মানবিক বিপর্যয় নেপালে

আপডেট : ০৪ মে ২০১৫, ১৩:৪২
 
ইউনিসেফ সতর্ক করেছে, নেপালে শিশুরা সবচেয়ে ভয়াবহতার শিকার। তারা আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে। তারা সামান্য মৌলিক অধিকারটুকুও ভোগ করতে পারছে না। আরো আশঙ্কার বিষয়, কিছুদিনের মধ্যেই নেপালে বর্ষাকাল আসবে। তখন কে কোথায় যাবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। হাসপাতাল বিভিন্ন ধরনের রোগীতে পরিপূর্ণ। বিশুদ্ধ পানির স্বল্পতা দিন দিন বাড়ছে। এখনো হয়তো ধ্বংসস্তূপের মধ্যে মৃতদেহের ছড়াছড়ি। সংস্থাটি জানায়, ভূমিকম্পে অন্তত ৯ লাখ ৪০ হাজার শিশু মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এদের জরুরি ভিত্তিতে মানবিক সাহায্য প্রয়োজন। সবদিক বিবেচনা করে রোগের উত্পত্তির একটা প্রধান গ্রাউন্ড হয়ে উঠছে নেপাল।
 
মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র দেখা যায় কাঠমান্ডুর পশুপতিনাথ মন্দিরের কাছে গেলে। বাগামাতী নদীর তীরে গড়ে ওঠা এই মন্দিরের কাছে বাস করেন ৫৩ বছর বয়সী কৃষ্ণা ঘিমেরি। তিনি এখন মন্দিরের অন্যতম ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব। তিনি জানান, ‘গত ২৫ বছর ধরে আমি এখানে বাস করছি। কিন্তু এত মানুষের সত্কার অনুষ্ঠান করতে দেখিনি। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে মৃতদের সত্কার করতে পারলেই যেন সবাই বাঁচেন। ভূমিকম্পের পরদিন রবিবার সেখানে ২শ’ মানুষের শেষকৃত্য অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছে। মঙ্গলবার হয়েছে শতাধিকের। এই দিনটি খুবই বিষাদময় ছিল আমার কাছে। কারণ একটি গাড়িতেই এসেছে ২০টি মৃতদেহ। অথচ মৃতদেহ সত্কারের জন্য সামান্য পরিমাণ জায়গাও ফাঁকা ছিল না। তাই আমরা একটির উপর আরেকটি মৃতদেহ দিয়ে সত্কার করি। কিছু মৃতদেহ আবার কাছের বনে রেখে দিই পরের দিনের জন্য’। কৃষ্ণা ঘিমেরির কথার মিল পাওয়া যাবে তেকরা লিম্বু নামের এক ব্যক্তির কাহিনী জানলে। লিম্বু তার পরিবারের ছয় সদস্যকে হারিয়েছেন। আর তাদের সত্কার করতে মন্দিরে এসেছেন তিনি। কাঠমান্ডুর ঐতিহাসিক ধারাহারা টাওয়ারে উঠেছিলেন তারা। ভূমিকম্পের মাত্র কিছুক্ষণ আগে। আরো বিস্ময়ের যে, নিহতদের মধ্যে চার সদস্য থাকেন সিঙ্গাপুরে। তারা মাত্র দুইদিন আগে নিজ দেশে বেড়াতে এসেছিলেন। সূর্য উদয় হওয়ার সাথে সাথে এই নদীর তীরে শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের জন্য মানুষের ভিড়ও বাড়ে। তবে অনেকে আবার দেবতা শিবকে ধন্যবাদ দিচ্ছেন এই জন্য যে, তিনি নিজে বেঁচে আছেন। কারণ তিনিও বেঁচে না থাকলে পরিস্থিতিটা কি হতো তা তাদের কাছে সহজেই অনুমেয়।
 
নেপাল সরকার মানুষের শেষকৃত্যের জন্য বিনা পয়সায় কাঠ সরবরাহ করছেন। আর এর কারণও কিন্তু আছে। সেটাই জানালেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লাক্ষ্মী প্রসাদ দাহাল। তিনি জানালেন আমরা এটাকে কৌশল হিসেবে নিতে বাধ্য হয়েছি। কারণ কাঠের অভাবে মৃতদেহ সত্কার করা না গেলে দুর্গন্ধের সৃষ্টি হবে এবং বিপদ আরো বাড়বে। চারদিকে রোগের জীবাণু বিস্তার লাভ করবে।
 
