আইএনএ’র তহবিল লুটেরাদের পুরস্কৃত করেছিলেন নেহেরু!

আপডেট : ১৮ মে ২০১৫, ০০:৫৮

ভারতের স্বাধীনতাকামী নেতা নেতাজি সুভাস চন্দ্র বসুর সহযোদ্ধাদের কয়েকজন ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির (আইএনএ) শতকোটি রুপির তহবিল লুট করেছিলেন বলে ইঙ্গিত মিলেছে। এই লুটেরাদের অন্ততপক্ষে একজনকে সরকারি একটি পদ দিয়ে পুরস্কৃত করেছিলেন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু। সমপ্রতি সুভাস বোস সংক্রান্ত প্রকাশিত ৩৭টি গোপন নথির একটিতে এসব বিষয় প্রকাশ পেয়েছে বলে জানিয়েছে ‘ইন্ডিয়া টুডে’ সাময়িকী।

 
 এর আগে প্রকাশিত আরেকটি গোপন নথির সূত্রে জানা যায়, ভারতের স্বাধীনতার পরে ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বোস পরিবারের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি চালিয়েছিল দেশটির তত্কালীন কংগ্রেস সরকার। এতে নেহেরুর ব্যাপক সমালোচনা হলেও এবারের ‘আইএনএ তহবিল’ নথিতে নেহেরুর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই নথিতে প্রকাশ পেয়েছে, বোসের কয়েকজন সঙ্গী তার রহস্যময় অন্তর্ধানের পর আজাদ হিন্দের অস্থায়ী সরকারের (পিএজিএইচ) পতন হলে সরকারি তহবিল কীভাবে লুটে নিয়েছিলেন।
 
ইন্ডিয়া টুডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘এখানে বিস্ময়কর তথ্য এটি না যে, ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির (আইএনএ) আজকের দিনের হিসাবে কয়েকশ কোটি রুপির তহবিল লুট হয়েছিল। বিস্ময়কর হচ্ছে তাত্কালীন সরকার (ভারতের) বিষয়টি জানতো এবং তারা কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।’ সাময়িকীটির হাতে আসা গোপন নথিগুলো থেকে জানা গেছে, ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত টোকিওতে নিযুক্ত ভারতীয় কূটনীতিক মিশনের তিনজন প্রধানের উপর্যুপরি সতর্কতা উপেক্ষা করে গেছে নেহেরু সরকার। এমনকি ১৯৫১ সালে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব আর ডি সাত্যে তত্কালীন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা প্রধানমন্ত্রী নেহেরুর কাছে সরাসরি ভাষায় লিখিত একটি চিঠিতেও বিষয়টি সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, বোস উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তহবিল ভিয়েতনামের সায়াগনে (বর্তমান হো চি মিন সিটি) রেখে গেছেন। এসব সম্পদের মধ্যে বোসের স্বাধীনতার ডাকে পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যে সাড়া পড়েছিল তাতেই এই সম্পদ জমা হয়েছিল। এসব সম্পদের মধ্যে ৮০ কেজির স্বর্ণালঙ্কার ও মূল্যবান পাথর ছিল।
 
সাত্যে জানিয়েছেন, এসব সম্পদ সন্দেহভাজন তছরুপকারী ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লিগের টোকিও প্রতিনিধি এম রামামূর্তি ও আইএনএ-র অস্থায়ী সরকারের মন্ত্রী এসএ আয়ার ইতিমধ্যে সরিয়ে নিয়েছেন। সবগুলো সতর্কতাই উপেক্ষা করা হয়েছে এবং কোনো তদন্তের নির্দেশ দেয়া হয়নি বলে টুডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। আরো যা খারাপ তা হল, তহবিল তছরুপের অভিযোগ ওঠা আইএনএ-র সাবেক ওই মন্ত্রীকে তেমন কোনো দায়িত্ব ছাড়াই সরকারি একটি পদ দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়েছিল।’
 
 ১৯৪৫ সালের ২৯ জানুয়ারি মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনের ভারতীয় বাসিন্দারা সপ্তাহব্যাপী একটি বড় ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। নেতাজির ৪৮তম জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে নেতাজির ওজনের সমপরিমাণ স্বর্ণ দেয়া হয়েছিল।
 
 এক সপ্তাহে ৮০ কেজি সোনার পাশাপাশি দুই কোটি রুপিরও বেশি চাঁদা উঠেছিল। বিংশ শতকের যে কোনো ভারতীয় নেতার চেয়ে বেশি যুদ্ধ তহবিল সংগ্রহ করেছিলেন বোস।
 
 কিন্তু যুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনীর কাছে জাপানি বাহিনী ও বোসের আইএনএ সরকার হেরে যায়। ১৯৪৫ সালের ২৪ এপ্রিল বোস পিছু হটে ব্যাংকক চলে যান। ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট মিত্র বাহিনীর কাছে জাপান আত্মসমর্পণ করে। বার্মায় (বর্তমানে মিয়ানমার) আইএনএ ৪০ হাজার সদস্যের শক্তিশালী বাহিনীটিও মিত্র বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। এই বাহিনীর কর্মকর্তাদের দেশদ্রোহিতার অপরাধে বিচারের জন্য দিল্লিতে নিয়ে আসা হয়।
 
 ১৮ আগস্ট সহযোগী হাবিবুর রহমানকে নিয়ে নেতাজি একটি জাপানি বোমারু বিমানে সায়াগন থেকে মাঞ্চুরিয়ার দিকে রওয়ানা হন। মাঞ্চুরিয়া থেকে তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়নে যেতে চেয়েছিলেন তিনি। বলা হয়, পথে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়ে মহান এ ভারতীয় নেতার মৃত্যু হয়। তবে এই কাহিনী ভারতের অনেকেই এখনও বিশ্বাস করেন না।
 

 শুক্রবার ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর টক শো গুলোতে এ বিষয়টি নিয়ে নির্ধারিত আলোচনা হয়েছে, এতে অনেক বক্তাই বলেছেন, আইএনএ তহবিল লুটের বিষয়টি নেহেরু জানলেও এ বিষয়ে নীরবতা অবলম্বন করেছেন। আর অভিযুক্তদের শাস্তি না দিয়ে সরকারি চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করেছেন, কারণ তারা বিমান দুর্ঘটনায় বোসের মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছিলেন।

ইন্ডিয়া টুডে