দাতা সংস্থার সুপারিশ ও অর্থায়নে নির্মিত পানগাঁও অভ্যন্তরীণ কনটেইনার টার্মিনাল (আইসিটি) আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়েছে দুই বছরেরও বেশি সময় আগে। কিন্তু আজ পর্যন্ত এ টার্মিনাল তথা বন্দর দিয়ে এক টন পণ্যও রপ্তানি হয়নি। গুরুত্বপূর্ণ এ বন্দর পুরোদমে কবে চালু হবে তা নিয়ে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। নৌ-পরিবহন মন্ত্রী মো. শাজাহান খান এমপি বলেছেন, নানা প্রতিবন্ধকতায় পানগাঁও কনটেইনার টার্মিনাল চালু করা যাচ্ছে না। তবে শিগগিরই প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
টার্মিনাল পুরোদমে চালু না হওয়ায় সরকার বঞ্চিত হচ্ছে বিপুল পরিমাণ শুল্ক থেকে। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, জনবল ও যন্ত্রপাতি থাকা সত্ত্বেও কনটেইনার টার্মিনাল সচল না হওয়ার নেপথ্যে কনটেইনার পরিবহনে নিরাপত্তাহীনতা, জাহাজ সংকটসহ ৮টি কারণ চিহ্নিত করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নৌ মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দিয়েছে তারা। তবে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, কনটেইনার টার্মিনাল নিয়ে ব্যবসায়ীদের আগ্রহ সত্ত্বেও এটি ব্যবহার উপযোগী করতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক)। এ ছাড়া চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর কেন্দ্রিক বাণিজ্য বন্ধের আশঙ্কায় একটি স্বার্থান্বেষী মহল পানগাঁও আইসিটি চালুতে নানাভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। রাজনৈতিক প্রভাবে লাইসেন্স নিয়ে সরকার দলীয় ব্যবসায়ীরা এখনও চট্টগ্রাম-পানগাঁও রুটে জাহাজ নামাননি।
অপরদিকে বেসরকারি খাতের আইসিটি শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে। ফলে জমির মূল্যসহ প্রায় ৭০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে গড়ে ওঠা পানগাঁও আইসিটি প্রতিযোগিতায় আদৌ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে কিনা তা নিয়ে সন্দিহান খোদ নৌ মন্ত্রণালয় ও চবকের একাধিক কর্মকর্তা। নৌ মন্ত্রণালয় ও চট্টগ্রাম বন্দর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নৌ মন্ত্রণালয়ের সচিব শফিক আলম মেহেদী ইত্তেফাককে বলেন, পানগাঁও আইসিটি পুরোপুরি সচল করতে সব ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এর বেশি মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।
সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর থেকে পণ্যবাহী কনটেইনার কম খরচে নৌপথে ঢাকা পর্যন্ত নিয়ে আসার লক্ষ্যে রাজধানীর অদূরে কেরানীগঞ্জের পানগাঁওয়ে ওই আইসিটি নির্মাণ করা হয়। ২০১৩ সালের ৭ নভেম্বর এটি উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এনবিআরের চিহ্নিত ৮ কারণ :পানগাঁও কাস্টম হাউস এবং শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের দুই প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে টার্মিনালটি সচল না হওয়ার পেছনে যে আটটি কারণ এনবিআর চিহ্নিত করেছে সেগুলো হলো- শিপিং এজেন্টদের আন্তরিকতার অভাব অর্থাত্ সময়মতো আমদানিকারকদের কনটেইনার হস্তান্তর না করা, কনটেইনার (পণ্যবাহী ও খালি) ভাড়া পুনঃনির্ধারণ না করা, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পানগাঁও পর্যন্ত কনটেইনার পরিবহনে নিরাপত্তার অভাব, সীমিত ও অপর্যাপ্ত সংখ্যক কনটেইনার নিয়ে জাহাজগুলো পানগাঁও বন্দরে আসতে অনীহা, পানগাঁওয়ে আসা খালি কনটেইনার ফেরত পাঠাতে খরচ বেশি হওয়া, জাহাজ ভাড়া না কমানো এবং বেসরকারি মালিকানাধীন জাহাজ চলাচল না করা, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পানগাঁও পর্যন্ত নৌপথের নাব্য সমস্যা এবং বিভিন্ন এজেন্ট সিঅ্যান্ডএফ, শিপিং, ফ্রেইট ফরোয়ার্ডারদের অফিস ও বসার ব্যবস্থা না থাকা।
নৌ মন্ত্রণালয় কর্তৃক চিহ্নিত প্রতিবন্ধকতা: নৌ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, রাজস্ব বোর্ডের চিহ্নিত সমস্যার পাশাপাশি আরও কিছু প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করেছে নৌ মন্ত্রণালয়। সেগুলো হচ্ছে ব্যবসায়ীদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য আনা-নেয়ায় সিডিউল রক্ষা না করা, নতুন ধরনের কার্যক্রম হওয়ায় কনটেইনার শিপিং এজেন্ট ও মেইন লাইন অপারেটরদের সিঙ্গাপুর, কলম্বো ও তানজুং সমুদ্র বন্দর থেকে পণ্য এলসিতে পানগাঁও আইসিটির নামে বুকিং দিতে অনাগ্রহ এবং সড়কপথে দ্রুত পণ্য পরিবহন সুবিধা।
সূত্র আরও জানায়, পানগাঁও আইসিটি সচল না হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ কনটেইনারবাহী জাহাজের সংকট। চট্টগ্রাম-পানগাঁও রুটে পণ্য পরিবহনের জন্য সরকারি ৬টি ও বেসরকারি খাতে ৩২টি মোট ৩৮টি জাহাজের অনুমোদন দেয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, বেসরকারি খাতের বেশিরভাগ জাহাজই রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন দেয়া হয়। ইতিমধ্যে চবক ৩টি পুরনো জাহাজ সংগ্রহ করলেও এসবের মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বাকিদের জাহাজ এখনও বহরে যুক্ত হয়নি। আগামী নভেম্বরের মধ্যে নৌবাহিনীর দুটি ও বেসরকারি খাতের ৪টি জাহাজ ওই রুটে চলাচলের উপযোগী হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পানগাঁও আইসিটি নিয়ে সমপ্রতি নৌ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিজেএমইএ ও বিকেএমইএর নেতারা জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের মোট পরিমাণের প্রায় ৭০ শতাংশই গার্মেন্ট শিল্পের কাঁচামাল ও উত্পাদিত পণ্য। তারা প্রথম থেকেই পানগাঁও আইসিটি ব্যবহারে আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু কনটেইনার নৌযানের স্বল্পতা ও নির্দিষ্ট সিডিউল রক্ষা করতে না পারা এবং চীন ও সিঙ্গাপুরসহ গুরুত্বপূর্ণ বন্দর থেকে পানগাঁও আইসিটির নামে বুকিংয়ের ক্ষেত্রে প্রতি টিউস কনটেইনারে চট্টগ্রাম ও কমলাপুর আইসিটির চেয়ে প্রায় ৫০০ মার্কিন ডলার বেশি ভাড়া হওয়ায় তারা পানগাঁও আইসিটি ব্যবহার করছেন না। তারা ভাড়া কমানোসহ অন্যান্য সমস্যা সমাধান ও ব্যবসায়ীদের প্রণোদনা দেয়ারও দাবি জানান।