ভারী বর্ষণে পানিবন্দী মানুষের ভোগান্তি আরো বেড়েছে

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০১৫, ০০:৩৩

ঘূর্ণিঝড় কোমেন ও মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে গতকাল শনিবারও সারা দেশে ভারী বর্ষণ অব্যাহত ছিল। বৃষ্টিতে বাড়ছে নদ-নদীতে পানি। ভাঙা বাঁধ দিয়ে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করছে। এতে পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ আরো বেড়েছে। সাভারে মাটির ঘর ভেঙ্গে নিহত হয়েছে এক বৃদ্ধ। আমাদের অফিস, প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর: 

 
ফেনী : দাগনভূঞা উপজেলার ৫৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে পড়েছে । সদর উপজেলার পাঁচগাছিয়া ইউনিয়নের ছোট ধলিয়া, ডমুরুয়া, এলাহিগঞ্জ, বিরলী, রতনপুর, উজালিয়া, ভগবানপুর, শর্শদী ইউনিয়নের আবুপুর গ্রাম পানিতে প্লাবিত হয়েছে। এই দুই উপজেলার প্রায় দেড় লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। বন্যা কবলিত হওয়ায় উপজেলার প্রায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। ফুলগাজী উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।
 
ইত্তেফাক রিপোর্ট: সাভারে টানা বৃষ্টিতে মাটির ঘর ভেঙ্গে ঘরের নিচে চাপা পড়ে নিহত হয়েছে এক বৃদ্ধ। শুক্রবার গভীর রাতে সাভার পৌর এলাকার দেওগাঁও দক্ষিণপাড়া এলাকায় এঘটনা ঘটে। নিহত বৃদ্ধর নাম তৈয়র আলী দেওয়ান(৬০)। তার গ্রামের বাড়ী ফরিদপুর জেলার জাজিরা থানার জাজিরা গ্রামে।
 
কাউখালী (পিরোজপুর) : কচা, সন্ধ্যা গাবখান এবং কালিগঙ্গা নদীর পানি স্বাভাবিকের চেয়ে তিন থেকে চার ফুট ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় গতকাল উপজেলার নদী তীরবর্তী  ৫টি ইউনিয়নের  নিম্নাঞ্চলের অন্তত ২৭ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে কয়েক হাজার মানুষ।
 
বাঘা (রাজশাহী):নদীতে পানি বাড়ার পাশাপাশি   টানা বৃষ্টিতে প্লাবিত উপজেলার নিম্নাঞ্চল। ভেঙ্গে গেছে অসংখ্য রাস্তাঘাট। তলিয়ে গেছে জমির ফসল। পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় বাঘা পৌর এলাকা-সহ উপজেলার নিচু এলাকার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।
 
চন্দনাইশ (চট্টগ্রাম) : ভারী বর্ষণ ও ঘূর্ণিঝড় কোমেনের প্রভাবে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। ইতিমধ্যে উপজেলার দোহাজারী, চাগাচর, বারুদ খানা, বেগম বাজার, দিয়াকুল, জামিজুরী, হাশিমপুর, সাতবাড়িয়া, বরকল বরমা ও ফতেনগর এলাকায় নতুন করে পানি ঢুকে পড়ায় সাধারণ মানুষ আতংকিত হয়ে পড়েছে। 
 
 কেশবপুর (যশোর) : অবিরাম বর্ষণ, কপোতাক্ষ ও হরিহর নদীর উপচে পড়া পানিতে কেশবপুর পৌর শহরসহ উপজেলার ৮০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে ৫০ হাজার মানুষ। সেই সাথে তলিয়ে গেছে সদরের মাছ বাজারসহ অসংখ্য রাস্তাঘাট ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
 
রামগতি (লক্ষ্মীপুর) : ঘূর্ণিঝড় ‘কোমেন’ ও পুর্ণিমার প্রভাবে রামগতি উপজেলার নিম্নাঞ্চল ও নিম্ন চরাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে চার ফুট উচ্চতায় প্লাবিত হয়। ওই সময় দমকা বাতাসে একটি মসজিদসহ ১০টি বসতঘর বিধ্বস্ত হয়।
 
