ব্রিটেনের পার্লামেন্ট নির্বাচন আজ। ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন থাকছেন নাকি বিরোধীদল লেবার পার্টির নেতা এড মিলিব্যান্ড আসছেন সে সিদ্ধান্ত নেবে ব্রিটেনের জনগণ। তাই ভোটারদের আকৃষ্ট করতে নেতাদের চলছে শেষ মুহূর্তের প্রচারণা। একে অপরের দিকে ছুঁড়ে চলেছেন অভিযোগের তীর। নির্বাচন পূর্ব জনমত জরিপগুলো বলছে, প্রধান দুই দল কনজারভেটিভ ও লেবার পার্টির লড়াই হবে সমানে সমান। কোনো দলের এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। এক্ষেত্রে ছোট দল লিবারেল ডেমোক্র্যাট এবং ইউনাইটেড কিংডম ইন্ডিপেন্ডেন্ট পার্টির (ইউকেআইপি) মতো দলকে সাথে নিয়ে শেষ পর্যন্ত ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে ঢুকতে হবে ক্যামেরন কিংবা মিলিব্যান্ডকে।
ব্রিটেনের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউস অব কমন্সের আসন সংখ্যা ৬৫০টি। সরকার গঠনের জন্য দরকার ৩২৬টি। ১ মে ব্রিটেনের দ্য গার্ডিয়ানের এক জরিপে বলা হয়, বিরোধীদল লেবার পার্টি ২৬৭টি এবং ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টি ২৭৬টি আসন পেতে পারে। জরিপে কনজারভেটিভরা এগিয়ে থাকলেও তাদের শরিক দল লিবডেম কিন্তু এবার অনেক পিছিয়ে আছে। লিবডেমের অবস্থা এতই নাজুক যে সাবেক ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী ও পার্টি প্রধান নিক ক্লেগ নিজের আসনে বিজয়ী হবেন কিনা তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। বরং লেবার পার্টিকে সমর্থন দেয়ার ইঙ্গিত দেয়া এসএনপি (স্কটিশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি) সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। জরিপের ফল অনুযায়ী লিবডেম ২৭টি আসন পেতে পারে। কিন্তু এসএনপি তাদের দ্বিগুণ অর্থাত্ ৫৫টি আসন পেতে পারে। জরিপের হিসাবে কনজারভেটিভ ও শরিক লিবডেম মিলে আসন হচ্ছে ৩০২টি, আর লেবার পার্টি ও এসএনপি মিলে আসন পাচ্ছে ৩২২টি। গত ২০১০ সালের নির্বাচনে কনজারভেটিভ পার্টি সর্বোচ্চ ৩০৭টি আসন পেয়েছিল।
অন্যদিকে, গতকাল বুধবার বিবিসির এক জনমত জরিপে দেখা যায়, ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টি পক্ষে ৩৪ শতাংশ, লেবার পার্টির পক্ষে ৩৩, ইউকেআইপি’র পক্ষে ১৪, লিবারেল ডেমোক্রেটিক ৮, গ্রিন পার্টি ৫ ও অনান্য দলের ৬ শতাংশ ভোটারের সমর্থন রয়েছে।
জরিপ অনুযায়ী বড় দুই দলের কেউই সরকার গঠনে এককভাবে প্রয়োজনীয় আসন পাচ্ছে না। সেক্ষেত্রে সরকার গঠন করতে জোট করতে হবে এসএনপি, ইউকেআইপি, লিবডেম বা গ্রিন পার্টির মতো ছোটো দলগুলোর সঙ্গে। এ দলগুলোর ওপর নির্ভর করেই কনজারভেটিভ পার্টি বা লেবার পার্টিকে ক্ষমতায় বসতে হবে।
ভোটের মাঠে শেষ মুহূর্তে কী হবে, দোদুল্যমান ভোটাররা কোন দলকে বেছে নেবেন তা ভোটের পরই জানা যাবে। তবে বিবিসির ডেপুটি পলিটিক্যাল এডিটর জেমস ল্যান্ডেল বলেন, রাজনীতিক, জনমত যাচাইকারী ও গণমাধ্যমের নজর নির্বাচনে অনিশ্চিত কোন ফল আসলে তার প্রভাব কী হবে তার দিকে। এমনটা হলে বৃহস্পতিবার নির্বাচন প্রক্রিয়ার শেষ দিন হবে না। বরং এ দিন হতে পারে প্রক্রিয়ার হাফ-টাইম (অর্ধ সময়)।
শেষ সময়ের প্রচারণা
শেষ সময়ের প্রচারণায় ব্যস্ত প্রার্থীরা। বিবিসির এক খবরে বলা হয়, কনজারভেটিভ দলের নেতা প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন গতকাল দিনভর প্রচারণা চালান। গতকাল সাউথ ওয়েলস দিয়ে প্রচারণা শুরু করেন ক্যামেরন। এরপর তার গন্তব্য ছিল নর্থ-ওয়েস্ট ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও মিডল্যান্ড। তিনি ভোটারদের উদ্দেশ্যে দেয়া এক বক্তব্যে বলেন, পাঁচ বছর আগের চেয়ে দেশ এখন শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু এখনো অনেক কিছু করার রয়েছে। নির্বাচনে তার দল জয়ী হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
