ভাগ্যবান ৩০ উদ্যোক্তা

আপডেট : ২৮ জানুয়ারি ২০১৫, ০০:৩৪

তারা ৩০ জন অতি ভাগ্যবান। তাদের জন্য প্রচলিত নিয়মের বাইরে বিশেষ সুবিধা দেয়া হল। কারণ, চলমান হরতাল-অবরোধে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ব্যাংক ঋণের কিস্তি শোধ করতে পারছেন না। এদের প্রত্যেকের নেয়া ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ন্যূনতম ৫শ’ কোটি টাকা।

গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় এই সিদ্ধান্ত দিয়ে নতুন নীতিমালা জারি করতে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এর আলোকে আরো সুবিধা পাবেন এসব উদ্যোক্তা। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে ৫শ’ কোটি টাকার বেশি ঋণ রয়েছে এমন উদ্যোক্তা ও শিল্প মালিকের সংখ্যা কমবেশি ৩০ জন। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, এসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক ১২ বছরের জন্য ঋণ পুনর্গঠনের সুযোগ পাবেন। তলবি ও চলমান ঋণের ক্ষেত্রে তা ছয় বছরে বেশি হবে না।
যদিও এ সুযোগ তারা একবারই পাবেন বলে জানা গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই নীতিমালার আওতায় আরো যেসব বিষয় বিবেচনার জন্য রেখেছে তার মধ্যে রয়েছে, ঋণের সুদহার নতুন করে নির্ধারণ, ডাউন পেমেন্ট, কিস্তি ও গ্রেস পিরিয়ডের বিষয়। এতে সুদ হার হবে তহবিল ব্যয়ের চেয়ে কমপক্ষে ১ শতাংশ বেশি। এসব বিষয় নির্ধারণের সার্বিক দায়িত্ব থাকবে ঋণদাতা ব্যাংকের উপর। আর পুনর্গঠন সুবিধা নেয়ার পর কোনো উদ্যোক্তা ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে দেউলিয়া আইনে মামলা করে সমুদয় পাওনা আদায়ের ক্ষমতাও থাকবে ব্যাংকের হাতে। চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত এ সুবিধা গ্রহণের আবেদন করা যাবে।
এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের ২১ ডিসেম্বরের বোর্ড সভায় কয়েকটি বড় গ্রুপের ঋণ কেস-টু-কেস ভিত্তিতে পুনর্গঠনের প্রস্তাব আসে। সেখানে দেশের শীর্ষ ২০ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ঋণের একটি তালিকা উপস্থাপন করা হয়। তাতে দেখানো হয়, এসব গ্রুপে বড় ধরনের কর্মসংস্থান রয়েছে। এ ২০ গ্রহীতার কাছে বিভিন্ন ব্যাংকের ৫৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই উদ্যোগের তীব্র সমালোচনা করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাদের স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে? তাহলে কি ৫শ’ কোটি টাকার কম ঋণ রয়েছে এমন উদ্যোক্তারা ক্ষতির শিকার হচ্ছেন না?
পত্রিকার পাতা উল্টালেই দেখা যায়, প্রতিনিয়তই ব্যবসায়ীরা ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। শুধু যে ব্যাংক ঋণ নিয়ে যারা ব্যবসা করছেন তারা নয়, যে লোকটি রাস্তার ফুটপাতে ব্যবসা করছেন নিজের জীবিকার জন্য তিনিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। যেহেতু অসংগঠিত খাত, তা বাদ দিয়ে বলতে হয় যারা ব্যাংক ঋণ নিয়ে ব্যবসা করছেন তারা সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
