বলেও মন্তব্য করেন গত বিশ্বকাপে প্রোটিয়াদের নেতৃত্ব দেয়া স্মিথ। আরেকটি বিশ্বকাপের ঠিক আগে এক অনুষ্ঠানে ‘চোকার’ নিয়ে ভারতের সাবেক অধিনায়ক রাহুল দ্রাবিড়ের এক প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন ক্রিকেট ইতিহাসে সবচেয়ে বেশী টেস্টে দলকে নেতৃত্ব দেয়া স্মিথ।
সর্বশেষ আসরে ঢাকার মিরপুর স্টেডিয়ামে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ফাইটিং স্কোর গড়েও বিদায় নিতে হয় তাদের।
সাবেক এই উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান বলেন, ‘আমি মনে করি যেকোনো কারণেই হোক নক-আউট পর্বে আমরা ভালো খেলতে পারিনি। আমরা শ্রেয়তর দলের কাছে হারতে পারতাম, এ ক্ষেত্রে হয় পরিস্থিতি আমাদের পক্ষে ছিলো না অথবা নিজেদের জন্য শুধু হতাশাই ডেকে এনেছি। আমি মনে করি, বিভিন্ন কারণেই এমনটি হচ্ছে এবং দূর্ভাগ্যবশত এটা আমাদের জন্য এমন কিছু হয়ে দাঁড়িয়েছে যা থেকে বিশ্বকাপ জয় ছাড়া কখনোই মুক্তি পাবো না। কেননা আমরা কিছু বাজে ভুল করেছি।’
সমপ্রতি, এক সাক্ষাত্কারেই দক্ষিণ আফ্রিকার তারকা অল-রাউন্ডার জ্যাক ক্যালিস ‘চোকার’ তকমা দলটির ড্রেসিং রুমে কেবল কৌতুক হিসেবেই দেখা হতো বলে জানান। কিন্তু স্মিথ বললেন, বিশ্বকাপের মতো বড় টুর্নামেন্টের আগে এটা নিতান্ত কৌতুক হিসাবে থাকে না। তবে এই বদনাম নিয়ে এবারের বিশ্বকাপেও তাদের খেলোয়াড়দের এগিয়ে যেতে হবে। কেননা এটা থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় এটাকে মোকাবেলা করা। স্মিথ বলেন, ‘আমিও মনে করি এটাকে সবসময় একটি হালকা ব্যাপার হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিন্তু আপনি যখন নক-আউট পর্বে যাবেন এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যকবার আপনি এই প্রশ্নটির (চোকার অপবাদ) সম্মুখীন হবেন, উল্লেখযোগ্য সংখ্যকবার আপনি এটা পড়বেন এবং অসংখ্যবার মানুষ আপনাকে দেখে এটা বলবে তখন বিষয়টা একটি অভ্যন্তরীণ চাপ হয়ে আসতে পারে......।’
স্মিথ আরো বলেন, ‘এটা এমন অপবাদ যার জন্য দায়ি প্রত্যেক খেলোয়াড়ই। যা অনেকবারই বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টগুলোতে দক্ষিণ আফ্রিকা দলের জন্য গলার কাঁটা হয়ে আবির্ভূত হয়। যা থেকে আপনি মুক্ত পেতে পারেন না। এই অপবাদ বয়ে বেড়াতেই হয়।’
গত কয়েক মাস ধরেই সব ধরনের ক্রিকেটেই দারুণ নৈপুণ্য দেখাচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকা। দুর্দান্ত ফর্মে থাকা এবি ডি ভিলিয়ার্সের নেতৃত্বে বিশ্বকাপ খেলতে যাবে দলটি। এই দলটি নিয়ে অপবাদ ঘুচানোর দারুণ সুযোগ দেখছেন স্মিথ। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি অনেক কারণেই এটা আমাদের জন্য বড় একটি সুযোগ। বোলিং এবং ব্যাটিং দুই দিক থেকেই ম্যাচে জয় এনে দিতে পারে এমন অনেক খেলোয়াড় আছে আমাদের। এর আগে শীর্ষ পাঁচে আমাদের কখনোই এমনটি ছিলো না। আমি মনে করি শীর্ষ পাঁচে আমরা সেরা ব্যাটসম্যান পেয়েছি। দলে অনেক খেলোয়াড় রয়েছে যারা জয় এনে দিতে পারে। দলের লাইন-আপে মূল পরিবর্তনটা হলো—আমরা আক্রমণাত্মক বোলারও পেয়েছি যারা উইকেট নিতে পারে এবং আমরা আক্রমণাত্মক স্পিনারও পেয়েছি যা দক্ষিণ আফ্রিকা দলের জন্য বড় কিছু।’ এবারের বিশ্বকাপে স্বাগতিক দুই দেশের পরিবেশটা দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন স্মিথ।
দক্ষিণ আফ্রিকা ‘চোকার’ অপবাদটা বহন করে আসছে সেই ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপ থেকে। যে আসরে বার্মিংহামে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে নাটকীয় এক ড্র’য়ে শেষ হয়ে গিয়েছিলো প্রোটিয়াদের বিশ্বকাপ মিশন। সেমিফাইনালের ওই খেলায় রান রেটে এগিয়ে থাকায় ফাইনালের টিকিট পেয়ে যায় অস্ট্রেলিয়া।
২০০৩ সালের আসরে টপ ফেভারিটের তকমা নিয়েই মাঠে নেমেছিলো স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকা। কিন্তু বৃষ্টিবিঘ্নিত খেলায় ডাকওয়ার্থ-লুইস পদ্ধতিতে শেষ হওয়া ওই খেলায় রান-রেট নিয়ে নিজেদের ভুল বোঝার কারণে গ্রুপ পর্ব থেকেই বাদ পড়ে স্বাগতিক প্রোটিয়ারা। ২০০৭ সালে সেমিফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে ফাইনালে যাওয়া হয়নি তাদের।
তবে সব বিশ্বকাপেই দক্ষিণ আফ্রিকাকে ‘চোকার’ হিসেবে দেখছেন না স্মিথ। এ ব্যাপারে সাবেক অধিনায়ক বলেন, ‘আমি যখন বিশ্বকাপের নক-আউট পর্বে দক্ষিণ আফ্রিকার হেরে যাওয়া কিছু খেলার দিকে তাকাই, তখন সত্যিকার অর্থে আমরা চোক করেছি বলে আমার মনে হয় না। আমি মনে করি আপনি যখন কোনো ম্যাচে জয়ী অবস্থায় আছেন অথচ পিছলে পড়ে গেলেন তখনই এটাকে চোক বলা যায়। লেন্স ক্লুজনারকে নিয়ে খেলা ১৯৯৯ বিশ্বকাপ ছাড়া অন্যগুলোকে এই অপবাদ দেয়া যায় না। ওই আসরে তারা জয়ী অবস্থায় থেকেও পিছলে পড়ে গিয়েছিলো। অন্যগুলোতে প্রকৃত অর্থে আমরা জয়ী অবস্থায় ছিলাম না। আসরগুলোতে তারা ভালো খেলতে পারিনি, নিজেদের মতো করে খেলতে পারেনি তারা এবং যার ফলে পরাজয়ের মতো ঘটনা ঘটতেই পারে।’—ক্রিকইনফো