অন্যদিকে মিলিব্যান্ড প্রচারণা চালান উত্তর ইংল্যান্ডে কনজারভেটিভের প্রভাবে থাকা আসনগুলোতে। লেবার পার্টি নেতা এড মিলিব্যান্ড দেশের জন্য কঠোর পরিশ্রম করার জন্য আবারো সুযোগ চেয়েছেন। তিনি লেবার পার্টির সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী। জনগণ সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। অন্যদিকে, লিবারেল ডেমোক্র্যাটস এর নেতা নিক ক্লেগ স্থিতিশীলতা আর শিষ্টাচার বজায় রাখার অঙ্গীকার করেছেন।
এবারের নির্বাচনে অনেকগুলো ইস্যু রয়েছে। তবে বিভিন্ন দলের নেতাদের ব্যক্তিত্বও এবার ভোটারদের আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে। ব্রিটেনে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মুশতাক খান বিবিসিকে বলেন, দুই প্রধান নেতা কনজারভেটিভ পার্টির ডেভিড ক্যামেরন ও লেবার পার্টির এড মিলব্যান্ড তাদের ব্যক্তিগত চরিত্র অনেকটা ভিন্ন। এর উপর ভিত্তি করেই অনেক ভোটার ভোট দিবেন। তার মতে, এড মিলিব্যান্ড একজন আবেগপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ও দর্শনভিত্তিক রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন। আর ডেভিড ক্যামেরন বাস্তবমুখী, যেটা অনেক ব্রিটিশ পছন্দ করেন। যারা লেবার পার্টিকে ভোট দেয় তারা মিলিব্যান্ডকে পছন্দ করেন। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের কাছে ক্যামেরন সম্পর্কে একটা ধারণা আছে যে, তিনি সমস্যার সমাধান করতে পারেন।
নির্বাচনে অঙ্গীকার:
নির্বাচনে কোন দল কী বলছে? কী অঙ্গীকার করছে? এটাও নির্বাচনের বড় এক অনুসঙ্গ। তবে প্রধান দলগুলোর নির্বাচনী প্রচারণায় দেখা যায়, অর্থনীতির সঙ্কট কাটানো, জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা বা এনএইচএসকে টিকিয়ে রাখা, বাজেট ঘাটতি কমানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অভিবাসন কমানো, ইউরোপের সঙ্গে ব্রিটেনের ভবিষ্যত্ সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা ইত্যাদি এবারের নির্বাচনের বড় ইস্যু।
কনজারভেটিভ পার্টি বলছে, তারা ব্রিটেনের অর্থনীতিকে সঙ্কট থেকে পুনরুদ্ধার করেছে। গত পাঁচ বছরে তারা সরকারের সেবা খাত ও কল্যাণভাতায় ব্যাপকভাবে ব্যয় কাটছাঁট করে বাজেট ঘাটতি কমিয়েছে, ২০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। তাদের কথা হল, ব্রিটেনের অর্থনীতিতে এখন প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, মুদ্রাস্ফীতি কমেছে। সব মিলিয়ে কনজারভেটিভরা বলছে, তাদের গৃহীত পদক্ষেপে সুফল পাওয়া যাচ্ছে, তাই এগুলো অব্যাহত রাখতে হবে এবং ব্রিটেনকে অর্থনৈতিক সঙ্কট থেকে পুরোপুরি বের করে আনতে হলে জনগণকে তাদেরকেই ভোট দিতে হবে।
অন্যদিকে লেবার পার্টি বলছে, কনজারভেটিভ নীতির ফলে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান বেড়েছে, জীবনযাত্রার মান কমেছে। ব্রিটেনে এখন ১০ লাখের বেশি লোক ফুডব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল, ধনীদের ওপর কর কমিয়ে এবং সেবা ও কল্যাণভাতা সঙ্কুচিত করে সাধারণ মানুষকে আর্থিক সঙ্কটে ফেলেছে সরকার। তারা বলছে, কনজারভেটিভরা এবার জিতলে স্বাস্থ্যসেবায় আরও কাটছাঁট ও বেসরকারিকরণ হবে, সামাজিক কল্যাণভাতাও কমানো হবে, তাই এসব খাতকে রক্ষা করতে ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে লেবার পার্টিকেই ভোট দিতে হবে।
আধিপত্য থাকছে অভিবাসন ও স্কটল্যান্ড ইস্যুর?