অবরোধ-হরতালে উত্পাদিত পণ্য পরিবহনে সংকট দেখা দেয়ায় কারখানা মালিক থেকে শুরু করে পরিবহন খাতও লোকসানের মুখে পড়েছে। এমন কোন খাত নেই, যা চলমান রাজনৈতিক সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। এ অবস্থায় একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে কেন এই বিশেষ সুবিধা দেয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিল তা প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। খোদ ব্যাংকিং খাতেও গতকাল এটি ছিল আলোচ্য বিষয়। যেসব খাতে প্রতিনিধি কিংবা শক্তিশালী লবিং করার লোক নেই, তারা কি কোন সুবিধাই পাবে না?
সাংবাদিকদের কাছে নীতিমালার বিস্তারিত তুলে ধরেন ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী। তিনি জানান, যেসব ঋণ গ্রহীতা অপরিহার্য কারণে যথাসময়ে ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না, ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেগবান হচ্ছে না, তাদের ঋণ পরিশোধের জন্য কিছুটা নীতি সহায়তা প্রদানের উদ্দেশ্যে পুনর্গঠন নীতিমালা জারির সিদ্ধান্ত হয়েছে। ভারত, শ্রীলংকা ও ফিলিপাইনের নীতিমালা পর্যালোচনা করেই এ নীতিমালা করা হয়েছে। সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট টিমের সভায় অনুমোদনের পরই পর্ষদে নীতিমালাটি অনুমোদন হয়েছে।
তিনি জানান, এক হাজার কোটি টাকার কম পুনর্গঠিত ঋণের ডাউন পেমেন্টের হার হবে সবোর্চ্চ ২ শতাংশ ও তদুর্ধ্বের জন্য ১ শতাংশ। তহবিল ব্যয়ের চেয়ে ১ শতাংশ বেশি হবে পুনর্গঠিত ঋণের সুদের সর্বনিম্ন হার।
এ সুবিধাপ্রাপ্ত গ্রাহক প্রথম তিনবছর কোন নগদ লভ্যাংশ দিতে পারবেন না। পুনর্গঠিত ঋণ ‘স্পেশাল মেনশন  হিসেবে’ শ্রেণিকৃত হবে এবং অতিরিক্ত ১ শতাংশ সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে হবে।
পুনর্গঠিত ঋণের কিস্তির মেয়াদ হবে তিন মাস, পরপর কেউ দুটি কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে সুবিধা বাতিল হয়ে প্রচলিত নীতিমালা অনুযায়ী খেলাপি হয়ে যাবেন। এসব ঋণ আদায়ে দেউলিয়া আইন ১৯৯৭ এর আওতায় মামলা করা যাবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি সূত্র এই সিদ্ধান্তকে ‘কিছু ধনিক গোষ্ঠী’র সুবিধা বলে আখ্যা দিয়ে বলেছেন, রাজনৈতিক সহিংসতায় সবাই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কোন কোন উদ্যোক্তা রয়েছেন যারা কষ্ট করে হলেও ঋণের কিস্তি দিয়ে গেছেন খেলাপি হওয়ার ভয়ে। তাহলে তারা কী পেল? এধরনের সিদ্ধান্ত সব ঋণ গ্রহীতাদের জন্যই নেয়া উচিত।

সূত্রমতে, বাংলাদেশে ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান নেই বললেই চলে। মাঝারি মানের শিল্প প্রতিষ্ঠান চালাতে গিয়ে বেশিরভাগ উদ্যোক্তারই প্রাথমিক ঋণ দেড়শ’ থেকে তিনশ কোটি টাকার মধ্যে। কিংবা এর কম অংকের ঋণ নিলেও পরবর্তীতে তা সুদাসলে বেড়ে কয়েকগুণ হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে ৫শ’ কোটি টাকা সিলিং নির্ধারণ মানেই হাতেগোনা কয়েকজনকে সুবিধা দেয়া যা মোটেই ন্যায্য নয়। এই সূত্র জানান, কেউ যদি ৫ কোটি টাকাও ঋণ নিয়ে থাকেন, সেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন চলমান রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে। তাহলে তার জন্য কি কোন সুবিধাই থাকবে না? কমপক্ষে সুদের হার কমিয়ে আনা কিংবা কিস্তি পরিশোধের ক্ষেত্রে সময়সীমা বাড়িয়ে কিছুটা প্রণোদনা তো দেয়া যেত? এধরনের একপেশে সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন করেছে।