তৃতীয় বাংলা খ্যাত লন্ডনে বাঙালি সংস্কৃতির প্রাণের উৎসব বৈশাখী মেলা আয়োজকের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম-অসংগতি ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এনিয়ে বাঙালি কমিউনিটিতে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিরা বলেছেন, আয়োজকরা ইচ্ছাকৃতভাবে খামখেয়ালি করেই মেলার মুখ্য চরিত্রের অপমৃত্যু ঘটিয়েছেন। কেউ কেউ বলছেন, এটা বাঙালি সংস্কৃতির বিকৃতি।
গত রবিবার পূর্ব লন্ডনের ভিক্টরিয়া পার্কে আয়োজিত এ মেলায় গিয়ে দেখা গেল দূরদুরান্ত থেকে পরিবার পরিজনসহ অনেক তরুণ-তরুণী এসেছেন মেলা উপভোগ করতে । কিন্তু সকলেই হতাশ হয়েছেন। চটপটি-ঝালমুড়ি, চানাচুর ভাজা, জিলাপি, রসগোল্লার পসরাও ছিল মেলায়। বৈশাখী আলপনা কারুকাজের শাড়ির সাথে হাতভরা চিকন রেশমি চুড়ি, মাটির তৈরি গহনা কানে ঝুমকা-দুল, গলায় পুঁতি বসানো আঁসলা, খোপায় ফুল গুঁজে আঁচল ঝুলিয়ে এসেছিলেন তরুণীরা। ছেলেরা পাঞ্জাবি-পাজামা-স্যান্ডেল, কেউ কেউ ফতুয়া পরে এসেছেন। তারপরও কেন হতাশ?
লন্ডন থেকে প্রায় ২শ’ মাইল দূরে বার্মিংহাম থেকে আগত রহীম আলী জানান, তিনি এসেছেন পুরো পরিবার ও প্রতিবেশী বন্ধুদের নিয়ে। প্রশ্ন করতেই তিনি ক্ষোভে ফেটে পড়লেন। বললেন- শুনেছিলাম মেলায় বাংলাদেশ থেকে নামি-দামি শিল্পিরা আসবেন। তিনি জানেন রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন, বাউল শিল্পিরা তো আছেনই।
রুনা লায়লার ‘সাধের লাউ বানাইলো মোরে বৈরাগী’ সহ বিভিন্ন শিল্পীর গাওয়া লোক সংগীতের আকুতির কথা জানালেন অনেকেই। এভাবে বিভিন্ন জায়গা থেকে আগতদের মধ্যে আক্কু মিয়া, হাফিজ উদ্দিন, সেলিম আলি বললেন লালন, হাচন রাজা, আবদুল করিম, রাধারমনের গানের সাথে জারি গান, পালা গানবিহীন মেলার আয়োজন একটি প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়।
টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের লজিস্টিক সহায়তায় দীর্ঘ অনিয়মের মধ্যে এবারেও মেলা অনুষ্ঠিত হলো। তবে আগামীতে বন্ধ করে দেয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক সভাপতি সিরাজ হকের বিরুদ্ধে দীর্ঘকালধরে লন্ডনে কথিত বৈশাখী মেলা আয়োজনের নামে বাঙালি সংস্কৃতি ধ্বংস ও বিকৃতি এবং মানবপাচারসহ গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। তার তদন্ত চলছে।
কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যাক্তিরা মনে করেন এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির তদন্ত ব্রিটিশ সরকার করলেও বাঙালি সংস্কৃতি ধ্বংস ও বিকৃতির অভিযোগ তদন্তের এখতিয়ার বাংলাদেশ সরকারের।
সম্প্রতি ভারতীয় বংশোদ্ভুত কানাডিয়ান নাগরিক সানি লিয়নের বিরুদ্ধে ভারতীয় সংস্কৃতি ধ্বংস ও বিকৃতির অভিযোগে ভারতীয় আদালতে তাকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে উল্লেখ করে যুক্তরাাজ্য আওয়ামী লীগের সভাপতি সুলতান মাহমুদ শরীফ বলেন, কোন দেশের জাতীয় সংস্কৃতির ধ্বংস সাধন কিংবা বিকৃতি ঘটানো কারোরই অধিকার নেই।
টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের সাবেক কাউন্সিলর ও কমিউনিটি নেতা হেলাল রহমান ইত্তেফাককে বলেন, তৃতীয় বাংলা হিসেবে পরিচিত লন্ডনে প্রায় এক মিলিয়নবাঙালি বসবাস করছেন। নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের সংখ্যা অনেক। তাদের কাছে বাংলাদেশকে পরিচিত করতে বাঙালি সংস্কৃতির বিকল্প নেই। বৈশাখি মেলা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
