মুক্তিপণ দিয়ে ফিরে এল আঠারো জন

আপডেট : ২১ মে ২০১৫, ০০:০১

মো. আলাউদ্দিন শেখ (২৮), বাড়ি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ। সাগরে দীর্ঘ ৮০ দিন ট্রলারে নির্যাতনের শিকার হয়ে মুক্তিপণ দেয়ার পর সমুদ্রে ছোট নৌকায় তুলে দেয়া হয় তাকে। মুক্তিপণের টাকা দিয়ে ফেরত আসা আলাউদ্দিন বলেন, টাকা দেয়ার পরও শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন নিয়ে ফিরতে হয়েছে। অনেক লোক এখনো জিম্মি রয়েছে এবং অনেক মৃতদেহ পাওয়া যায় না। বললেন, শরীর হাড্ডিসার হয়েছে। দেখে কি মনে হয় আমি ভাল আছি। রবিবার ও সোমবার সমুদ্রে ১৮ বাংলাদেশি মুক্তিপণ দেয়ার পরও তাদের সাগরে নিক্ষেপ করে দালালরা। তাদের  কোস্ট গার্ড ও বিজিবি সহযোগিতায় উদ্ধার করা হয়।

 
আলাউদ্দিন শেখ বললেন, মোবাইল ফোন মেকানিক ছিলেন। ছোট একটি ঘরে স্ত্রী ও দুইটি সন্তান নিয়ে সংসার চলত ভালমত। একদিন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের দালাল তার বন্ধু মো. শহীদ মোটর চালক  হিসেবে পরিচিত। সে আমাকে ভ্রমণের কথা বলে চলতি বছরে ২০ এপ্রিল কক্সাজারে নিয়ে আসে। এরপর কক্সবাজার থেকে মহেষখালী নিয়ে আসে, সেখানে একটি ঝুপড়ি ঘরে হাত-পা বেঁধে ১৮ দিন আটকা রাখা হয়। তখন জানতে পারলাম শহীদ আমাকে ‘বস্তা’ হিসেবে ১০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দিয়েছে দালালচক্রের কাছে।
 
ঝুপড়ি ঘরে অর্ধশতাধিক লোক হওয়ার পর একদিন অন্ধকারে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া পাচারের উদ্দেশ্যে দালালচক্রের সদস্যরা তাদেরকে ছোট ছোট নৌকায় করে গভীর সাগরে অবস্থানরত ট্রলারে নিয়ে যায়। জাহাজে যাত্রী কম হওয়ায় মিয়ানমার জলসীমানার কাছাকাছি নিয়ে অবস্থান করে ৮০ দিন। ওই দালাল চক্রের কর্তৃত্বে সাগরে আরো তিনটি বড় জাহাজ ছিল। প্রতিটি জাহাজে যাত্রী ছিল তিনশতাধিক। জাহাজে লোকজন সম্পূর্ণ না হওয়ায় আমাদের দীর্ঘদিন সাগরে ভাসমান অবস্থায় রাখা হয়েছে। কেউ প্রতিবাদ করলে নির্যাতনের শিকার হতো। মেরে ফেলে সাগরে নিক্ষেপ করা হতো। দালালরা থাই সীমান্তে কড়াকড়ির খবর পেয়ে ট্রলারে লোকদের মারধর শুরু করে। পরে তাদের পরিবারের কাছে মোবাইল ফোনে টাকার জন্য ফোন করতে বাধ্য করে ও মুক্তিপণ দাবি করে। সর্বশেষ গত সোম-মঙ্গলবার ভোর রাতে দালালদের দেয়া বিভিন্ন ‘বিকাশ’ নম্বরে পরিবারের লোকজন ২০-৩০ হাজার টাকা করে আদায় করে; কিন্তু টাকা দেয়ার পরও নির্যাতন সইতে না পেরে সাগরে ঝাঁপ দিতে হচ্ছে তাদের।
 

মুক্তিপণ দিয়ে ফিরে আসা জয়পুর হাটের মো. জসিম উদ্দিন (১৯) বলেন, দীর্ঘ ৮০ দিন সাগরে পার করে দিলাম, কখনো ভাত চোখে দেখিনি। কত নিষ্ঠুর দালালচক্র তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। আমার মনে হয় আমার ওজন ২০ কেজি কমে গেছে। টাকার জন্য তারা আমার মতো কত লোককে মেরে ফেলে সাগরে নিক্ষেপ করেছে তার কোন হিসেব নেই!