পটুয়াখালী : গতকাল বেলা ১১টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয় পটুয়াখালী শহরের নূতন বাজার, সদর রোড, সেন্টারপাড়া, চরপাড়া, পোষ্ট অফিস রোড, লতিফ স্কুল রোড, হাসপাতাল এলাকা, জুবিলী স্কুল রোডসহ অনেক এলাকা। এসময় পটুয়াখালী-কুয়াকাটা সড়কের খেপুপাড়া, হাজিপুর ও মহিপুর এবং পটুয়াখালী-বরিশাল সড়কের ফেরিঘাটের সংযোগ সড়কসহ গ্যাংওয়ে ডুবে যায়। এতে জোয়ারের সময় এই রুটের যানবাহন চলাচল বিঘ্ন ঘটে।
 
বান্দরবান : অবিরাম বর্ষণ ও পাহাড়ী ঢলে বান্দরবানে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পানি বন্দি হয়ে পড়েছে। প্রধান সড়কের বাজালিয়া এলাকায় সড়কে পানি জমে যাওয়ায় বান্দরবানের সঙ্গে সারাদেশের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
 
ভাণ্ডারিয়া(পিরোজপুর): ভাণ্ডারিয়াসহ উপকুলীয় দক্ষিনাঞ্চলে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া এবং টানা কয়েক দিনের বৃষ্টি আর নদ-নদী পানি বৃদ্ধির ফলে অস্বস্তিতে জনজীবন। নিম্ন আয়ের মানুষের বেশি ক্ষতি হয়েছে। নিয়মিত কাজ  কর্মে যেতে না পাড়ায় পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। 
 
কাঠালিয়া (ঝালকাঠি) : বিষখালী নদীর পানি স্বাভাবিকের চেয়ে ৪/৫ ফুট পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় আমুয়া ফেরীঘাটের গাংওয়ে তলিয়ে যায়। কয়েটটি রুটের বাস চলাচল দুই ঘন্টা বন্ধ ছিল। ফলে যাত্রীরা পরে চরম দুর্ভোগে। দীর্ঘক্ষন শত শত লোক ও বাস যাত্রী গাংওয়ের দু’পারে আটকে থাকে।
 
স্বরূপকাঠি (পিরোজপুর) : উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়নের চামী, ডুবি, গগন, উড়িবুনিয়া এবং সন্ধ্যানদীর তীরবর্তী কৌরিখাড়া,কামারকাঠি, জলাবাড়ি, রাজবাড়ি, নান্দুহারসহ বিভিন্ন গ্রামের বিস্তীর্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
 
চট্টগ্রাম অফিস: গতকাল বিকাল ৩টা পর্যন্ত বিগত চব্বিশ ঘন্টায় চট্টগ্রামে ৮৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। ব্যাপক বৃষ্টিপাতে চট্টগ্রামের ১৪টি উপজেলার অন্ততঃ ৯টি উপজেলায় আমন বীজতলা, আউশ ফসল, মত্স্য ঘের, শাক সবজি ও কাঁচা বাড়ি-ঘরের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
 
নোয়াখালী: জেলার ৯টি উপজেলার ৪ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছে। গত কয়েক দিনের বর্ষণে ডুবেগেছে আমন ফসলের বীজতলা, শাক সবজি ও ফসলি মাঠ। পানিতে ভেসে গেছে দুই সহস্রাধিক মত্স্য খামারের মাছ।
 
রায়পুর (লক্ষ্মীপুর) : গতকাল সকাল থেকে বিকাল ৬ টা পর্যন্ত ১২ ঘণ্টায় মেঘনা নদীতে ৩০ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে উপকূলীয় এলাকার বহু ফসলি জমি পানির নিছে ডুবে গেছে।  প্রায় ৫০ হাজার লোক পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
 
