‘যেদিন আমি হারিয়ে যাব, বুঝবে সেদিন বুঝবে!/ অস্তপারের সন্ধ্যাতারায় আমার খবর পুছবে-/ বুঝবে সেদিন বুঝবে।/ .... গাইতে বসে কণ্ঠ ছিঁড়ে আসবে যখন কান্না,/ বলবে সবাই- ‘সেই যে পথিক তার শোনানো গান না?’ (কাজী নজরুল ইসলাম; অভিশাপ)।
অভিমান নিয়ে লিখেছিলেন কবি। সত্যিই কবিকে আজ সবাই শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন, যখন তিনি নেই আমাদের মাঝে।
আজ ১১ জ্যৈষ্ঠ, বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১১৬তম জন্মবার্ষিকী। তিনি প্রেমের কবি, বিরহ-বেদনা ও সাম্যের কবি। বাংলা সাহিত্য-সঙ্গীত তথা সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান পুরুষ। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে তার লেখনী ধূমকেতুর মত আঘাত হেনে জাগিয়ে দিয়েছিল ভারতবাসীকে। তিনি পরিণত হন বিদ্রোহের কবিতে। আজও তার নানা ধরনের লেখার মাঝ থেকে বিদ্রোহের পংক্তিমালা বাঙালির হূদয়ে অনাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের দুন্দুভি বাজিয়ে চলে। তার কবিতা ‘চ্ল চল্ চল’ বাংলাদেশের রণসঙ্গীত।
বাংলা ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ বর্ধমান জেলার আসানসোলের জামুরিয়া থানার চুরুলিয়া গ্রামে কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম। তাঁর ডাক নাম ‘দুখু মিয়া’। পিতার নাম কাজী ফকির আহমেদ ও মাতা জাহেদা খাতুন। কবির জন্মবার্ষিকীর দিনটি জাতি গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র ভালবাসায় উদযাপন করবে। এ বছর জন্মবার্ষিকীর মূল অনুষ্ঠান হবে কুমিল্লায়। কুমিল্লার টাউনহল চত্বরে আজ সোমবার বিকাল ৪টায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এবার কাজী নজরুল ইসলামের জন্মবার্ষিকী উদ্যাপনের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘কুমিল্লায় নজরুল’। নজরুলের প্রেম-বিয়ে-বিচ্ছেদ, গ্রেফতার, সমাবেশ এবং কাব্য ও সংস্কৃতিচর্চাসহ বহু ঘটনার সাক্ষী এ শহর। কুমিল্লা জেলার দৌলতপুরে সৈয়দা খাতুন নামে এক কিশোরীকে তিনি ভালোবেসেছিলেন। নাম রেখেছিলেন ‘নার্গিস’। ১৯২১ সালে নির্ধারিত বিয়ের দিনটিতেই তাঁদের বিয়ে ভেঙ্গে যায়। নার্গিসকে নিয়ে তিনি লিখেন ‘যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পার নাই/কেন মনে রাখো তারে’। এই শহরে এখনো কবির অনেক স্মৃতি বহমান। নজরুলের স্ত্রী প্রমীলার বাড়িও এখানে। জাতীয় কবির জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ পৃথক বাণী দিয়েছেন।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ‘বিদ্রোহী কবি’ এবং আধুনিক বাংলা গানের ‘বুলবুল’ নামে খ্যাত কাজী নজরুল ইসলাম বিশ শতকের বিশ ও ত্রিশের দশকে অবিভক্ত বাংলার সাংস্কৃতিক জগতে সবচেয়ে বর্ণাঢ্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের ব্যর্থ অনুকরণ ও অনুসরণের কৃত্রিমতা থেকে আধুনিক বাংলা কবিতাকে মুক্ত করার ক্ষেত্রে কাজী নজরুল ইসলামের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে ফলপ্রসূ। তাই তিনিই রবীন্দ্রোত্তর সাহিত্যে আধুনিকতার পথিকৃত্। নজরুল তার কবিতা, গান, উপন্যাসসহ অন্যান্য লেখনী ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে পরাধীন ভারতে বিশেষ করে অবিভক্ত বাংলাদেশে সামপ্রদায়িকতা, সামন্তবাদ, সাম্রাজ্য ও উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বলিষ্ঠ ও সোচ্চার কণ্ঠ ছিলেন। সে কারণে ইংরেজ সরকার তার গ্রন্থ ও রচনা বাজেয়াপ্ত করেছে এবং কারাদণ্ড দিয়েছে। কারাগারেও বিদ্রোহী নজরুল টানা চল্লিশ দিন অনশন করে বিদেশি সরকারের জেলজুলুমের প্রতিবাদ করেছিলেন।
কুমিল্লায় ঐতিহ্যবাহী টাউনহল মাঠে জাতীয় কবির জন্মবার্ষিকীর তিনদিন ব্যাপী সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠানের জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। আজ বিকাল ৪টায় টাউনহল মাঠে অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিশেষ অতিথি থাকবেন পরিকল্পনা মন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল, রেলপথ মন্ত্রী মোঃ মুজিবুল হক, সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার, নজরুল ইন্সটিউটের ট্রাস্টি বোর্ড সভাপতি প্রফেসর এমিরিটাস রফিকুল ইসলাম। সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর সভাপতিত্ব করবেন।