তিনি বলেন, এখানের নতুন প্রজন্ম সংগত কারণে পরিচিত হচ্ছে বড়দিন, থার্টিফাস্ট নাইটসহ মাল্টিকালচারাল সংস্কৃতির সঙ্গে। ফলে তারা বাংলাদেশকে ভুলে যাচ্ছে। আর্ন্তজাতিক গণমাধ্যমে প্রায়শই বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক সংবাদ প্রচার হয়। নতুন প্রজন্ম দিনদিন বাংলাদেশ বিমুখ হচ্ছে।
বৈশাখি মেলার মাধ্যমে আমাদের সংস্কৃতির বিকাশ এবং নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিয়ে তাদেরকে অনুপ্রাণিত করার সুযোগ এলেও দুর্ভাগ্যক্রমে তা একটি মাফিয়াচক্রের কবলে জিম্মি হয়ে পড়েছে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি লন্ডনে বৈশাখি মেলাকে ঘিরে যেসকল দুর্নীতি, অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে এবং বাঙালি সংস্কৃতি বিকৃতি ও ধ্বংসের সাথে জড়িতদের ব্যাপারে সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেন।
তিনি আরো বলেন, প্রথমে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল থেকে বাংলাদেশি এই মেলার সহযোগীতায় লজিস্টিক সহায়তাসহ নগদ ৫ হাজার পাউন্ড বরাদ্দ দেয়া হয়। ২০০৪ সালে তা বাড়িয়ে ২৫ হাজার করা হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে তা তিন লাখ পাউন্ডে দাঁড়ায়। নানা অনিয়মের প্রেক্ষাপটে বড় আকারের বাজেট কমিয়ে এবছর ৮০ হাজার পাউন্ড বরাদ্দ দেয়া হলেও দুর্নীতির অভিযোগে তা ছাড় দেয়া হয়নি। শুধু লজিস্টিক সাপোর্ট দেয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষ দুর্নীতির তদন্ত করছে। আগামীতে এই মেলা বন্ধ করে দেয়া হতে পারে।
ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের দক্ষিণ এশিয়ান ভাষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক বিভাগীয় প্রধান ড. ডানা হিলি বলেন, বাঙালি সংস্কৃতি-কৃষ্টি-সভ্যতা অতুলনীয়। বাংলা ভাষার সংগীত, নৃত্যকলা, বিনোদনের উপাদান এক কথায় নান্দনিক। চিত্রজগতে এর প্রমাণ করেছেন, সত্যজিত রায়, তারেক মাসুদসহ অনেকেই। সাহিত্য-সংগীতে রবীন্দ্র নাথ, কাজী নজরুল ইসলামের মতো জগৎ বিখ্যাত সাহিত্য গুণিজনদের পাশাপাশি আরো শতজন রয়েছেন যারা বিশ্বজুড়ে উচ্চাসনে স্বীকৃত। বিশ্বসঙ্গীত জগতে অসংখ্য কালাকার শিল্পী রয়েছেন বাঙালি। বর্তমান সময়ের রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন, ফেরদৌসি রহমান, ফেরদৌস আরা, সামিনা চৌধুরী, তপন চৌধুরী, ফকির আলমগীর উল্লেখযোগ্য।
তিনি বাংলা লোকসংগীত সম্পর্কে বলেন, ব্রিটিশ সমাজে লালন, হাচন রাজা, রাধারমন, আব্বাস উদ্দিন, আবদুল করিম, আরকুম শাহ, ফিরোজ সাঁই, রথীন্দ্র নাথ রায়, ইন্দ্র মোহন রাজবংশী, আবদুল আলীম বেশ সুপরিচিত । তিনি বাঙালি গজল ও কাওয়ালি গানেরও প্রশংসা করেন।
বৈশাখি মেলার আয়োজক সিরাজ হককে ইত্তেফাকের পক্ষ থেকে এ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে বাংলাদেশের শিল্পী সমাজকে অত্যন্ত অশালিন ভাষায় গালাগালি করেন। তিনি বলেন- ‘রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিনকে চেনে কার (অশ্লিল শব্দ)?। বাংলাদেশে কোন শিল্পী নাই উল্লেখ করে তিনি বলেন- ওদের কে (অশ্লিল শব্দ)?’
