মানব পাচার ঠেকাতে বৈশ্বিক উদ্যোগে থাকবে বাংলাদেশ

আপডেট : ২৯ মে ২০১৫, ২৩:৫৪

দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় অঞ্চলে অবৈধ অভিবাসন ও মানবপাচার প্রতিরোধে যেকোন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক উদ্যোগে যুক্ত হতে প্রস্তুত রয়েছে বাংলাদেশ। গতকাল শুক্রবার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠিত ১৭ দেশের প্রতিনিধিদের বৈঠকে বাংলাদেশ তার এ অবস্থানের কথা তুলে ধরেছে। মানব পাচার ঠেকাতে ও বর্তমান সংকট উত্তরণে ১৭ দফা প্রস্তাব ও সুপারিশ উঠে এসেছে গতকালের এ বৈঠকে। সাগরে ভাসমান মানুষদের অনুসন্ধান ও উদ্ধারের বিষয়ে একমত পোষণ করে উদ্ধার হওয়া অভিবাসীদের কাছে ইউএনএইচসিআর ও আইওএমের কর্মকর্তাদের পৌঁছানোর বিষয়টি নিশ্চিত করারও সুপারিশ করা হয়েছে বৈঠকে। খবর বিবিসি, ফুকেট ওয়ান টুরিজম নিউজের।

 
মানব পাচার ও অবৈধ অভিবাসন সমস্যা মোকাবেলায় গতকাল দিনভর ব্যাংককে ‘স্পেশাল মিটিং অন ইরেগুলার মাইগ্রেশন ইন দ্য ইন্ডিয়ান ওশ্যান’ শীর্ষক বৈঠকে অ্যাসোসিয়েশন অব সাউথ ইস্ট এশিয়ান নেশন্স (আসিয়ান)-এর সদস্য রাষ্ট্রসহ ভারত মহাসাগরে অবৈধ অভিবাসন সমস্যায় আক্রান্ত ১৭টি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা এ বৈঠকে অংশ নেন। দেশগুলো হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া, বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, লাওস, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, পাপুয়া নিউগিনি, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও ইরান। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও সুইজারল্যান্ডের পর্যবেক্ষক ও জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা, জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক কার্যালয় এবং ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশনের কর্মকর্তারাও এ বৈঠকে অংশ নেন। এতে উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রী তানাসাক পাতিমাপ্রাগোর্ন। তিনি বলেন, মিয়ানমারে নির্যাতন এড়াতে রোহিঙ্গারা এবং দারিদ্র্য থেকে পালাতে মরিয়া বাংলাদেশিরা বিপদসঙ্কুল পথে অভিবাসনের দিকে ঝুঁকছে। এই সংকট মোকাবেলায় তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা চান। জেনারেল তানাসাক বলেন, এই সঙ্কট কোনো একটা দেশের একার পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয় এবং মানব পাচার বন্ধ করতে একটা সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
 
সম্প্রতি থাই কর্তৃপক্ষ মানব পাচার চক্রগুলোর কর্মকাণ্ড কঠোর হাতে দমন করার উদ্যোগ নেয়ার পর আন্দামান সাগরে ভাসমান হাজার হাজার অভিবাসন প্রত্যাশীর সঙ্কটের চিত্র প্রকাশ পায় এবং এই পটভূমিতে দুই সপ্তাহ আগে থাইল্যান্ড এই সঙ্কট নিয়ে আলোচনার জন্য এই বৈঠক ডাকে।
 
বৈশ্বিক প্রচেষ্টায় যোগ দিতে প্রস্তুত বাংলাদেশ
 
ব্যাংককের বৈঠকে নানা কারণে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। বৈঠকে অংশ নিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক বলেছেন, মানব পাচার ঠেকাতে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রচেষ্টায় যোগ দিতে প্রস্তুত রয়েছে বাংলাদেশ। পররাষ্ট্র সচিব বলেন, প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী সম্প্রতি দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোতে উদ্ধার হওয়া অভিবাসীদের ৩০ ভাগ বাংলাদেশি হতে পারে। কোথাও বাংলাদেশি উদ্ধার হয়েছেন জানা মাত্রই বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রতিনিধিরা সেখানে ছুটে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে বাংলাদেশে পাঠাচ্ছেন। কথিত বাংলাদেশিদের আশ্রয় দেয়া দেশগুলোকে ধন্যবাদ জানিয়ে পররাষ্ট্র সচিব আশ্বাস দেন, নাগরিকত্ব নিশ্চিত হলে এক মাস বা দ্রুত সময়ের মধ্যে বাংলাদেশে তাদের ফিরিয়ে নেয়া হবে।
 
তিনি বলেন, মানব পাচারের বিষয়ে বর্তমান সরকার কোনো ছাড় না দেয়ার নীতিতে অটল রয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীগুলো সজাগ রয়েছে। সাগর পথে মানবপাচারের এমন ঘটনা অতীতে বাংলাদেশে দেখা যায়নি। বাংলাদেশের পর্যবেক্ষণ হলো সাগর পথে মানব পাচারের কারণ দারিদ্র্য নয়। বাংলাদেশে প্রতি বছর দারিদ্র্য ২ শতাংশ হারে কমছে। গত ছয় বছর ধরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছয় শতাংশের ওপর রয়েছে।
 
