ড. অভিজিত্ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ১০ সন্দেহভাজনের নাম এফবিআইয়ের হাতে দিয়েছে তদন্ত সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। গ্রেপ্তারকৃত ফারাবির মতো এই ১০ জনও বিভিন্ন সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অভিজিতকে হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিল। ফারাবিকে জিজ্ঞাসাবাদ ও ফারাবির ফেসবুক-ব্লগ এবং অভিজিতের ফেসবুক ঘেঁটে এসব তথ্য উদ্ঘাটন করেছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। ফেসবুকে বিভিন্ন পরিচয়ে দেয়া এসব হুমকিদাতার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। ফেসবুক থেকে তথ্য সংগ্রহের এই কাজে তদন্ত সংশ্লিষ্টদের সহায়তা করছে এফবিআই। গতকাল এফবিআইয়ের চার সদস্য উইলিয়াম ফ্রাঙ্ক, ড্যান ক্লেগ, জাগদি সিং খাংগুরা ও ক্রিস্ট পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ- সিআইডির ক্রাইম সিন দলের সদস্যের সঙ্গে বৈঠক করেন। ঘটনার পরপরই ক্রাইম সিনের একটি টিম ঘটনাস্থল থেকে বেশ কিছু আলামত সংগ্রহের পর পরীক্ষা করে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও যুগ্ম কমিশনার (গোয়েন্দা) মনিরুল ইসলাম জানান, ১০ সন্দেহভাজনের একটি তালিকা করা হয়েছে। তাদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। পরিচয় সনাক্তের পর তাদের গ্রেপ্তার করা হবে। তিনি বলেন, আলোচিত এ হত্যার ঘটনায় এখন পর্যন্ত শফিউর রহমান ফারাবি ছাড়া আর কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। তাকে ১০ দিনের রিমাণ্ডে নিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তবে রিমাণ্ডের শুরু থেকেই ফারাবি বলছে, সে শুধু ফেসবুকে অভিজিেক হত্যার হুমকি দিয়েছিল। সরাসরি হত্যাকাণ্ডে সে জড়িত নয়। ফারাবির তথ্যের ভিত্তিতে ফেসবুকে অভিজিেক হত্যার হুমকিদাতা আরো ১০ জনের নাম জানা গেছে। তদন্তে সহযোগিতার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে অবস্থানকারী ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (এফবিআই) ওই ১০ জনের নাম জানানো হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এফবিআই।
মনিরুল ইসলাম জানান, গত ১০ দিনেও অভিজিতের খুনিরা ধরা না পড়লেও ডিবির তদন্তে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে এফবিআই। তিনি বলেন, এফবিআই প্রাথমিকভাবে মনে করছে এটা কোনো ‘এক্সট্রিমিস্ট গ্রুপের’ কাজ। এফবিআইয়েরও ধারণা, হত্যাকাণ্ডে জঙ্গিরা জড়িত থাকতে পারে।’
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, অভিজিত্ হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাস্থল থেকে যে আলামত উদ্ধার করা হয়েছে সেখানে একটি কালো ব্যাগের ভেতর অন্যান্য আলামতের সঙ্গে একটি ইঞ্জেকশান পাওয়া গিয়েছে। ইঞ্জেকশানের সঙ্গে এন্টি ক্লটিং অ্যাম্পুলও ছিল। এই ইঞ্জেকশান দেয়া হলে ক্ষত থেকে রক্ত বেরুনো বন্ধ করা যায় না। খুনিদের পরিকল্পনা ছিল যদি অভিজিতের মৃত্যু ছুরিকাঘাতে না হয় তাহলে ইঞ্জেকশান পুশ করে মৃত্যু নিশ্চিত করা। তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, কয়েক মাস আগে মিরপুরের মনিপুর স্কুলের দুই শিক্ষককে হত্যা চেষ্টায় আটককৃতদের কাছেও একই ধরনের ইঞ্জেকশান পাওয়া গিয়েছিল। ওই শিক্ষকদ্বয়ের বিরুদ্ধে এক স্কুলছাত্রীর হিজাব পরা নিয়ে কটূক্তির অভিযোগ ছিল। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এসব উগ্রপন্থি একই ধারার অনুসারী। কিন্তু তারা ‘স্লিপার সেল’-এর মতো করে কাজ করায় একটি গ্রুপ অন্য গ্রুপকে চেনে না।
মামলার অন্যতম তদন্ত তদারক কর্মকর্তা ডিবির (দক্ষিণ) উপপুলিশ কমিশনার কৃষ্ণপদ রায় জানান, অভিজিত্ হত্যাকাণ্ডের পর সংগৃহীত আলামত আমেরিকায় নিয়ে পরীক্ষা করা হতে পারে। এ বিষয়ে আদালতের অনুমতি নিয়েই পরীক্ষার জন্য পাঠানো হবে। কৃষ্ণপদ রায় বলেন, ‘অভিজিত্ রায় যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক, ভবিষ্যতে এফবিআই চাইলে তাদের নিজ দেশেও এই ঘটনায় মামলা করতে পারে। তারা তখন যদি আমাদের সহায়তা চায়, আমরা করব।’
প্রসঙ্গত, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে বইমেলা থেকে ফেরার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি মোড়ের বিপরীতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান গেট সংলগ্ন ফুটপাতে দুর্বৃত্তরা চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখম করে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক লেখক দম্পতি ড. অভিজিত্ রায় ও তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাকে। পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পর মৃত্যু হয় অভিজিতের। গুরুতর আহত বন্যাকে প্রথমে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গত ৩ মার্চ উন্নত চিকিত্সার জন্য তাকে যুক্তরাষ্ট্রে নেয়া হয়েছে।