ব্রিটেনের নির্বাচনে বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে অভিবাসন। বড় সব দলই এ ইস্যু নিয়ে কথা বলছে। কনজারভেটিভ পার্টি এর আগের নির্বাচনের অভিবাসন সংখ্যা লাখ থেকে হাজারে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে আগের তুলনায় অভিবাসনের হার বেড়েছে। তবে কনজারভেটিভ পার্টি বলছে, অভিবাসনের ক্ষেত্রে তারা ইউরোপ থেকে কমাতে পারেনি, তবে ইউরোপের বাইরে থেকে অভিবাসন কমাতে পেরেছে।
লেবার পার্টি বলছে, তারাও ব্রিটেনে অভিবাসন কমাবে এবং অভিবাসীরা যেন ব্রিটেনে ঢুকে প্রথম দুই বছর সামাজিক কল্যাণভাতা নিতে না পারে এবং তাদের সস্তা শ্রমের জন্য যেন ব্রিটিশরা কাজ থেকে বঞ্চিত না হন সেজন্য কড়া আইন করা হবে।
তবে ইউকেআইপি সম্পূর্ণ অভিবাসন বিরোধী ডানপন্থী দল। তারা বলছে, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের মধ্যে অবাধ চলাচল বহাল রেখে এসব পদক্ষেপে কোনো কাজ হবে না, তাই অভিবাসন বন্ধ করতে হলে ইইউ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে এবং সেটাই তাদের এজেন্ডা। লেবার পার্টি অবশ্য ইইউ থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে আসার বিরুদ্ধে। কারণ তারা বলছে, এতে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে বিরাট বিপর্যয় নেমে আসবে।
অভিবাসনের পাশাপাশি স্কটল্যান্ড ও এসএনপি ইস্যুও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে এবারের নির্বাচনে। কারণ স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি (এসএনপি) যদি নির্বাচনে ৫৬টির মতো সিট পায়, তাহলে বড় দলগুলো তাদের সঙ্গে জোট করতে পারে। এর ফলে তারা জাতীয় রাজনীতিতে কিংমেকারে পরিণত হতে পারে। এই এসএনপি স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা চায়, তবে এ দাবির ওপর গণভোটে তারা হেরে যাওয়ার পর আপাতত স্বাধীনতার কথা আর বলছে না। কিন্তু নির্বাচনের পর এসএনপি কোনো কোয়ালিশনে ঢুকলে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে, এটা অনেকে বলছেন। কোয়ালিশনের রাজনীতিতে এসএনপি ক্ষমতাশালী হয়ে উঠলে তারা কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর ছড়ি ঘোরাবে এবং ভবিষ্যতে আবারও স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার জন্য নতুন গণভোটের দাবি তুলতে পারে।
কনজারভেটিভ পার্টি বলছে, ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য লেবার পার্টিই এসএনপির সঙ্গে কোয়ালিশন করতে পারে। যদিও লেবার নেতা এড মিলিব্যান্ড এসএনপির সঙ্গে কোনো চুক্তি বা কোয়ালিশনের কথা বার বার অস্বীকার করছেন। কনজারভেটিভ পার্টি বলছে, এসএনপি যুক্তরাজ্য ভাঙতে চায় তাই তার সঙ্গে কোয়ালিশন করাটা বিপজ্জনক হবে। এ নিয়ে এসএনপির নেত্রী নিকোলা স্টারজিওন এখন ব্রিটেনের রাজনীতিতে এক আলোচিত নেত্রীতে পরিণত হয়েছেন।