ব্যাংকে টাকা রাখলে যে পরিমাণ সুদ পাওয়া যায় তার চেয়ে বেশি পাওয়া যায় সঞ্চয়পত্রে খাটালে। এ ধারার কারণে গত অর্থবছরের পুরো সময়জুড়েই সঞ্চয়পত্র বিক্রি অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি হয়েছে, যা বছরের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি।
এতে বিক্রীত সঞ্চয়পত্রের সুদের অর্থ পরিশোধ করতে যেয়ে পরবর্তীতে সরকার বিপদে পড়বেন বলে অনেক বিশেষজ্ঞ আশঙ্কা প্রকাশ করেন। পরে বিক্রি কমাতে গত মে মাসে এসে সঞ্চয়পত্রে গড়ে প্রায় ২ শতাংশ সুদ কমিয়ে দেয় সরকার। তবে সরকারের সে উদ্যোগ খুব বেশি কাজে আসেনি। ফলে সঞ্চয়পত্রের বিক্রি থেমে থাকেনি।
চলতি ২০১৫-১৬ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইতে তিন হাজার ২৩৬ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই মাসের তুলনায় যা ৫০৯ কোটি টাকা বা প্রায় ১৯ শতাংশ বেশি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন—সঞ্চয়পত্রে সুদহার কমানোর পরও এখনও তা ব্যাংকের তুলনায় অনেক বেশি রয়েছে। গত জুনে ব্যাংকগুলো গড়ে ৬ দশমিক ৮০ শতাংশ সুদে আমানত নিয়েছে।
এখন ব্যাংকে মেয়াদি আমানতে টাকা খাটিয়ে সুদ পাওয়া যাচ্ছে ৮ থেকে ৯ শতাংশ। গত ২৩ মে সুদহার কমানোর পরও সঞ্চয়পত্রে এখনও সুদ পাওয়া যাচ্ছে ১১ শতাংশ বা এর বেশি। ফলে সঞ্চয়কারীরা ব্যাংকে টাকা না রেখে সঞ্চয়পত্র কিনে রাখছেন।
সঞ্চয় পরিদফতর সূত্রে জানা গেছে—চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে আগে কেনা সঞ্চয়পত্রের এক হাজার ২৬০ কোটি টাকার মূল্য পরিশোধ বাদ দিয়ে নিট বিক্রি দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৯৭৬ কোটি টাকা। আগের বছরের জুলাইতে ৮৭০ কোটি টাকার মূল্য পরিশোধ বাদ দিয়ে নিট বিক্রি দাঁড়িয়েছিল এক হাজার ৮৫৮ কোটি টাকা।
বরাবরের মতো এবারও সর্বোচ্চ ৮৮৯ কোটি টাকার পরিবার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪৫১ কোটি টাকা বিক্রি হয়েছে তিন মাস অন্তর মুনাফা ভিত্তিক সঞ্চয়পত্র। আর তৃতীয় সর্বোচ্চ ২৪১ কোটি টাকা বিক্রি হয়েছে পোস্ট অফিস সেভিংস ব্যাংক মেয়াদি সঞ্চয়পত্র।
২০১৪-১৫ অর্থবছর প্রথমে সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে নিট ৯ হাজার ৫৬ কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল সরকার। সংশোধিত বাজেটে লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ২১ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়। তবে অর্থবছর শেষে মোট বিক্রির পরিমাণ দাঁড়ায় ৪২ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৯২৭ কোটি টাকা আসল পরিশোধ বাদ দিয়ে নিট বিক্রি দাঁড়ায় ২৮ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকা। অর্থাত্, সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ৭ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকা বেশি বিক্রি হয়। আর মূলবাজেটে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বিক্রি বেশি হয়েছে তিনগুণ।
বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার বিদেশি উেসর পাশাপাশি দেশীয় উত্স থেকে ঋণের একটি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। ব্যাংক থেকে ঋণ না নিয়ে সঞ্চয়পত্র থেকে নেয়ার ফলে সরকারের সুদ ব্যয় বাড়ছে।
গত জুলাইতে ব্যাংক থেকে ৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ সুদে পাঁচ বছর মেয়াদি ঋণ নিয়েছে সরকার। আগের বছরের জুলাই মাসে যা ৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ ছিল। আর তার আগের বছরের জুলাই মাসে ছিল ১১ দশমিক ৭১ শতাংশ।
একইভাবে অন্য সব মেয়াদের ঋণের সুদহারও অনেক কমেছে। জুলাই মাসে ৬ দশমিক ৬২ শতাংশ সুদে এক বছর মেয়াদি ঋণ নিয়েছে সরকার। আর ১০ বছর মেয়াদি ঋণ নিতে সরকারকে দিতে হয়েছে ৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
এ দিকে, ২০১৪-১৫ অর্থবছর ব্যাংক থেকে সরকার ৩১ হাজার ২২১ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছিল। চলতি অর্থবছর লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩৮ হাজার ৫২৩ কোটি টাকা। তবে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে বেশি অর্থ আসায় গত অর্থবছরের শুরু থেকেই ব্যাংক খাতে সরকারের ঋণ নেয়ার চাহিদা ছিল কম। বরং ব্যাংক থেকে সরকার যে পরিমাণ ঋণ নিয়েছে পরিশোধ করেছে তার তুলনায় বেশি।
গত অর্থবছর ব্যাংকে সরকারের নিট ঋণ ৬ হাজার ৮৭০ কোটি টাকা কমে এক লাখ ৭ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকায় নেমে আসে। আর চলতি অর্থবছরের শুরুতে সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিলেও এখন তার মাত্রা অনেকটা কমে আসছে।
