ম্যাচের শুরু থেকেই আফগানদের শরীরী ভাষায় ফুটে উঠছিল আত্মবিশ্বাস। পক্ষান্তরে প্রথম দিকে বাংলাদেশ দলকে মনে হচ্ছিল বেশ নার্ভাস। কিন্তু টসে জিতে কয়েক ওভার খেলার পর থেকেই মাঠ হয়ে যেতে শুরু করে বাংলাদেশের। সাকিব আল হাসান আর মুশফিকুর রহীম—বাংলাদেশের সবচেয়ে অভিজ্ঞ দুই ব্যাটসম্যানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ দ্রুত এগুতে থাকে সামনের দিকে। শেষে ২৬৭ রানের টার্গেট দিয়ে আফগানদের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয় বাংলাদেশ।
এই মাঠে ২৬৭ রান ক্রিকেটবোদ্ধাদের কাছে খুব বেশি না হলেও সেটিই কাল হয়ে যায় আফগানিস্তানের জন্য। শেষ পর্যন্ত ১০৫ রানের ব্যবধানে টাইগারদের কাছে হার মানে আফগানরা। জয় দিয়েই শুরু হয় বাংলাদেশের বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নযাত্রা। এবারের বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচে জয়ী হয় বাংলাদেশ।
রানের হিসেবে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের এটিই সবচেয়ে বড় জয়। এর আগে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জয় ছিল ২০০৭ সালে। ওই বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ৬৭ রানে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। আর উইকেটের হিসেবে সবচেয়ে বড় জয় ছিল ২০০৭ সালে। একই বিশ্বকাপে বারমুডাকে ৭ উইকেটে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। এবারের বিশ্বকাপে প্রথম দিনেই শুধু বিরাট রানের জয়ই নয়, এটি খুলে দিয়েছে কোয়ার্টার ফাইনালে যাবার পথরেখাও। যে পথ ধরে একসময় ফাইনালে পৌঁছানোর স্বপ্ন এখন দেখতেই পারে টাইগাররা।
টেলিভিশনে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের ক্রিকেট খেলা দেখতে গিয়ে অনেক সময় স্টেডিয়ামের দিকে তাকিয়ে হোচট খেতে হয়েছে। যেভাবে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাংলাদেশের নানা বয়সের মানুষ জাতীয় পতাকা নিয়ে মাঠে ছিলেন তাতে মনে হয়েছে টাইগারদের জয় রুখা কঠিন হবে। স্টেডিয়ামে বসে সারাক্ষণ বাংলাদেশী দর্শকরা প্রেরণা জুগিয়েছেন টাইগারদের। সাড়ে ১৩ হাজার ধারণ ক্ষমতার ক্যানবারো স্টেডিয়ামে প্রায় অর্ধেক দর্শকই ছিলেন বাংলাদেশি। অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন এলাকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে তারা ছুটে গেছেন বিশ্বকাপে বাংলাদেশের খেলা দেখার অংশীদার হতে। উত্সাহ জুগিয়েছেন দেশের টাইগারদের।
আর তাই আফগানিস্তানকে হারাতে অসাধারণ ভূমিকা পালনকারী মুশফিকুর রহীম খেলা শেষে তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, বিশ্বকাপের প্রথম খেলা অষ্টেলিয়ায় হলেও মনে হয়েছে আমরা দেশের মাটিতেই খেলছি। দেশের বাইরে কোন স্টেডিয়ামে এত বেশি বাংলাদেশি দর্শক থাকায় তিনি কৃজ্ঞগতা জানান তাদের প্রতি। এ খেলাতে বাংলাদেশ জেতার পাশাপাশি ম্যান অফ দ্য ম্যাচের গৌরব অর্জন করেছেন মুশফিক। এ জয়ের ধারা অব্যাহত রাখতে সকলের সমর্থন দোয়াও চান তিনি।
প্রায় দেড় মাস ধরে দেশে নানা দুঃসংবাদের পর কাল অনেকটা আকস্মিকভাবেই এ জয় যেন এক পশলা স্বস্তির বাতাস বইয়ে দেয়। একটু হাঁফ ছেড়ে উঠেন অনেকে। কারণ গত ৫ জানুয়ারি থেকে দেশে রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে যে টানা হরতাল-অবরোধ-পেট্রোল বোমা, খুন-খারাবি, সন্ত্রাস চলছে তা সাধারণের জন্য চরম অস্বস্তিকর। ছাত্ররা স্কুলে যেতে পারছে না, স্কুলগুলো বন্ধ হয়ে আছে অনিদিষ্টকালের জন্য। রাস্তা-ঘাটে বিরাজ করছে নিরাপত্তাহীনতা। কবে যে এ অস্বস্তি আর আতংকজনক অবস্থার অবসান হবে তা কেউ বলতে পারছেন না।
এমনকি অনেকে এখন এমনও আভাস দিচ্ছেন যে এ পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরেও চলতে পারে। মেনে নিতে হতে পারে এ অস্বস্তি আর উদ্বেগভরা ক্ষণগুলো আরো বেশকিছুদিন। ইতিমধ্যে শতাধিক প্রাণ ঝরে গেছে সন্ত্রাসীদের হামলায়। কখনও ক্রসফায়ারে। আগুনে পুড়ছে মানুষ। পোড়া মানুষের গন্ধ এখন হাসপাতালগুলোতে। একমাত্র ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বার্ন ইউনিটেই আগুনে পোড়া শতাধিক মানুষ মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে।
এ চরম বীভত্সতার মধ্যেও বাংলাদেশের টাইগারদের জয়ে একটু শান্তির পরশ পাওয়া গেছে। অন্তত রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে টানা হরতাল-অবরোধ আহ্বানকারী বিএনপি চেয়ারপারসনও বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। এটাও বিশ্বকাপ জয়ের চেয়ে কম পাওয়া নয়!
আগামী ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে বাংলাদেশ দ্বিতীয় খেলায় লড়বে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে। কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধেও নিশ্চয়ই কালকের মত কোমর বেঁধে মাঠে নামবে বাংলাদেশের টাইগাররা। কারণ তাদের ব্যাটে যে স্বপ্ন জয়ের ইতিহাস শুরু হয়েছে তা এগিয়ে নিতে হবে অনেক দূর। তাদের বিশ্বকাপ আসরের সাফল্য বাংলাদেশের বর্তমান বৈরী পরিস্থিতিতে যদি কিছুটা শান্তির বাতাস দিতে পারে, তাও কম কি। টাইগারদের স্বপ্নের জয়যাত্রার এই পথে বাংলাদেশের ষোল কোটি মানুষের শুভকামনা।
লেখক :সাংবাদিক
