সৌদি আরবে রাজতন্ত্রের উত্তরাধিকার ধারায় বিরাট পরিবর্তন এনেছেন বর্তমান বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ। যেখানে রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা আবদুল আজিজ আল সৌদের ছেলেরা নন বরং তার নাতিরা উত্তরাধিকারী হচ্ছেন। ফলে নতুন এক প্রজন্মের শাসন দেখতে যাচ্ছে সৌদি আরবের মানুষ। গত বুধবার বাদশাহ সালমান তার সত্ভাই মোকরেন বিন আবদুল আজিজ বিন সৌদকে (৬৯) ক্রাউন প্রিন্সের পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছেন। তিনি বাদশাহ সালমানের উত্তরাধিকারী ছিলেন। নতুন ক্রাউন প্রিন্স হিসেবে বাদশাহ মনোনীত করেছেন নিজের ভাতিজা মোহামেদ বিন নায়েফকে। নতুন ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্স করেছেন নিজের ছেলে প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোহামেদ বিন সালমানকে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আরব অঞ্চলের নেতৃত্ব মজবুত করা ও পশ্চিমাদের সঙ্গে সম্পর্কে নতুন রূপ দেয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে এ পরিবর্তন হতে পারে।
গত জানুয়ারিতে বাদশাহ সালমান তার সত্ভাই আবদুল্লাহ বিন আবদুল আজিজের স্থলাভিষিক্ত হন। রাজপরিবারের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের অনুমোদন নিয়ে বাদশাহ সালমান ক্রাউন প্রিন্স ও ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্সের নাম ঘোষণা করেছেন। নতুন ক্রাউন প্রিন্স নায়েফ (৫৫) বাদশাহ আবদুল্লাহর পছন্দের ছিলেন। বলা হচ্ছে, মোকরেনের ব্যক্তিগত অনুরোধে এই পরিবর্তন আনা হয়েছে। কূটনীতিকরা বলছেন, সৌদি রাজপরিবারের অন্য যেকোনো জ্যেষ্ঠ ব্যক্তির চেয়ে নায়েফের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক অনেক ভালো। দেশের ভেতরে যেমন, তেমনি পশ্চিমা বিশ্বেও বেশ পরিচিতি আছে তার। বিশেষ করে আল কায়েদা দমনে ভূমিকার জন্য তিনি বেশি পরিচিত।
ক্রাউন প্রিন্স নিয়োগ ছাড়াও পররাষ্ট্র, শ্রম, স্বাস্থ্য ও অর্থমন্ত্রীর পদে পরিবর্তন এনেছেন বাদশাহ সালমান। প্রায় চার দশকের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৌদ আল-ফয়সালকে সরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে দেশটির রাষ্ট্রদূত আদেল আল-জুবায়েরকে নিয়োগ করা হয়েছে। রাজপরিবারের বাইরে থেকে দ্বিতীয় ব্যক্তি হিসেবে এ দায়িত্ব পেলেন তিনি।
সৌদি আরবের উত্তরাধিকার ধারায় এই পরিবর্তনকে নানাভাবে বিশ্লেষণের চেষ্টা চলছে। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি বিষয়ক বিশ্লেষক থিয়োডর কারাসিকের মতে, প্রতিদ্বন্দ্বীদের একটু সমস্যায় ফেলতে রিয়াদ এখন মিত্রদের সঙ্গে দ্রুত কাজ করবে। আর নতুন প্রজন্ম অনেক বেশি দৃঢ় প্রত্যয়ী। তারা শুধু কথায় নয় কাজেও প্রমাণ করতে চাইবে।
ক্রাউন প্রিন্স বিন নায়েফের পরিচিতি রয়েছে অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবাদ শক্ত হাতে দমনের জন্য। যুক্তরাষ্ট্রে লেখাপড়া করা যুবরাজ নায়েফের রাজপরিবারের তরুণ প্রজন্মের ওপরও ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। সৌদি আরবের সেন্টার ফর ডেমোক্রেসি অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের পরিচালক আলী আল-ইয়ামির মতে, মোকরেনের চেয়ে যুবরাজ নায়েফ ভালো হবেন কি না সেটা বিষয় নয়। তবে তার অতীত অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণ ও কর্মকাণ্ড দেখে যে কেউ ধারণা করতে পারেন তিনি বাবার শাসন পদ্ধতিই প্রয়োগ করবেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তন মানবাধিকার কর্মী ও রাজনৈতিক সংস্কারদের জন্য ভালো কোনো খবর নয়। কারণ বিন নায়েফ আগেই অনেক ক্ষমতাবান ছিলেন। সন্ত্রাসবাদ ও আল কায়েদাকে পরাজিত করতে পারার ব্যক্তি হিসেবে তিনি নিজেকে আগেই প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার জন্য তিনি আগে থেকেই পরিচিত এবং হয়তো সেই ধারা অব্যাহত রাখবেন। বিশেষ করে ইয়েমেনের ক্ষেত্রে। যেখানে একটি বড় যুদ্ধে জড়িয়ে রয়েছে সৌদি আরব।
বিন নায়েফ দেশের ভেতরে-বাইরে পরিচিত মুখ হলেও ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্স মোহামেদ বিন সালমান চার মাস আগেও তেমন পরিচিত ছিলেন না। প্রিন্স সালমানের বয়স মাত্র ৩০ বছর। ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোট বাহিনীর অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন তিনিই। এক পশ্চিমা কূটনীতিকের মতে, সৌদি আরবের অত্যন্ত ক্ষমতাধর ব্যক্তি তিনি। দেশের গুরুত্বপূর্ণ সব বিষয়ই তিনি দেখভাল করেন।
থিয়োডর কারাসিকের মতে, বিন সালমান বয়সে তরুণ হতে পারেন। তবে তিনি সেই সব সৌদি নাগরিকের নেতা যারা শক্ত নেতৃত্ব ও আঞ্চলিক ক্ষেত্রে দেশের বড় ভূমিকা দেখতে চান। প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে তিনি তার সক্ষমতা আরো বৃদ্ধির সুযোগ পাবেন।
গত প্রায় চার দশক পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা যুবরাজ সৌদ আল-ফয়সালকে সরিয়ে একজন কূটনীতিকের নিয়োগও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ২০০৭ সাল থেকে জুবায়ের যুক্তরাষ্ট্রে সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেছেন। ওয়াশিংটনে আরব সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক খলিল জাহশানের মতে, রাজপরিবারের বাইরে কাউকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিয়োগ দেয়ার অর্থ এই নয় যে এতে সৌদি আরবের পররাষ্ট্র নীতিতে বিরাট পরিবর্তন আসছে। আল-জুবায়ের আরবের নতুন কূটনীতিকদের প্রতিনিধিত্বকারী। সৌদি বাদশাহ সালমান চান তার নতুন মেধাবী কূটনীতিকদের ব্যবহার করে সৌদি আরবের স্বার্থকে সম্প্রসারিত করতে।
তবে সৌদি রাজনৈতিক গবেষক মনসুর আল-মারজোকির মতে, এই পরিবর্তনের তাত্ক্ষণিক কিছু ফল আসবে। বিশেষ করে পররাষ্ট্রনীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে। আগামী বছরগুলোতে নতুন হস্তক্ষেপমূলক নীতি দেখা যেতে পারে। বিশ্লেষকরা বলছেন, উত্তরাধিকারের এই পরিবর্তন সৌদি আরবের ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে এসেছে। দেশটি যেসব কঠোর নীতি নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে তাতে শক্তিশালী ও তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্ব দরকার। যারা দ্রুত এসব নীতি বাস্তবায়নে সক্ষম হবে।