পররাষ্ট্র সচিব তার বক্তব্যে এ অঞ্চলে মানবপাচার সমস্যা মোকাবিলায় মূল কারণগুলো সমাধানের বিষয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের আহ্বানের কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এ সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য মূল কারণগুলো সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। এক্ষেত্রে বৈশ্বিক প্রচেষ্টায় যুক্ত হতে বাংলাদেশ প্রস্তুত।
 
সম্মেলনে বাংলাদেশ ছাড়াও ক্ষতিগ্রস্ত মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার প্রতিনিধিরা দেশের অবস্থান তুলে ধরে অভিবাসীদের মানবিক সহায়তা প্রদানে তাদের অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
 
তবে বৈঠকে মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের দুরাবস্থার অভিযোগ তুলে জাতিসংঘ দেশটির সরকারকে জনগণের পূর্ণ দায়িত্ব নেয়ার আহবান জানালেও মিয়ানমার বলেছে মূল সমস্যা মানবপাচার, রোহিঙ্গা নয়। এর দায়িত্ব শুধু মিয়ানমারের একার নয়।
 
সম্মেলনে উঠে আসা ১৭ দফা প্রস্তাব ও সুপারিশ
 
ব্যাংকক বৈঠকে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি ও সংস্থার কর্মকর্তারা ১৭ দফা প্রস্তাব ও সুপারিশ তুলে ধরেছে। বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং জাতিসংঘ মিলে এই সমস্যা সমাধানে একযোগে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্যে সাগরে ভাসমান মানুষদের নিরাপত্তায় জরুরি ভিত্তিতে পদেক্ষপ নেয়ার জন্য আট দফা প্রস্তাব এসেছে। এগুলো হলো:গত ২০ মে’র মালয়েশিয়ায় ত্রিদেশীয় ঘোষণা অনুযায়ী অভিবাসীদের আশ্রয় দেয়ার বিষয়ে আঞ্চলিকভাবে সাড়া প্রদান, ভাসমানদের সন্ধানে অভিযান জোরদার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অভিবাসী বহনকারী নৌকা তীরে ভিড়তে দেয়া ও তাদের দেখভালের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করা, অভিবাসীদের কাছে ইউএনএইচসিআর ও আইওএমের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা, নারী ও শিশুদের মতো অরক্ষিত গোষ্ঠীর নিরাপত্তা বিধানে বিশেষ পদক্ষেপ নেয়া, সাগরে ভাসমান অভিবাসীদের অবস্থান শনাক্ত করতে তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা জোরদার করা, যেসব দেশ অভিবাসীদের আশ্রয় দিচ্ছেন তাদেরকে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান এবং উদ্ধারকৃতদের অন্য দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস ও নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের জন্য যৌথ টাস্ক ফোর্স গঠন করা এবং আন্তর্জাতিক দায়ভার ভাগ করে নেয়ার দায়িত্ব থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও সংগঠনকে জরুরি ভিত্তিতে সহায়তার জন্য এগিয়ে আসা।
 
এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য ও বাংলাদেশের কক্সবাজারে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের সহায়তার জন্য বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ৩০ লাখ মার্কিন ডলার আইওএমকে এবং অস্ট্রেলিয়া ৫০ লাখ ডলার মানবিক সহায়তা দিতে রাজি হয়েছে।
 
অবৈধ অভিবাসন, অভিবাসী ও মানবপাচার সমন্বিতভাবে প্রতিরোধেও আট দফা প্রস্তাব উঠে এসেছে ব্যাংককের বৈঠকে। এর মধ্যে রয়েছে মানবপাচার রোধে জাতীয় আইন প্রয়োগ জোরদার, আন্তঃরাষ্ট্রীয় অপরাধ চক্র নির্মূলে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে তদন্তের তথ্য আদান-প্রদান, পারস্পরিক আইনগত সহযোগিতা জোরদার, বন্দি বিনিময়ে সহযোগিতা, অপরাধ চক্র নির্মূলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান জোরদার করা, ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতে বিশেষ অনুসন্ধান টাস্কফোর্স গঠন, জনশক্তি রপ্তানি ও নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ প্রক্রিয়া গড়ে তোলা, অপরাধ চক্রের বিরুদ্ধে সমন্বিত আঞ্চলিক প্রচারণা চালানো এবং অভিবাসনের বৈধ, নিরাপদ চ্যানেলের ব্যবহার নিশ্চিত করা।
 

এছাড়া বৈঠকে অবৈধ অভিবাসন ও মানবপাচারের কারণগুলোর সমাধান ও ঝুঁকিতে থাকা সম্প্রদায়ের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে এক দফা সুপারিশ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে উন্নয়ন ও মানবিক সহযোগিতা বৃদ্ধি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক  প্রচেষ্টা জোরদারের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন দেশের সহায়তার অঙ্গীকারকে স্বাগত জানিয়েছেন। একইসঙ্গে এ বিষয়ে আরো বিস্তৃত আলোচনায় বসতে তারা সম্মত হয়েছেন।