এ যেন বিশ্বকাপের ফাইনালের আগে আরেক ফাই-নাল। ক্রিকেটের মহাযুদ্ধ। খেলো-য়াড় ও দর্শকদের স্নায়ুর পরতে পরতে উত্তেজনা ছড়ানো এক খেলা। ক্রিকেট বিশ্বের সবচাইতে বড় ম্যাচ যাতে প্রতিদ্বন্দ্বী শিরোপাধারী ভারত ও তাদের পড়শি গেলবারের সেমিফাইনালিস্ট পাকিস্তান। যদিও ১৯৮৩ ও ২০১১ সালের চ্যাম্পিয়ন ভারত এবং ১৯৯২ বিশ্বকাপ জয়ী পাকিস্তান এবারের আসরে শুরুতেই মুখোমুখি হয়ে গেল।
অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেড ওভালে আজ বাংলাদেশ সময় সকাল সাড়ে ৯টায় খেলাটি শুরুর প্রাক্কালে ভারতের চেষ্টা থাকবে বিশ্বকাপের খুবই গর্বের রেকর্ড ধরে রাখা। অপরদিকে পাকিস্তানের লক্ষ্য হবে ভারতের কাছে বিশ্বকাপের পাচ লড়াইয়ের সবক’টিতে হারের পর এবারের আসরে ঘুরে দাঁড়িয়ে ইতিহাস গড়া। তাদের জন্য সুবিধাজনক হতে পারে কিংবদন্তী ব্যাটসম্যান শচীন টেন্ডুলকারের অনুপস্থিতি। ভারতের পাঁচটি জয়েই তিনবার ম্যান অব দ্য ম্যাচ হয়েছিলেন শচীন।
গড়পরতা ক্রিকেটামোদীদের জন্য অবশ্য ভারত পাকিস্তানের এ লড়াই উত্সবের মতো। অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেড ওভাল তাই হয়ে উঠবে অনেক বেশি উপমহাদেশীয়। ভারতের তেরঙ্গা ও পাকিস্তানের চাঁদ তারা জার্সিতে গ্যালারি ভর্তি সমর্থকরা সুরে, রূপে, রসে মাতোয়ারা হয়ে উঠবেন। টেলিভিশন পর্দার বাইরে যারা মাঠে হাজির থাকবেন তাতে কণ্ঠে ক্ষণে ক্ষণে শোনা যাবে ‘ইন্ডিয়া জিতেগা’, ‘পাকিস্তান জিতেগা’ ধ্বনি। আয়োজকরাও আশা করছেন খেলাধূলার ইতিহাসে এ ম্যাচটিই হয়তো সবচেয়ে বেশি টেলিভিশন দর্শক টানতে যাচ্ছে।
দু’ দলের কাছেই বিশ্বকাপ জেতার চাইতেও বড় এ ম্যাচের জয়। দু’ দলের ক্রিকেট ও রাজনৈতিক বৈরিতার সাথে খাপ খায়, এমন কিছু খেলার দুনিয়া দ্বিতীয়টি নেই। ক্রিকেটের বিশ্ব সংস্থা আইসিসি দু’দলের খেলার টিকেট ছাড়ার ২০ মিনিটের মধ্যে তা বিক্রি হয়ে যায়। তাই সাম্প্রতিক সময়ে ভারত ও পাকিস্তান ব্যাট বলে খুব একটা ভাল ফর্মে না থাকলেও এ লড়াইকে ঘিরে দারুণভাবে উজ্জীবিত। তবে জয়হীন পাকিস্তান যে বেশি চাপে থাকবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। গত ক’দিনে দল দুটির সাবেক তারকাদের কথাবার্তায় তা পরিষ্কার।
এর মধ্যে পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক, কোচ ও বর্তমানে প্রধান নির্বাচক মঈন খান জানিয়েছেন এটা হলো তার দলের জন্য নয়া ইতিহাস গড়ার সুযোগ। ভারতের বিরুদ্ধে ১৬টি সীমিত ওভার ম্যাচ খেলে সাতটিতে জেতা পাকিস্তান অধিনায়ক মিসবাহ উল হকও মনে করেন তার তরুণ খেলোয়াড় সময়ের চাহিদা মেটাতে সক্ষম হবে। তবে তিনি এও জানান যে ‘অবশ্যই ভারত পাকিস্তান লড়াই সবসময়েই চাপের ব্যাপার।’