কাঠমান্ডুর সাংখুর কৃষ্ণা নামের এক মহিলা জানান, ‘এখানে ২৫টি বাড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। ৫০ জনের বেশি সেখানে নিহত হয়েছেন। আমরা কয়েকজন বেঁচে গেছি ভাগ্যক্রমে। ভূমিকম্পের সময় আমরা মাঠে ছিলাম। তিনি বলেন, ভূমিকম্পের পর বাড়ি ফিরে কিছুই আর অবশিষ্ট পাইনি। পরিবারের সদস্যসহ সবকিছুই হারিয়েছি। এমনকি ওই দিন যে কাপড় পরেছিলাম সেই কাপড় এখনো পরে আছি’।
 
দুই সপ্তাহ আগে হিমালয় কন্যা নেপালের মানুষ নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়ে আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মেতে উঠেছিল সেই বছরের শুরুটিই যেন তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ালো। তাদের হাসি-খুশি সব কেড়ে নিল।
 
অনেক জেলা এখনো মূল নেপাল থেকে বিচ্ছিন্ন। ত্রাণ যেটুকু মানুষের কাছে পৌঁছেছে তার বেশিরভাগই রাজধানী কাঠমান্ডুতে। কারণ রাস্তাঘাটের পরিস্থিতি এত ভয়াবহ হয়ে গেছে যে, সেখানে এতদিনেও পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। পর্বত দিয়ে ঘেরা নেপালের রাস্তাঘাট থেকে নিচে তাকালেও অনেক পর্যটক ভয় পেয়ে যাবেন। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলে যাওয়াটা সত্যিই দুষ্কর। গোর্খায় ছোট ছোট ৩০টি সম্প্রদায় আছে যাদের কাছে খাবারসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
 
নেপাল সরকার জানিয়েছে, এমনিতেই শনিবারের ভূমিকম্পে অনেক কিছু ধ্বংস হয়ে গেছে। তারপর আবার নতুন করে প্রায় প্রতিদিনই আফটারশক বা পরাঘাত আঘাত হানছে যা মানুষের মধ্যে ভয় ঢুকিয়ে দিচ্ছে। অনেকের বাড়ির কোনো ক্ষতি না হলেও তারা ভয়ে যেতে চাচ্ছেন না। ভূমিকম্পের এক সপ্তাহ আগে কাঠমান্ডুতে এক সম্মেলনে ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা গিয়ে এক সেমিনারে সতর্ক করে দিয়েছিলেন। তবে তারাও কল্পনা করতে পারেননি যে এত দ্রুত তাদের সেই আশঙ্কাটা সত্যি হবে।
 
নেপালবাসীর জন্য এখন মড়ার ওপর খাড়ার ঘাঁ হয়ে উঠেছে বৃষ্টি। কোনো কোনো দিন মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। বাড়ছে ভূমিধস। উদ্ধারকর্মীরা জানান, কোথাও কোথাও তাবু খুবই দুর্বল মানের। কারণ আপাতত বৃষ্টি থেকে শিশুদের রক্ষা করাই তাদের মূল কাজ। আর তার মধ্যেও শিশুরা হাসছে-খেলছে। গত শনিবার একটি মাঠে তৈরি করা অস্থায়ী হাসপাতালে সন্তান জন্ম দিয়েছেন এক মা। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, বিশুদ্ধ পানির পরিমাণ যেভাবে কমে যাচ্ছে তাতে সংকট আরো ঘনীভূত হচ্ছে। ডায়রিয়ার প্রকোপ বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হু হুঁশিয়ারি দিয়েছে, পরিস্থিতি এভাবে চলতে থাকলে মহামারী আকারে দেখা দিতে পারে। আর এতে ভূমিকম্পে আহতদের চিকিত্সার চেয়ে ডায়রিয়া আক্রান্ত মানুষের চিকিত্সা দেয়াটা অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে। রোগের প্রকোপ যাতে না বাড়ে সেজন্য নেপাল সরকার সাময়িকভাবে জীবজন্তু জবাই, কাঠমান্ডুর বিভিন্ন স্থানে মাংস এবং মাছ বিক্রি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখারও নির্দেশ দিয়েছে।
 
জাতিসংঘ জানিয়েছে, মানবিক সাহায্য হিসেবে নেপালের দরকার ৪১৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। তিন মিলিয়ন মানুষের খাবার প্রয়োজন। ১ লাখ ৩০ হাজার বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে। ২৪ হাজার মানুষ অস্থায়ী ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে। ২০টি দল কাজ করছে হারিয়ে যাওয়া শিশুদের পরিবারের কাছে ফেরত দেয়ার জন্য।