মানুষের বাড়ি মিল্কিওয়ে ছায়াপথের শেষ প্রান্তের তারাগুলো ভীষণ গতিতে ঘুরছে। মাধ্যাকর্ষণ শক্তির টান উপেক্ষা করে কক্ষপথ থেকে ছিটকে পড়ে যাবার কথা। কেউ বলছেন সেখানে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি অনেক বেশি আবার বেশিরভাগ পদার্থবিদের মতে অদৃশ্য কিছু বস্তুর বাড়তি আকর্ষণের কারণে এখানকার তারারা কক্ষপথে বেশি গতি নিয়েই ঘুরছে এবং ছিটকে পড়বে না। বিজ্ঞানীরা অদৃশ্য এই বস্তুর নাম দিয়েছেন ডার্ক ম্যাটার। প্ল্যাঙ্কের তৈরি করা কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড (CMB) অনুযায়ী আমাদের মহাবিশ্বের ডার্ক এনার্জি ৬৮.৩ ভাগ, ডার্ক ম্যাটার ২৬.৮ ভাগ। আর এটমিক পার্টিক্যাল যা দিয়ে আমরা এবং আমাদের পরিচিত বিশ্বের উপগ্রহ, গ্রহ, নক্ষত্র, সৌরজগত্, ছায়াপথ, নীহারিকাসহ সবকিছু তা মাত্র ৪.৯ ভাগ। ধরে নেয়া হয় বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণের পর স্থান গোলকের আকৃতিতে সমবিস্তৃত হয় যেখানে বস্তু ও শক্তি সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে মহাবিশ্বের সর্বত্র তাপমাত্রা একই থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে তা নাই।
মহাবিস্ফোরণের পর ক্রমেই বিস্তৃত হওয়া বিশ্বের কোথাও কোথাও বস্তু জমাট বাঁধা অবস্থায় ছিল। যেখানে মাধ্যাকর্ষণ শক্তিও ছিল আশেপাশে তুলনামূলক ফাঁকা জায়গার চেয়ে বেশি, ফলে এই জায়গাগুলো চারপাশের অন্যান্য বস্তুকে নিজের দিকে টেনে জড় করতে থাকে। কিন্তু ধীরগতির সেই প্রক্রিয়ায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছরের মধ্যে মিল্কিওয়ের মত বড় ছায়াপথ তৈরি হওয়া অসম্ভব। তাহলে এসব ছায়াপথ কিভাবে তৈরি হলো? অদৃশ্য একটা কিছু খুব দ্রুত ছায়াপথ তৈরিতে সাহায্য করেছিল। সেই অদৃশ্য বস্তুর বাড়তি মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবেই ছায়াপথের শেষ প্রান্তের তারাগুলো ছিটকে পড়ার মত একটু বেশি গতিতে ঘুরছে কিন্তু ছিটকে পড়ছে না। পদার্থবিদেরা এই অদৃশ্য বস্তুর নাম দিয়েছেন ডার্ক ম্যাটার। আমাদের পরিচিত কোন বস্তুর সাথে ক্রিয়া করে না বলে ঠিক বলা যাচ্ছে না এটি কি, কি তার বৈশিষ্ট্য বা ধরন। বেশিরভাগেরই ধারণা ডার্ক ম্যাটার হলো এখনও পর্যন্ত অনাবিষ্কৃত কিছু সাব-এটমিক কণা যেমন ফার্মিয়ন, বোসন এবং এক্সিয়নের সমষ্টি। এদের মধ্যে এক্সিয়ন স্ট্রং ফোর্স আর উইম্পের (Weakly Interacting Massive Particle ev WIMP) মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে। সুপার সেমিট্রি (SUSY) থিওরিতে প্রথম ডওগচ কণার অস্তিত্ব ধারণা করা হয়। যেখানে দেখানো হয়েছিল যে ফার্মিয়ন একদল মৌলিক কণা বোসনের ঠিক বিপরীত বা এন্টি পার্টিক্যাল। ধারণা করা হয় এগুলো আসলে আবিষ্কৃত সাব-এটমিক কণাগুলোর সুপার পার্টনার। এদের মধ্যে সবচেয়ে হালকা কণাটির নাম নিউট্রালিনো। যেটি ব্ল্যাক ম্যাটার হতে পারে বলে অনেকেই বিশ্বাস করেন। গত বছর সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় Large Hadron Collider এ অতিউচ্চ শক্তিতে যে সংঘর্ষ ঘটানো হয়েছে তাতে এর কোনটিরই অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ২০১৫ সালে আরও উচ্চ শক্তিতে সংঘর্ষ ঘটানো হলে হয়তো কিছু পাওয়া যেতে পারে।