ভারতীয় অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি জানিয়েছেন, অতীত রেকর্ড আজকের লড়াইয়ে অপ্রাসঙ্গিক। তাই তিনি দলের বোলারদের ঘুরে দাঁড়ানো আহ্বান জানিয়েছেন কালকের সংবাদ সম্মেলনে। ধোনির দল অবশ্য ব্যাটসম্যানদের নিয়েও দুশ্চিন্তায় রয়েছে। ২০১১ সালের বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে দুই দলের সর্বশেষ মোকাবেলায় মোহালিতে পাকিস্তানকে হারানোর পর শ্রীলংকাকেও পরাস্ত করে শিরোপা জয়ী দলটির কেবল চারজন আছেন এবার ধোনির পাশে।
গত রবিবার এ মাঠেই প্রস্তুতি ম্যাচ খেলেছিল ভারত। সে খেলায় শিখর ধাওয়ানের ব্যাটে রানের ঝলক দেখা গেছে। এখন দেখার পালা দলটির মুল ব্যাটসম্যান বিরাট কোহলি কতটা জ্বলে উঠতে পারেন। বোলিংয়ে উমেশ যাদব, মোহিত শর্মা ও মোহাম্মদ শামির পেস বোলিংয়ের পাশাপাশি স্পিনারদেরও দাপট দেখাতে হবে। সেটা শুধু রান আটকানোর জন্য নয়, উইকেট দখল করে বিপক্ষকে আগাম চাপে ফেলতেও।
মিসবাহ উল হকের পাকিস্তান দল অবশ্য ইতিহাস গড়াটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নিতে যাচ্ছে। কেননা তাদের হাতছানি দিচ্ছে বিশ্বকাপে ভারতকে হারানো প্রথম পাকিস্তান দল হবার সৌভাগ্য। বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়কে হারালেও পাকিস্তানকে এখনো দাপুটে দল মনে হচ্ছে। শহিদ আফ্রিদি ব্যাটে রানের দেখা পেলে তা দু’দলের মধ্যে পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। তাছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে মিসবাহর নেতৃত্বে পাকিস্তান দল একটা ইস্পাত কঠিন মনোভাব গড়ে তুলেছে।
ইউনিস খানের প্রত্যাবর্তনে বিশ্বকাপের অতীত দলগুলোর চাইতে অনেক বেশি স্থিরতা এসেছে মিসবাহ বাহিনীর মধ্যে। তাছাড়া দলে আছেন মোহাম্মদ ইরফানের মতো ফাস্ট বোলার যাকে সামলাতেই সম্প্রতি বিশেষ অনুশীলন করেছেন ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা। কেননা এই বোলার বল ফেলেন নয় ফুট উপর থেকে। অস্ট্রেলিয়ার বাউন্সি উইকেট তার জন্য সহায়ক হতে পারে। তিনি যদি ৮০ ভাগ সক্ষমতায়ও থাকেন সেক্ষেত্রে দেখার বিষয় হবে ভারতীয় ওপেনাররা তাকে কতটা ও কিভাবে সামাল দেন।
বিশ্বকাপে ভারত-পাকিস্তানের পাঁচটি ম্যাচ
৫ম বিশ্বকাপ ১৯৯২ সিডনি: ভারত ৪৩ রানে জয়ী
৬ষ্ঠ বিশ্বকাপ ১৯৯৬ ব্যাঙ্গালুরু: ভারত ৩৯ রানে জয়ী
৭ম বিশ্বকাপ ১৯৯৯ ম্যানচেস্টার: ভারত ৪৭ রানে জয়ী
৮ম বিশ্বকাপ ২০০৩ সেঞ্চুরিয়ান: ভারত ৬ উইকেটে জয়ী
১০ম বিশ্বকাপ ২০১১ মোহালি: ভারত ২৯ রানে জয়ী
দল বেছে নেয়া হবে যাদের মধ্য থেকে
ভারত: মহেন্দ্র সিং ধোনি (অধিনায়ক ও উইকেটরক্ষক), শিখর ধাওয়ান, রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলি, আজিঙ্কা রাহানে, সুরেশ রায়না, আম্বাতি রাইদু, রবীন্দ্র জাদেজা, রবীচন্দ্রন অশ্বিন, অক্ষর প্যাটেল, মোহাম্মদ সামি, উমেশ যাদব, ভুবনেশ্বর কুমার, স্টুয়ার্ট বিনি ও মোহিত শর্মা।
পাকিস্তান: মিসবাহ উল হক (অধিনায়ক), আহমেদ শেহজাদ, নাসির জামশেদ, সরফরাজ আহমেদ, ইউনুস খান, হারিস সোহেল, উমর আকমল, শোয়েব মাকসুদ, শহিদ আফ্রিদি, ইয়াসির শাহ, মোহাম্মদ ইরফান, রাহাত আলী, এহসান আদিল, সোহেল খান, ওয়াহাব রিয়াজ।
