নেপালের চৌতারা জেলার বাসিন্দা ছিলেন অর্জুন বিস্তা। ২৫ এপ্রিলের প্রথম ভূমিকম্পে তিনি তার মাকে হারিয়েছেন। সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে তার বাড়িও। তিনি প্রতিদিন সাধের মোটর সাইকেলে করে শহর থেকে ত্রাণ নিয়ে যেতেন, যা দিয়ে জীবন চলতো তার স্ত্রী এবং দুই সন্তানের। ২৫ এপ্রিল থেকে ১১ মে পর্যন্ত এভাবেই চলেছে সংসার। কিন্তু ১২ মে সবই যেন ওলট পালট হয়ে গেল স্ত্রী বেলি বিস্তার। ১২ মে অর্জুন মোটর সাইকেলে করে ত্রাণ আনতে গিয়েছিলেন। প্রধান সড়ক দিয়েই যাচ্ছিলেন। হঠাত্ করে ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে রাস্তার পাশে থাকা একটি ভবন ধসে তার ওপর পড়ে। ঘটনাস্থলেই মারা যান অর্জুন। সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যায় বেলি বিস্তার জীবনের শেষ সম্বলটুকু। তাইতো বেলি বলেন, আমি এখন একটা ভীতবিহীন বাড়ির মতো। প্রথম ভূমিকম্পে কেবল তো শাশুড়ি আর বাড়িটিই হারিয়েছিলাম, দ্বিতীয় ভূমিকম্পে জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিকেই হারালাম। আমি জানি, আমি আর কোনদিন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারবো না।
২৫ এপ্রিলই নেপালের শেষ ভূমিকম্প নয়। গত ১১ মে দ্বিতীয়বারের মতো ভূমিকম্প নেপালকে কাঁপিয়ে মানুষকে কাঁদিয়ে দেয়। প্রথমবারের ভূমিকম্পের ধ্বংসস্তূপ থেকে মৃতদেহ উদ্ধার এবং বসবাসের জন্য সামান্য বাসস্থান তৈরির জন্য যখন দেশি-বিদেশি উদ্ধারকর্মীরা ব্যস্ত তখনই ৭ দশমিক ৩ মাত্রার ভূমিকম্প সবকিছু ওলট-পালট করে দেয়। একেবারে মরার উপর খাড়ার ঘা হয়ে আসা এই ভূমিকম্পে নিহত হয় ৭৬ জন। আহত হয় দুই সহস্রাধিক। ২৫ এপ্রিলের নিহত এবং আহতের সংখ্যার দিক দিয়ে এই সংখ্যা হয়তো খুবই কম মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এর ফল হয়েছে খুবই বিপজ্জনক। গত শনিবারও ঘটলো আরেকটি ভূমিকম্প যার মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৭। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, কেবল বড় ধরনের ভূমিকম্পই নয়। গত ২৫ এপ্রিল থেকে এ পর্যন্ত নেপালে ২০৩টির মতো আফটারশক বা পরাঘাত আঘাত হেনেছে। উইকিপিডিয়ার তথ্যানুসারে, গত ২৫ এপ্রিল বড় ভূমিকম্পের পর একই দিনে ৩৭টি পরাঘাত অনুভূত হয়। এর পরের দিন ২৬ এপ্রিল ২টি এবং ২৭ এপ্রিল একটি, ১৩ ও ১৪ মে একটি করে পরাঘাত অনুভূত হয়। তবে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানায়, গত ১৪ মে পাঁচটি পরাঘাত অনুভূত হয়।
পরাঘাত বিষয়ে আগেই সতর্ক করেছিল মার্কিন ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস)। সংস্থাটি বলেছিল, ২৫ এপ্রিলের ভূমিকম্প নেপালে শেষ কথা নয়। ইউএসজিএস এর কর্মকর্তা গেভিন হেজ বলেন, এর মাত্রা হয়তো ৭ মাত্রার বেশি হবে না। তবে তাই বলে ধ্বংসযজ্ঞ থেমে যাবে তা কিন্তু নয় বলেন নেপালে সেভ দ্য চিলড্রেনের উদ্ধার তত্পরতা দলের প্রধান ক্যারোলিন অ্যানিং। তিনি বলেন, দ্বিতীয়বারের ভূমিকম্পও অনেক বাড়ি এবং অবকাঠামোর ক্ষতি করেছে। ২৫ এপ্রিলের যে ধ্বংসস্তূপের সৃষ্টি হয়েছিল সেই ধ্বংসস্তূপ অনেকটাই সরানো সম্ভব হয়েছিল। মৃতদেহ উদ্ধার কাজের সমাপ্তি টানা হয়েছিল। বিদেশি উদ্ধারকর্মীদের চলে যেতে নির্দেশ দিয়েছিল নেপাল সরকার। কিন্তু ১২ মে’র ভূমিকম্প কিছুটা হলেও বিরাজমান স্বাভাবিক অবস্থাকে লণ্ডভণ্ড করে দেয়। এমনকি সিন্ধুপালচক এবং গোর্খার মতো জেলায় ভূমিধসের ঘটনাও ঘটে। যেসব রাস্তা চলাচলের কিছুটা উপযোগী করা হয়েছিল সেই রাস্তাকে আরো অনুপযোগী করে দেয় এই ভূমিকম্প। আর পরাঘাতের আঘাত তো আছেই। অনেকে হয়তো মনে করতে পারে, পরাঘাতে তো তেমন ক্ষতি হয় না। বাস্তবে হয়তো তেমনটাই মনে হতে পারে। কিন্তু এই পরাঘাত একদিকে উদ্ধার তত্পরতায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করে, আবার অন্যদিকে মানুষের মানসিক অবস্থাকে দুর্বল করে তোলে। অনেকেই ইতোমধ্যে ট্রমায় আক্রান্ত হয়েছেন। এটা মানুষের মনস্তত্ত্বে দীর্ঘমেয়াদি একটা টেনশন সৃষ্টি করে, বিশেষ করে শিশুরা যারা তাদের ঘর-বাড়ি হারিয়েছে, তারা হারিয়েছে তাদের স্থাবর-অস্থাবর সব কিছু। যেসব মানুষকে তারা আপনজন বলে জানতো তাদেরও হারিয়েছে এসব শিশুরা। তারা জানে না পৃথিবী ঘূর্ণিপাকে আবার তাদের ভাগ্য বদল হবে কিনা। অ্যানিং বলেন, মানুষ এখন তার বাড়ি ফিরতেই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। যদিও তারা খুব বেশি খারাপ নেই। অনেককে দেখা যায় তারা আনন্দ করে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে ঘুমায়। কিন্তু তারপরও নিজের বাড়ি যেতেই যেন ব্যস্ত সবাই। তারা একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছে। শিশুদের অনেক অভিভাবকরা বলছেন, রাতেরবেলায় তাদের শিশুরা ভয় পেয়ে যান। কিন্তু শিশুদের তারা কোনো কিছু বলে সান্ত্বনাও দিতে পারছেন না। আর কিই বা দিবেন। কয়দিনই বা তাদের কাছে মিথ্যা কথা বলা যায়, বলেন অ্যানিং।
অ্যানিং জানান, সেভ দ্য চিলড্রেন কেবল কলেরার মতো রোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বিশুদ্ধ পানি এবং টয়লেট সরবরাহ কিংবা এবিষয়ে সচেতনই করছে না বরং শিশুদেরকে কাউন্সেলিংও করছে। তিনি আরো জানান, নেপালে চলতি মাসের শেষ দিকে মুষলধারে বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এজন্য দরকার ওয়াটারপ্রুফ আশ্রয়কেন্দ্র। আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা রেডক্রস জানিয়েছে, পরাঘাতের ফলে উদ্ধারকর্মীরা যেন প্রতিদিনই ভূমিকম্পে আঘাতহানা স্থান থেকে আরো মৃত্যু এবং আহত মানুষের তথ্য পাচ্ছেন। আর কানে বেজে উঠছে বেঁচে যাওয়া মানুষের কান্নার শব্দ। এই সংস্থাটি বিভিন্ন হাসপাতালে গড়ে তুলেছে কাউন্সেলিং কেন্দ্র। বেঁচে থাকা মানুষগুলো যাতে সুস্থভাবে জীবন-যাপন করতে পারে সেই চেষ্টাই করছে সংস্থাটি। তাদের মূল উদ্দেশ্য মানুষের মধ্য থেকে আতঙ্ক দূর করা। এই কাজে যুক্ত হচ্ছেন নেপালি মনোবিজ্ঞানীরাও। নেপালে রেডক্রসের প্রধান ড্রাগানা কোজিক জানিয়েছেন, সংস্থাটি ১৯৯৮ সাল থেকে নেপালে কাজ করে আসছে। এতদিন তারা মূলত সরকার এবং মাওবাদীদের মধ্যে সংঘর্ষের ফলে হতাহতদের সহায়তা করে আসছিল। কিন্তু এবারই ব্যতিক্রম ঘটলো।
আশ্বাস আছে, বাস্তব চিত্র ভিন্ন: নেপালে জীবন গেছে আট হাজার মানুষের। আহত হয়েছে কয়েক হাজার। অনেক মানুষ ভারতসহ প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় নিচ্ছেন। নেপাল সরকার বারবারই বিশ্ববাসীর কাছে সহায়তার আবেদন জানিয়ে আসছে। তবে জাতিসংঘ জানিয়েছে, প্রয়োজনের তুলনায় মাত্র ১৪ শতাংশ সহায়তার আশ্বাস পাওয়া গেছে। ৪২৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সাহায্যের আবেদন জানানো হলেও অঙ্গীকার আছে মাত্র ৫৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের। দুইবারের ভূমিকম্পে নেপালে আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে ৫ লাখ থেকে ৬ লাখ মানুষ। এসব মানুষের বেঁচে থাকার জন্য অন্তত এই সমস্যার সমাধান তো করতে হবে। দ্বিতীয়বার ভূমিকম্পের পর রেডক্রস ৯৩ মিলিয়ন ডলার সহায়তার আবেদন জানিয়েছে। প্রথমবার সংস্থাটি ৩৫ মিলিয়ন ডলারের আবেদন জানিয়েছিল। তবে নেপালে সহায়তার জন্য বসে নেই বিশ্বের মানুষ। বিশ্বের ৬১টি দেশ নেপালের প্রতি সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাসহ বিভিন্ন দেশের আঞ্চলিক সংস্থাও সহায়তায় এগিয়ে এসেছে। এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকও ১০ লাখ ডলারের তহবিল সংগ্রহ করেছে। এগিয়ে এসেছে বাংলাদেশের বিভিন্ন সংগঠন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত এবং চীনসহ বিভিন্ন দেশের সেনাবাহিনী উদ্ধার কাজে অংশ নিচ্ছে। বাংলাদেশ ১০ টন ত্রাণ সাহায্য পাঠিয়েছে নেপালে। এর মধ্যে রয়েছে শুষ্ক খাবার, বিশুদ্ধ পানি এবং কম্বল। এছাড়া একটি চিকিত্সক দলও পাঠিয়েছে। চীনের ৬৮ সদস্যের একটি দল উদ্ধার কাজে অংশ নিচ্ছে। এছাড়া ছয়টি কুকুরও সঙ্গে আছে। দেশটি ৩ দশমিক মিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
