অবৈধ অভিবাসীর ঢল ইউরোপেও

আপডেট : ১৮ মে ২০১৫, ১৩:৪০
ইউরোপে শরণার্থীদের চাপ বাড়ছে দিন দিন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন শত শত শরণার্থী এ মহাদেশ অভিমুখে পাড়ি জমাচ্ছে। লক্ষ্য নিরাপদ ও নতুন জীবনের আশা। ইরাক ও সিরিয়ার যুদ্ধ, পশ্চিম ও হর্ন অব আফ্রিকায় দারিদ্র্য এবং লিবিয়া ও মিসরের অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতি এসব এলাকার মানুষজনকে বেশি হারে দেশত্যাগে উদ্বুদ্ধ করছে। শীত মৌসুম চলে যাওয়ার পর থেকে ইউরোপে শরণার্থীদের আনাগোনা শুরু হয়। তবে এবার শরণার্থীর ঢল যেন মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। কারণ আফ্রিকার সংঘাত ও টালমাটাল মধ্যপ্রাচ্য। নানা সঙ্কট দিশাহীন মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে চরম ঝুঁকিপূর্ণ পথে। এর ফলে শরণার্থীদের জীবন অনিশ্চয়তার কবলে যেমন পড়ছে তেমনি তারা যে দেশগুলোতে যাচ্ছে সেখানে বাড়ছে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ।
 
সংকটাপন্ন এই মানুষগুলোর ইউরোপে অভিবাসী হওয়ার পথটি মোটেই সুগম নয়। ধরা যাক সিরীয় যুদ্ধ থেকে বাঁচতে একজন ইউরোপ যাবেন। তাকে প্রথমে সিরিয়া থেকে তুরস্ক হয়ে যেতে হবে আলজেরিয়া। সেখান থেকে মরুভূমির মধ্য দিয়ে লিবিয়া। তারপর ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে জাহাজে করে স্বপ্নের ইউরোপে যাওয়ার পালা। জাহাজের খালাসিরা তাদের বিপদে না ফেললে এবং সলিল সমাধি না ঘটলে তিনি ইউরোপের মাটিতে পা রাখতে পারবেন।
 
আদম ব্যবসায়ী নামে পরিচিত দালালরা এভাবে কোটি কোটি ডলার কামিয়ে থাকে। সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রগুলো ক্রমেই এ ব্যবসার দিকে ঝুঁকে পড়ছে। বিপন্ন মানুষের দুর্দশাকে পুঁজি করেই এদের ব্যবসা। এভাবে তারা বছরে প্রায় ৭০০ কোটি ডলার বাগিয়ে নিচ্ছে। গত বছর প্রায় পৌনে দুই লাখ মানুষ ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে পৌঁছেছে। এদের পৌঁছে দিতে ব্যবহূত প্রতিটি নৌযান থেকে হাজার হাজার ডলার নিয়েছে পাচারকারীরা। অভিবাসীরা কী পরিমাণ অর্থ দিতে ইচ্ছুক, তার ভিত্তিতে সেবার মান বিভিন্ন রকম হয়। বেশি অর্থ দিলে কিছুটা বেশি নিরাপত্তা সুবিধা দেয়া হয়। তবে বাংলাদেশ কিংবা থাইল্যান্ডের নিষ্ঠুর দালালদের মতো ওইসব দেশের দালালরা জঙ্গলে নিয়ে বন্দি করে পরিবারের কাছে ফোন করে মুক্তিপণ আদায় করে না। এ ব্যাপারে তাদের কিছুটা ‘ভদ্র’ বলা যায়।
 
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত অবৈধ পথে সমুদ্র পথে ইউরোপে যেতে গিয়ে অন্তত ২২ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। প্রতিবছর গড়ে এক হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছে। তবে এ বছরে অস্বাভাবিক রকম বেশি বলে মনে হচ্ছে? জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক কমিশনার আন্টোনিয়ো গুটেরেস জানিয়েছেন, গত এক বছর ভূমধ্যসাগর দিয়েই ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করেছে প্রায় ২ লক্ষ ২০ হাজার মানুষ। এর মধ্যে মারা গেছে কমপক্ষে সাড়ে তিন হাজার। দু’বছর আগেও এই সংখ্যাটি এত বেশি ছিল না। ২০১৩ সালে মৃতের সংখ্যা ছিল ৬০০। গত বছর প্রথম চার মাসে মারা যায় ১৭ জন। এ বছর একই সময়ে মারা গেছে ৯০০ জন। তবে এগুলো সবই বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া আংশিক হিসাবমাত্র। যেখানে বেশি লোক মারা গেছে সেক্ষেত্রে মৃতের প্রকৃত সংখ্যা জানা খুবই দুরূহ।
 
