দুই বিদেশি নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ প্রশাসন নড়েচড়ে উঠেছে। জেলায় কতজন বিদেশি নাগরিক অবস্থান করছেন তা জেলা গোয়েন্দা শাখায় থাকার নিয়ম থাকলেও গত দুই দশক যাবত্ এই আইনটি না মানার ফলে নারায়ণগঞ্জে কতজন বিদেশি নাগরিক কর্মরত কিংবা অবস্থান করছে এ নিয়ে বিপাকে পড়েছে জেলা পুলিশ প্রশাসন।
ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার মহিবুল ইসলাম খান স্বীকার করেছেন, দীর্ঘদিন যাবত্ ব্যবসায়ীরা এই আইনটি না মানার ফলে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তারমতে, নারায়ণগঞ্জে বর্তমানে ৬ শতাধিক বিদেশি নাগরিক অবস্থান করছে। ভিন্ন সূত্র জানায়, এ সংখ্যা আরো বেশি। কারণ অনেক বিদেশির বাংলাদেশে অবস্থানের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও তা নবায়ন না করায় অধিকাংশ মিল-কারখানায় কর্মরত এই ধরনের বিদেশি নাগরিকদের নাম-ঠিকানা গোপন রাখা হচ্ছে। আবার অনেক ভারতীয় নাগরিক ওয়ার্ক পারমিট ছাড়াই ভ্রমণ ভিসা নিয়ে বছরের পর বছর বিভিন্ন মিল-কারখানায় কাজ করছে। ফলে সঠিক সংখ্যা নির্ণয়ে পুলিশকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ইতোমধ্যে পুলিশ ৬৫৪ জনকে গত এক সপ্তাহে চিহ্নিত করেছে এবং এই সংখ্যা আরো বাড়বে বলে ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপারের ধারণা। তিনি জানান, ইতোমধ্যেই ২৩টি রাষ্ট্রীয় স্থাপনাসহ আদালত, জেলখানা, গার্মেন্টস শিল্প এলাকা ও যেসব মিল-কারখানায় বিদেশিরা কর্মরত সেখানে ‘রেড এলার্ড’ জারি করে পুলিশকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জে নিট গার্মেন্টস পল্লী অবস্থিত। এই সকল গার্মেন্টস শিল্পে শতাধিক বিদেশি নাগরিক কর্মরত। এছাড়া স্পিনিং মিলসহ বিভিন্ন মিল-কারখানায় অনেক বিদেশি নাগরিক কর্মরত রয়েছে। গত সপ্তাহে বায়ার্স ফোরামের সভাটি বাতিল হওয়ার পর গার্মেন্টস শিল্পে অচল অবস্থা দেখা দিয়েছে। কারণ গার্মেন্টস মালিকদের বক্তব্য, অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে বিদেশি ক্রেতারা মূলত বাংলাদেশে এসে এক বছরের কাজের অর্ডার দিয়ে যায়। বিদেশি নাগরিক হত্যার অজুহাতে তারা এখন বাংলাদেশে আসতে চাচ্ছেন না। ফলে গার্মেন্টস শিল্পে নতুন করে অশনি সংকেত দেখা দিয়েছে। সহস াধিক গার্মেন্টসের মধ্যে ৫ শতাধিক গার্মেন্টস মালিক হতাশ। অনেকের আশঙ্কা, বায়ার্স ফোরামের সভাটি বাতিল হওয়ার পর অনেক অর্ডার বাতিল হতে পারে। এই সভাটি বাতিল হওয়ায় অধিকাংশ গার্মেন্টস মালিক এই ঘটনাকে গার্মেন্টস শিল্পের জন্য অশনি সংকেত বলে মন্তব্য করেছেন। বিকেএমইএ’র সাবেক প্রথম সহ-সভাপতি মো. হাতেম এই সভা বাতিলের কারণে গার্মেন্টস শিল্পে ৭ হাজার কোটি টাকা লোকসানের আশঙ্কা করেছেন। তবে বিকেএমইএ’র সভাপতি একেএম সেলিম ওসমান এমপি মো.হাতেমের আশঙ্কাকে উড়িয়ে দিয়ে বলেন, বর্তমান অবস্থা সাময়িক। তবে গার্মেন্টস শিল্প অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে পড়েছে এ কথা সত্যি। তিনি বলেন, একটি মহল দেশকে অস্থিতিশীল করার অপপ্রচার চালাচ্ছে।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী জেলার সর্বত্র কঠোর নজরদারি শুরু করেছে। মহাসড়ক থেকে শুরু করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি র্যাবের তত্পরতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। অবৈধভাবে যেসব বিদেশি বিভিন্ন মিল-কারখানায় অবস্থান করছে জেলা গোয়েন্দা সংস্থা তাদের চিহ্নিত করার কাজ শুরু করেছে। সকল শিল্প প্রতিষ্ঠানকে তাদের প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের তালিকা পুলিশ প্রশাসনকে দেয়ার অনুরোধ জানান হয়েছে। বিদ্যুেকন্দ্র, খাদ্যগুদাম (সাইলো), তেলের ডিপোসহ ২৩টি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা জোরদারের তাগিদ দিয়েছেন জেলা প্রশাসন। নারায়ণগঞ্জের পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ডিপো থেকে বিমানের জন্য এবং দেশের বিভিন্নস্থানে তেল পরিবহনের ক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নিরাপত্তা প্রদান করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসক আনিছুর রহমান মিঞা জানান, নারায়ণগঞ্জ শিল্পাঞ্চল বিধায় এখানে অনেক বিদেশি নাগরিক কর্মরত। তারপরও আমরা প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি।