আশুগঞ্জ(ব্রাহ্মণবাড়িয়া): গত দুই দিন ধরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ আন্তর্জাতিক নৌবন্দর থেকে ৬ টি নৌরুটে সকল প্রকার নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে করে আশুগঞ্জ নৌবন্দরে আটকা পড়েছে ২ শতাধীক মালবাহী কার্গোজাহাজ। গতকালও দিনভর বৈরি আবহাওয়া ও টানা বর্ষণের কারণে নৌবন্দর থেকে কোন নৌযান ছেড়ে যায়নি। নৌবন্দরেরও অচলাবস্থা কাটেনি।
 
শিবালয় (মানিকগঞ্জ) : বিআইডব্লিউটিএ’র আরিচা সেক্টরের বিভিন্ন নৌরুটে ফেরি-লঞ্চ, কার্গো, নৌকা ইত্যাদি চলাচল বন্ধ রয়েছে। পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া, আরিচা-কাজিরহাট নৌরুটে গতকাল রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকে।  এছাড়া, এ রুটে যাত্রী ও যানবাহন পারাপরে ফেরি সার্ভিস একমাত্র বিকল্প মাধ্যম হলেও গতকাল বেলা পৌণে ১২টার দিকে বিআইডব্লিউটিসি’র কর্মকর্তারা ফেরি বন্ধের ঘোষনা দেন। 
 
কক্সবাজার: ঘূর্ণিঝড় কোমেন গেলেও আতংকে রয়েছে কক্সবাজারের উপকূলবাসী।  জেলায় ৪ শতাধিক বসতবাড়ী স্থতি স্থতিগ্রস্থ হয়েছে। প্রবল বাতাসে উপড়ে পড়েছে অসংখ্য গাছপালা। চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে উপকূলীয় এলাকার সড়ক উপসড়ক। জোয়ারের পানিতে ভেঙ্গে গেছে বেড়িবাঁধ। ভাঙ্গা বেড়ীবাধ দিয়ে জোয়ারের পানি ঢুকে উপকূলীয় এলাকার নিম্নাঞ্চল স্বাভাবিকের চেয়ে ৪/৫ ফুট বেশি উচ্চতায় প্লাবিত হয়েছে। এতে আতংকে রয়েছে উপকূলীয় এলাকার মানুষ।
 
চকরিয়া (কক্সবাজার): চকরিয়ায় ভারী বর্ষণ ও মাতামুহুরী নদীতে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারনে বন্যা পরিস্থিতি ফের চরম অবনতি ঘটেছে। শুক্রবার সারাদিন ও রাতভর বৃষ্টিপাত হওয়ার কারনে শনিবার সকালে উপজেলার বেশির ভাগ এলাকা তলিয়ে যায় বানের পানিতে।
 
দাকোপ (খুলনা) : উপজেলার সুতারখালী ইউনিয়নের একাধিক স্থানে বাঁধ ভেঙ্গে ব্যাপক এলাকা প্লাবিত হয়েছে। নলিয়ান বাজারের অর্ধশতাধিক দোকান পাট, ব্যাংক, তহশীল অফিস, ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়, ফরেষ্ট অফিসসহ গুরুত্বপূর্ন স্থাপনা বর্তমানে পানির নিচে তলিয়ে আছে।
 

চরফ্যাশন (ভোলা): নদনদীর পানি স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৪/৫ ফুট বৃদ্ধি পেয়ে নিম্মাঞ্চল তলিয়ে গেছে। গতকাল  দুপুরে স্কুল ছুটি শেষে বাড়ি ফেরার পথে উপজেলার চরপাতিলা শরীফ পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাত শিক্ষার্থী জোয়ারের পানিতে ভেসে যায়। পরে কুকরী-মুকরী ইউপি চেয়ারম্যান হাসেম মহাজনের সহায়তায় স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে চরকচ্ছপিয়া গণ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ভর্তি করেন। তারা হলো: প্রথম শ্রেনীর শিক্ষার্থী ফারজানা, সান্তা, সালমা, ইমা, দ্বিতীয় শ্রেনীর শিক্ষার্থী  সুমাইয়া, জাবেদ, লিমা। তাদের মধ্যে শান্তা ও সুমাইয়ার অবস্থা আশংকা জনক।