তিনি বাংলাদেশ, ভাষা, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে নোংড়া শব্দ উচ্চারণ করেন। একপর্যায়ে সে মারমুখি হয়ে ওঠে।
কমিউনিটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ অভিযোগ করেন মেলার নামকরে সিরাজ হক অন্তত এক মিলিয়ন পাউন্ড কালেকশন করে। বাংলাদেশি সংস্কৃতির এই অনুষ্ঠানে গ্লোবাল লেবার অরগানাইজেনের মতো সংগঠনসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ীক গ্রুপ অনুদান দিয়ে থাকে।যার পুরোটাই তার কালো হাতে কুক্ষিগত।
কমিউনিটির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম প্রাণের বৈশাখি মেলায় বিজাতীয় সংস্কৃতির লালন করছেন বিএনপির এই সাবেক নেতা। বাংলাদেশি শিল্পীদের উপেক্ষা করে হিন্দি গানের শিল্পীদের এনে ডিজে, ব্যালে নৃত্যের পাশাপাশি বাঙালি সংস্কৃতির নামে অপসংস্কৃতির প্রচার করা হচ্ছে নতুন প্রজন্মের সামনে। তারা মনে করেন এটা বাঙালি সংস্কৃতির অপপ্রচার।
বাংলাদেশ ওয়েল ফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি, কমিউনিটি নেতা ও বৈশাখি মেলা কমিটির সাবেক বোর্ড মেম্বার নুরুল ইসলাম বলেন, বৈশাখি মেলার অন্তরালে সিরাজ হক মূলত মানব পাচার করে থাকে। ৮-১০ লাখ টাকার বিনিময় শিল্পী ( গায়ক, নায়ক, নৃত্য শিল্পী, আবৃত্তি শিল্পী) সাজিয়ে লোক আনতে গিয়ে সিরাজ হক ঢাকাস্থ ব্রিটিশ হাইকমিশনের কাছে ধরাও পড়েছেন।
তিনি বলেন, সিরাজ হক পুরো কমিউনিটি ও দেশের মর্যাদা বিনষ্ট করার পাশাপাশি বাঙালি সংস্কৃতিকে ধ্বংস করছে।
ব্রিকলেনের বিশিষ্ট রেস্তরাঁ ব্যবসায়ী শামসুদ্দিন শামস বলেন, সিরাজ হক নব্বই দশকের শুরুর দিকে নুন আনতে পানতা ফুরানো অবস্থায় ছিল। তার বিরুদ্ধে নানা অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। তার মিলিয়নিয়ার হওয়ার রহস্য কেউ জানে না। বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্য সরকারের যৌথ তদন্ত হওয়া উচিত।
তিনি আরো বলেন, কথিত মেলার সাথে বাঙালি কমিউনিটির কোন সম্পর্ক নেই। কারণ ওই মেলায় আমাদের সংস্কৃতির কোন প্রতিফলন নেই।
ব্রিকলেনস্থ বাংলা ভাষার বইয়ের একমাত্র লাইব্রেরির মলিক সাহানুর মিয়া বলেন, এদেশে নিয়ম রয়েছে মাল্টিকালচারের দেশ হলেও জাতিভিত্তিক সংস্কৃতির যেকোন উত্সব হতে হবে ওই সম্প্রদায়ের লোকজনকে ঘিরে। তারাই হবে প্রধান উপলক্ষ্য। অন্যরা মূল সম্প্রদায়ের লোকজনের আনন্দকে ভাগাভাগি করবেন। বৈশাখী মেলার নামে বাঙালি কালচারকে ধ্বংস করার পাশাপাশি বাঙালিদেরেকে সবদিক থেকেইে বঞ্চিত করছে একটি মাফিয়া চক্র।
মেলায় আগত তরুণ মিডিয়া ও আইটি কর্মী অপু বলেন- আমি দারুণভাবে মর্মাহত হয়েছি। কারণ এখানে এসে দেখলাম ইংলিশ গান বাজানো হচ্ছে। ঢাক-ঢোল কিছুই নেই। নেই বৈশাখি মেলার আকর্ষণ ঢোল নৃত্য। বাঙালি গুণি বাউল শিল্পি বা সংগীত নেই। এমনকি রবীন্দ্র-নজরুল সংগীত-কবিতা আবৃত্তি তো নেই । এমনটা প্রতারণা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিবিসি বাংলার জনৈক সিনিয়র সাংবাদিক ইত্তেফাককে বলেন, প্রথম দিকে বিবিসি বাংলা এই মেলার সংবাদ বেশ আগ্রহ নিয়ে প্রচার করতো। এখন আর করছে না। কারণ বৈশাখী মেলার নামে বাঙালি সংস্কৃতির বিকৃতি ঘটানো হচ্ছে।
সিরাজ হকের অপকর্ম-কুকীর্তির খবর ব্রিটিশ মূলধারার সংবাদপত্র ডেইলি মেইল, সানডে টাইমসসহ বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশ হয়েছে। এনিয়ে তদন্তও চলছে। তবে বৈশাখী মেলার আর্থিক দুর্নীতি তদন্ত হলেও সংস্কৃতি ধ্বংস ও বিকৃতির অভিযোগ বাংলাদেশ সরকারকেই করতে হবে এমন অভিমত দিয়েছেন আইনজ্ঞরা।
তবে কমিউনিটির একাধিক নেতা জানিয়েছেন সিরাজ হক বিএনপি চেয়ারপার্সনের একজন প্রভাবশালি উপদেষ্টার অবৈধ অর্থের ট্রেজারার। এই অবৈধ অর্থের জোরে ধরাকে সরা জ্ঞান করেনা। ওই উপদেষ্টার রয়েছে মিডিয়া হাউসও। এই কথিত মেলায় ওই মিডিয়া হাউসকে স্পন্সর ছিল।
ব্রিটিশ মিডিয়ার রিপোর্টে হয়েছে বাংলাদেশি মাল্টিমিলিয়নিয়ার সিরাজ তার সম্পদ গোপন করে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে সপ্তাহে ১৩৫ পাউন্ড কাউন্সিলের সোশ্যাল বেনিফিট প্রতারণা করছে এবং কাউন্সিল ঘরেই বসবাস করছে। কমিউনিটির মধ্যে প্রশ্ন তা হলে সিরাজের এই সম্পদের প্রকৃত মালিক কে?
