প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেছেন, ‘একটি দেশের জন্য আইনের শাসন গুরুত্বপূর্ণ। দেশ আইনের শাসন অনুযায়ী পরিচালিত হতে হবে। উপলক্ষ চাইলে বিচার বিভাগের সমালোচনা করা যেতে পারে। অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের মতো এ বিভাগেরও ন্যায্য সমালোচনা হতে পারে। কিন্তু অনুচিত ও দায়িত্বহীন সমালোচনা বিচার বিভাগের অপূরণীয় ক্ষতি করে। কিছু ত্রুটি স্বত্ত্বেও বিচার বিভাগকে এখনো মানুষ সম্মানের জায়গায় রেখেছে। এ সম্মান রক্ষা এবং বৃদ্ধিতে বিচার ও আইন পেশা সংশ্লিষ্টদের বড় দায়িত্ব রয়েছে।’
শনিবার রাজধানীতে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ‘ডিজিটালাইজেশন অব বাংলাদেশ জুডিসিয়ারি’ শীর্ষক কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। জাতিসংঘের উন্নয়ন সংস্থা ইউএনডিপি ও বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতায় সেমিনারের আয়োজন করে সুপ্রিম কোর্ট।
প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘এখন আইন, প্রযুক্তি ও সমাজের মধ্যে অঙ্গাঅঙ্গী সম্পর্ক রয়েছে। এগুলোকে পরষ্পর পৃথক করা যাবে না। বিভিন্ন ধরনের নতুন প্রযুক্তির উদ্ভবের কারণে বিদ্যমান আইনের পাশাপাশি নতুন আইন প্রণয়ণ করা প্রয়োজন। প্রযুক্তির অপব্যবহার ঠেকাতেও এটি জরুরি। আইন পরিষদ, আদালত এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মত সিদ্ধান্ত-গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ও সামাজিক আচরণের মিথস্ক্রিয়া নিরীক্ষা করতে হয়। আইনি অনুশীলনে এই আইন ও প্রযুক্তির বিস্তৃত এবং ধারাবাহিক চর্চা বাড়ছে।’
তিনি বলেন, ‘তথ্য প্রযুক্তি চালু করলেই আমাদের সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে না। তথ্য প্রযুক্তি চালু করার পূর্বে কিছু মৌলিক ও কাঠামোগত পদক্ষেপ নিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে ৬৪ জেলা আদালতে ইন্টারনেট, ওয়াইফাই সংযোগ, মামলার অনলাইন তথ্য, ওয়েব/এসএমএস ভিত্তিক কার্যতালিকা, জেলা আদালতগুলোর সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের ভিডিও কনফারেন্স সিস্টেম, ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সাক্ষ্য নথিভুক্তকরণ, ইলেক্ট্রনিক কেইস ফাইলিং সিস্টেম, জেলা আদালতের মামলা ব্যবস্থাপনা, সব আদালতের ডিজিটাল ডিসপ্লে, রায়ের আর্কাইভ, রেকর্ড ডিজিটালাইজেশন, ই-লাইব্রেরি, অ্যাকাউন্টিং সফটওয়ার, জেলা আদালতের তথ্যকেন্দ্র, বায়ো মেট্রিক এটেন্ডেন্স সিস্টেম, তথ্য প্রযুক্তিভিত্তিক দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ।’
সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেন, ‘বর্তমান আইন অনুযায়ী কিছু বিশেষ আইন রক্ষার জন্য আমাদের আনুষ্ঠানিক আদালত পদ্ধতি ডিজিটাল দলিল কিংবা ইলেক্ট্রনিক কমিউনিকেশন প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করে না। বিচার পদ্ধতি ও ব্যবস্থাপনায় উপযুক্ত সফটওয়্যার ও অটোমেশন পদ্ধতি ব্যবহারের জন্য যথাযোগ্য আইসিটি অবকাঠামো গড়ে তোলার সময় হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আদালতে এখনে বিরাট সংখ্যক অনিষ্পত্তিকৃত মামলা রয়েছে এবং অভিযোগের সংখ্যা বাড়ছেই। এ অবস্থায় মামলাগুলোর বিচার কাজ যৌক্তিক পর্যায়ে যেতে অনেক সময় নিলে দরিদ্র্য, তৃণমূল এবং ঝুঁকিপূর্ণ বাসিন্দারা সবচেয়ে বেশী দুর্ভোগে পড়ে। উন্নয়নের সুফল সমাজের সবচেয়ে পিছনের মানুষটির কাছে পোঁছানোর জন্য এ মামলা জট দূর করে বিচারবিভাগকে গতিশীল করতে হবে।’
বিশেষ অতিথি আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ‘মানুষের অধিকার রক্ষায় বিচার ব্যবস্থাকে ন্যায্য ও গতিশীল পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এ জন্য সরকার সহায়তাও করছে।’
সম্মানিত অতিথির বক্তব্যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, ‘ন্যায়বিচার পেতে জনগণকে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়। এটা নিয়ে প্রধান বিচারপতিও কথা বলেছেন। বিচার বিভাগের সমস্যা সমাধানে তথ্য প্রযুক্তিকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হবে।’
সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল সৈয়দ আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘বিচার বিভাগের জন্য একটি সমন্বিত আইসিটি নীতিমালা করা দরকার।’
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ ও ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি রবার্ট ওয়াটকিনস।
উপস্থিত ছিলেন বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, মো. ইমান আলী, হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, মির্জা হোসেইন হায়দার, মানবতা-বিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চেয়ারম্যান মো. নিজামুল হক, বর্তমান চেয়ারম্যান এম ইনায়েতুর রহিম, বিচারপতি নাইমা হায়দার, বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুর।
