বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের নাগরিকদের বহনকারী একটি নৌকাকে তীরে ভিড়তে দেয়নি ইন্দোনেশিয়ার কর্তৃপক্ষ। দেড় থেকে দুই মাস সাগরে ভেসেছিল নৌকাটি। যাতে কয়েকশ’ অবৈধ অভিবাসী রয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে। এতে বলা হয়, উপকূলের কাছ থেকে ওই নৌকাটিকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এদিকে, মৃত্যুর ঝুঁকিতে থাকা সাগরে ভাসমান কয়েক হাজার অভিবাসীকে উদ্ধারের জন্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে শরণার্থীদের নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)। অন্যদিকে, মালয়েশিয়ায় উদ্ধার বাংলাদেশিদেরকে সকল প্রক্রিয়া শেষ করে দ্রুত দেশে ফেরত পাঠানো হবে বলে বাংলাদেশ হাইকমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
বেলফাস্ট টেলিগ্রাফ পত্রিকার এক খবরে বলা হয়েছে, মালয়েশিয়ার নৌবাহিনী জানিয়েছে তারা অবৈধ অভিবাসী বহনকারী কোনো বিদেশি নৌকাকে তীরে ভিড়তে দেবে না। মালয়েশিয়ার মেরিন নর্দার্ন কমান্ডার তান কক কি বলেন, লাংকাওয়ীতে টহল জোরদার করা হয়েছে। যদি কোনো নৌকা ডুবে যায় সেক্ষেত্রেই উদ্ধার কাজ চালানো হবে।
গতকাল মঙ্গলবার অবৈধ অভিবাসী বহনকারী নৌকাটিকে ইন্দোনেশিয়া আশ্রয় না দিয়ে সাগরে ফেরত পাঠানোয় এর অসহায় যাত্রীদের নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দেশটির নৌবাহিনীর একজন মুখপাত্র বিবিসিকে বলেন, নৌকা ভিড়তে না দিলেও যাত্রীদের জন্য আলাদা একটি জাহাজে করে প্রয়োজনীয় খাবার-দাবার ও জ্বালানি সরবরাহ করা হয়েছে। পরপর দুই দিনে প্রায় এক হাজার বাংলাদেশি ও মিয়ানমারের অবৈধ অভিবাসীকে আশ্রয় দেয়ার পর দেশটি এ পদক্ষেপ নিল। ইন্দোনেশীয় নৌবাহিনীর মুখপাত্র মানাহান সিমোরানকির বলেন, যাত্রীরা জীবিত ও ভালো অবস্থায় রয়েছে। তারা ইন্দোনেশিয়ায় আসতে চাইছে না বরং সহায়তা চাইছে। তারা মালয়েশিয়ায় যেতে আগ্রহী। এ কারণে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় খাবার, পানি ও ওষুধ পাঠানো হয়েছে।
ইন্দোনেশিয়ার উপকূলে নৌকা ভিড়তে না দেয়াকে দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেছে আইওএম। সংস্থাটি বলছে, ৮০০০ এর মতো মানুষ তাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রে নৌকায় ভাসছে। তাদেরকে তীরে ভিড়তে দেয়ার আহবান জানিয়েছে সংস্থাটি। সংস্থাটির মুখপাত্র জো লোরি বলেন, অসহায় অভিবাসীদেরকে সমুদ্র থেকে উদ্ধারের দক্ষতা ও সক্ষমতা আইওএম রাখে না। কিন্তু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সরকারের তা আছে। কারণ, তাদের জাহাজ ও স্যাটেলাইট রয়েছে। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, অবিলম্বে উদ্ধার করা না গেলে এসব অভিবাসী মারা পড়তে পারে। যাত্রীদের অনেকে ভিটামিনের অভাবে বেরিবেরি রোগে আক্রান্ত। এ রোগ এসব মানুষকে জীবন্ত কংকাল বানিয়ে ফেলছে। তাদের জরুরি মানবিক সহায়তা প্রয়োজন। তার মতে, মুক্তিপণ না দেয়ার কারণে এসব মানুষ গত মার্চ থেকে সাগরে ভাসছেন।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, গত তিনদিন ধরে এসব অভিবাসীর কাছে খাবার-দাবার ও পানি নেই। রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করে এমন একটি বেসরকারি সংস্থা আরাকান প্রজেক্ট জানিয়েছে, তারা নৌকায় অবস্থানকারী কয়েকজনের সাথে টেলিফোনে কথাও বলেছেন। থাইল্যান্ডের উপকূলে আইন- শৃঙ্খলা বাহিনীর তত্পরতা বেড়ে যাওয়ার পর পাচারকারীরা রুট পরিবর্তন করে ইন্দোনেশিয়ার দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
প্রসঙ্গত, গত রবি ও সোমবার প্রায় ২ হাজার বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা অভিবাসীকে মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া উপকূল থেকে উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে সোমবার মালয়েশিয়ায় উদ্ধারকৃত ১০১৮ জনের মধ্যে ৫৫৫ জন বাংলাদেশি ও ৪৬৩ জন রোহিঙ্গা। উদ্ধারকৃতদের স্থানীয় আশ্রয়কেন্দ্র, ক্লিনিক ও বাড়িতে খাবার এবং অন্যান্য সহায়তা দেয়ার পর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মালয়েশিয়ার কেদাহ অভিবাসন সেন্টারে নেয়া হয়েছে। খুব শিগগিরই তাদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে বলে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনারের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
অন্যদিকে আঞ্চলিক অভিবাসী সংকটে বাংলাদেশকেই দুষছে মিয়ানমার। ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার উপকূল থেকে উদ্ধার হওয়া অভিবাসীরা মিয়ানমারের নাগরিক নয় দাবি করে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক অভিবাসী সংকটের মূল বলে দাবি করছে মিয়ানমার সরকার। দেশটির কয়েকটি গণমাধ্যমে এ সংক্রান্ত খবর প্রকাশ করা হয়েছে।