অভিবাসন বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইওএম এ নিয়ে তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন অভিবাসীদের জীবনরক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে। ইইউর পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান ফেদেরিকা মুগেরিনি গত সপ্তাহে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে ভূমধ্যসাগরে মানবপাচার ঠেকাতে নিরাপত্তা পরিষদের ভূমিকা রাখার আহবান জানিয়েছেন। অভিবাসী সংকট মোকাবেলায় ইইউর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তিনি জাতিসংঘের সহযোগিতা কামনা করেন। ইইউর পরিকল্পনায় শরণার্থী রুটগুলো সেনা মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। মুগেরেনি বলেন, প্রস্তাবিত বাহিনী মোতায়েনের লক্ষ্য অভিবাসীদের জোর করে নিজ দেশে পাঠান নয়। বরং পাচারকারীদের ব্যবহারের জন্য নৌকা সরঞ্জামাদি আগে থেকে চিহ্নিত করে ওগুলো ধ্বংস করে ফেলা। ১৮ তারিখ বিষয়টি নিয়ে ইইউ পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা আরেক দফা বৈঠকে বসবেন। মুগেরিনি বলেন, ‘আমরা একদিকে মানুষের জীবন রক্ষা করতে ও অন্যদিকে অপরাধী চক্রগুলোকে ভেঙ্গে দিতে চাই।’ মানব পাচার রোধে ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে নিরাপত্তা ও টহল বাড়ানো হলেও জেলে নৌকা ও পাচারকারীদের নৌকা আলাদাভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হচ্ছে না।
 
ইইউর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নিরাপত্তা পরিষদ ছাড়াও লিবিয়ার সম্মতি প্রয়োজন হবে। কারণ বেশিরভাগ নৌযান লিবিয়া উপকূল থেকে যাত্রা শুরু করে থাকে। মুগেরিনি বলেছেন জাতিসংঘে নিযুক্ত লিবীয় রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে তার কথা হয়েছে। সমালোচকরা বলছেন, লিবিয়ার সমুদ্রসীমা দেশটির অনুমতি ছাড়া কোন নৌযান থামালে বা আটকালে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘিত হবে। খসড়া প্রস্তাবে পাচারকারী সন্দেহে কোন নৌযান ধ্বংসের ধারাটির বিরোধিতা করেছে রাশিয়া। তবে ফ্রান্স পরিকল্পনাটির প্রতি পুরোপুরি সমর্থন ব্যক্ত করেছে।
 
সমুুদ্রে টহলদারি বাড়িয়ে অভিবাসী প্রাণহানির সংখ্যা কমিয়ে আনার দাবি করেছে ইতালি। গত নভেম্বরে ইতালির সর্বদক্ষিণের লাম্পেদুসা দ্বীপের কাছে একটি নৌযান ডুবে গেল ৪ শতাধিক অভিবাসীর মৃত্যু ঘটে। এরপর অপারেশন মারে নোস্ট্রাম শুরু করে ইতালি। লাতিন ভাষায় এই কথার অর্থ ‘আমাদের সমুদ্র’। অপারেশনটি শুরুর পর অভিবাসী মৃত্যুর হার অনেক কমিয়ে আনা গেছে। এটি হলো সামরিক হেলিকপ্টারের সহায়তায় সাগরে ইতালির নৌবাহিনীর তল্লাশী অভিযান। অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই কোন নৌযান দেখলেই তার গতি রোধ করে অসহায় লোকজনকে উদ্ধার করে নিয়ে আসা।
 
এদিকে অবৈধ অভিবাসীদের ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ভাগাভাগি করে নেয়ার যে প্রস্তাব ইইউর পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছে তার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ  করেছেন বৃটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেরেসা মে। টেলিগ্রাফকে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে তিনি বলেছেন শরণার্থীরা যেখান থেকে আসে সেখানেই তাদের ফেরত পাঠাতে হবে। তিনি মনে করেন, ইউরোপের দেশগুলো তাদের ভাগাভাগি করে নিলে সেটি মানবপাচারকারীদের কাছে ভুল বার্তা দেবে। তাদের কিছুতেই আর থামানো সম্ভব হবে না।