আজ সকাল সাড়ে ৬টায় সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়স্থ কবির সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। কবির জন্মবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে নজরুল ইন্সটিটিউট আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করছে। এছাড়াও ঢাকাসহ জাতীয় কবির স্মৃতিবিজড়িত ময়মনসিংহের ত্রিশাল এবং চট্টগ্রামে স্থানীয় প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় যথাযোগ্য মর্যাদায় তাঁর ১১৬তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন করা হবে।
বাংলা সাহিত্যে বিদ্রোহী কবি হিসেবে পরিচিত হলেও তিনি ছিলেন একাধারে কবি, সংগীতজ্ঞ, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক, চলচ্চিত্রকার, গায়ক ও অভিনেতা। তিনি বৈচিত্র্যময় অসংখ্য রাগ-রাগিণী সৃষ্টি করে বাংলা সঙ্গীত জগেক মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন। তার কবিতা, গান ও সাহিত্য কর্ম বাংলা সাহিত্যে নবজাগরণ সৃষ্টি করেছিল। তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার পথিকৃত্ লেখক। তাঁর লেখনি জাতীয় জীবনে অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিকাশে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। তাঁর কবিতা ও গান মানুষকে যুগে যুগে শোষণ ও বঞ্চনা থেকে মুক্তির পথ দেখিয়ে চলছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর গান ও কবিতা ছিল প্রেরণার উত্স। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পরই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কাজী নজরুল ইসলামকে সপরিবারে সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। ধানমন্ডিতে কবির বসবাসের জন্য একটি বাড়ি প্রদান করেন তিনি।
রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ তার বাণীতে বলেছেন, নতুন প্রজন্ম নজরুল চর্চার মাধ্যমে নিজেদের সমৃদ্ধ করে দেশপ্রেম ও সততা দিয়ে সুখী-সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়তে অর্থবহ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম অসাম্প্রদায়িক, বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত ও শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন দেখতেন তা বাস্তবায়নের জন্য তার সরকার কাজ করে যাচ্ছে।
ঢাবির কর্মসূচি
কাজী নজরুল ইসলামের ১১৬তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশ থেকে সকাল সাড়ে ৬টায় উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের নেতৃত্বে শোভাযাত্রা সহকারে কবির মাজারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হবে। পরে মাজার প্রাঙ্গণে স্মরণ সভা অনুষ্ঠিত হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ‘নজরুল গবেষণা কেন্দ্রের আয়োজনে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক-অধ্যাপকদের সুচিন্তিত গবেষণা-প্রবন্ধের উপস্থাপনার মাধ্যমে দিনব্যাপী দুই পর্বের ‘জাতীয় সেমিনার’ বিশ্ববিদ্যালয়ের মুজাফফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হবে সকাল ১০টায়। সেমিনারের দ্বিতীয় পর্ব অনুষ্ঠিত হবে অপরাহ্নে। বিকাল ৪টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র অডিটোরিয়ামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেন্টার ফর ইন্টাররিলিজিয়াস এন্ড ইন্টারকালচারাল ডায়ালগ (সিআইআইডি) এবং বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের যৌথ উদ্যোগে ‘অসাম্প্রদায়িকতা কী এবং কেন?’ শীর্ষক এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।
এছাড়া চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে নজরুল মেলা অনুষ্ঠিত হবে। বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমীসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন বর্ণাঢ্য আয়োজনে উদযাপন করবে কবির ১১৬তম জন্মবার্ষিকী।
আওয়ামী লীগের কর্মসূচি
কাজী নজরুল ইসলামের ১১৬তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে আওয়ামী লীগ । আজ সকাল ৭টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে চিরনিদ্রায় শায়িত কবির সমাধিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করা হবে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন, সমবায় মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের পক্ষ থেকে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিন যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের জন্য আওয়ামী লীগ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতা-কর্মী, সমর্থক, শুভানুধ্যায়ী ও দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