Harvard বিশ্ববিদ্যালয়ের লিসা রান্ডেল শুধুই নিজের সাথে ক্রিয়া করা ডার্ক ম্যাটারের একটি নতুন ধরন প্রস্তাব করেছেন। নিজের সাথে ক্রিয়া করা এধরনের ডার্ক ম্যাটার কণা প্রচলিত ডার্ক ম্যাটার কণার চেয়ে ভিন্ন বলেই তার বিশ্বাস। শুরুতে একটি দানবাকৃতির ঘূর্ণায়মান ডার্ক ম্যাটারের মেঘ খুব অল্প পরিমাণ স্বাভাবিক বস্তুর সাথে মিশে মিল্কিওয়ে ছায়াপথ সৃষ্টি হয়েছিল। যেখানে স্বাভাবিক বস্তু মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে পুরো গোলকের বিষুব রেখার চেয়ে মেরুর দিকে অনেক দ্রুত সঙ্কুচিত হতে থাকে। মেরুর দিকে কেন্দ্রবিমুখী শক্তি মাধ্যাকর্ষণের বিপরীতে কাজ করে। ফলে মিল্কিওয়ে ছায়াপথটি একটি পাতলা সমতল ডিস্কের আকৃতি পায়। পরে এগুলো ভাগ ভাগ হয়ে সৃষ্টি হয় নক্ষত্র। এ সময় দুটি ঘটনা ঘটে। প্রথমতঃ প্রচুর তাপ তৈরি হয় যা মাধ্যাকর্ষণের ফলে বস্তুর সংকোচনকে বাধা দেয়, দ্বিতীয়তঃ স্বাভাবিক বস্তু তড়িত্চুম্বকীয় বিকিরণের মাধ্যমে তাপ নির্গমন করে ফলে সংকোচন প্রক্রিয়া চলতে থাকে। কিন্তু ডার্ক ম্যাটারের; অন্তত আমরা আলোকে যেভাবে জানি সে রকম কিছু নেই। ফলে শক্তি নির্গমনের মাধ্যমে এটি সঙ্কুচিত হয়ে ডিস্কের আকৃতিও নিতে পারেনি এবং এখনো সেটি একটি ঘূর্ণায়মান মেঘের গোলক অবস্থায়ই রয়ে গেছে। পুরো ছবিটি যা দাঁড়ায় - মিল্কিওয়ে ছায়াপথ একটি বিশাল গোলাকৃতি ডার্ক ম্যাটারের মেঘের মধ্যে একটি সমতল স্পাইরাল ডিস্ক, যেখানে সূর্যসহ অসংখ্য নক্ষত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে অবস্থান করছে।
কিন্তু লিসা রান্ডেলের মতে সমস্ত ডার্ক ম্যাটার ডার্ক ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিক ওয়েভের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে ক্রিয়া করে, শক্তি নির্গমন করে আমাদের ছায়াপথের মতই আরেকটি পাতলা সমতল ছায়াপথ সৃষ্টি করেছে। যার নাম দিয়েছেন ডাবল ডিস্ক ডার্ক ম্যাটার। তবে ডার্ক ম্যাটারের বেশিরভাগ এখনো মেঘের গোলকের আকৃতিতেই আমাদের চারপাশে রয়ে গেছে। তা ছাড়া আমাদের ছায়াপথে প্রদক্ষিণরত নক্ষত্রদের গতিকে ব্যাখ্যা করা যায় না। রান্ডেলের ধারণা উড়িয়ে দেয়া যায় না, হতে পারে আমাদের ছায়াপথের দৃশ্যমান তারাগুলোর সমান ভর নিয়ে কিছু ডার্ক ম্যাটার হয়তো আরেকটি ডিস্কে অবস্থান করছে। কারণ এটি কিছু বিতর্কের মোটামুটি একটা সমাধান দিয়েছে। যেমনঃ নাসার ‘ফার্মিগামারে’ স্পেস টেলিস্কোপে আমাদের ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে আসা ১৩০ গিগা ইলেক্ট্রন ভোল্টের বিচ্ছুরণ ধরা পড়েছে। এটি সম্ভব যদি সেখানে প্রোটনের চেয়ে ১৩০ গুণ ভারি এবং ১৩০ গিগা ইলেক্ট্রন ভোল্টের সমান শক্তির ডার্ক ম্যাটার থাকে এবং সেখানে এই ধরনের ডার্ক ম্যাটার পার্টিক্যাল এবং এন্টি-পার্টিক্যালের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এটি ছাড়া মিল্কিওয়ে ছায়াপথের কেন্দ্রে থাকা ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণ গহ্বর থেকে এই পরিমাণ শক্তি বিচ্ছুরণের অন্য কোন ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ হালকাভাবে একটি বৃত্তাকার গোলকের আকৃতিতে ডার্ক ম্যাটার ছড়িয়ে পড়লে যে ঘনত্ব হবার কথা তা থেকে এ পরিমাণ গামারশ্মির বিকিরণ সম্ভব নয়। অথচ ডাবল ডিস্কের মত করে পুরো সিস্টেমটিকে ভাবলে ডার্ক ম্যাটারকে আমরা যথেষ্ট ঘন অবস্থায় পাই এবং তার এন্টি পার্টিক্যালের সাথে সংঘর্ষের পর এরকম শক্তি নির্গমন খুবই সম্ভব।
লেখক :বিজ্ঞান বিষয়ক প্রাবন্ধিক ও প্রকৌশলী
