আড়াই বছরে দশজন ব্লগার খুন হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা মামলাগুলোর একটিরও বিচার কাজ শেষ হয়নি। এদের মধ্যে আহমেদ রাজীব হায়দার শোভন হত্যা মামলাটি আদালতে বিচারাধীন। ওয়াশিকুর রহমান বাবু হত্যা মামলায় পাঁচ জনকে আসামি করে আদালতে চার্জশিট দিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। খিলগাঁওয়ে ব্লগার নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় হত্যা মামলায় ডিবি দাবি করেছে চার জনকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে হত্যা সংশ্লিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলেও এখন পর্যন্ত তারা আদালতে এ সংক্রান্ত স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়নি। লেখক ও ব্লগার অভিজিত্ রায় ও সর্বশেষ প্রকাশক ফয়সাল আরেফীন দীপন হত্যাসহ ৭ ব্লগার হত্যা মামলার তদন্ত চলছে। এই সাত মামলায় হত্যার সঙ্গে সরাসরি জড়িত এমন কেউ এখন পর্যন্ত গ্রেফতার হয়নি। মামলাগুলোর তদন্তেও তেমন কোন অগ্রগতি নেই।
মামলা তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, উগ্র ধর্মীয় জঙ্গি গোষ্ঠী স্লিপার সেল গঠন করে এ ধরনের হত্যার ঘটনা ঘটাচ্ছে। স্লিপার সেলের একজন সদস্যের সঙ্গে অন্য সদস্যের কোনো পরিচয় থাকে না। এমনকি কিলিং মিশনে অংশ নেয়ার আগ পর্যন্ত স্লিপার সেলের সদস্যরা একে অপরের কাছে অচেনা থাকে। এ কারণে একজন সদস্য অপর সদস্যের ব্যাপারে বিস্তারিত কোন তথ্যই জানে না। এ কারণে একটি হত্যায় সরাসরি অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে অপর হত্যার কোন সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাচ্ছে না।
২০১৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সাভারের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পেছনে আমবাগান গ্রামের ভাড়া করা মেসে গলা কেটে হত্যা করা হয় ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আশরাফুল আলম সুজনকে। সুজন একজন ব্লগার ছিলেন। বিভিন্ন সময়ে ব্লগে ধর্মীয় বিষয়ে লেখালেখির কারণে প্রতিপক্ষরা আগে থেকেই তাকে সতর্ক করে দিয়েছিল। হত্যাকাণ্ডের পর ‘আনসার আল ইসলাম বাংলাদেশ’ নামে একটি সংগঠনের ফেসবুক পেজে নিহত আশরাফুলকে নাস্তিক, মুরতাদ বলে আখ্যা দেয়া হয়। আশরাফুল হত্যাকাণ্ডের রহস্য এখনও উদঘাটিত হয়নি। এ ব্যাপারে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আশুলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) দীপক চন্দ্র সাহা বলেন, এ মামলার তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে যে, উগ্র ধর্মীয় জঙ্গি গোষ্ঠী এ হত্যার সঙ্গে জড়িত। তবে এখন পর্যন্ত এ হত্যায় কাউকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।
২০১৩ সালের ৯ ডিসেম্বর রাতে বগুড়ায় জেলা সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের যুগ্ম-সম্পাদক ও ব্লগার জিয়াউদ্দিন জাকারিয়া বাবুকে বগুড়া এক নম্বর রেলগেটের কাছে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। তিনি বগুড়া গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী ছিলেন। এ হত্যার ঘটনায় তার ছোট ভাই শামসুদ্দিন সাজু বাদী হয়ে বগুড়া সদর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। প্রাথমিকভাবে পুলিশ ধারণা করছিল সম্পদ ভাগ-বাঁটোয়ারাকে কেন্দ্র করে বাবুকে খুন করা হতে পারে। মামলাটি বগুড়া সদর থানা থেকে বগুড়া ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়। ডিবি পুলিশ তথ্য পায় যে, গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী হওয়ার কারণে এবং ব্লগে লেখালেখির কারণে বাবুকে উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদী একটি চক্র খুন করেছে। এ ব্যাপারে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই খোকন বলেন, ‘আমরা ধারণা করছি এ হত্যার সঙ্গে উগ্র ধর্মীয় একটি জঙ্গি গোষ্ঠী জড়িত, তবে এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করা যায়নি।
২০১৩ সালের ৯ এপ্রিল দিন-দুপুরে বুয়েটের ছাত্রলীগ নেতা ও যন্ত্রকৌশল বিভাগের তৃতীয় বর্ষের আবাসিক ছাত্র ব্লগার আরিফ রায়হান দ্বীপকে নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। পরে হত্যাকারী বুয়েট ছাত্র মেজবাহ উদ্দিন গ্রেফতার হয়। মেজবাহ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানান, দ্বীপকে হত্যার মাধ্যমে তিনি ঈমানী দায়িত্ব পালন করেছেন। এই হত্যার জন্য তিনি অনুতপ্ত নন। আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের আধ্যাত্মিক নেতা মুফতি জসীমুদ্দীন রাহমানীর বয়ানে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি দ্বীপকে হত্যা করেছেন। মামলাটির এখনও চার্জশিট দেয়া হয়নি।
গত ১২ মে সিলেটে ব্লগার অনন্ত বিজয়কে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এই মামলায় মান্নান রাহী, মোহাইমীন নোমান, স্থানীয় সাংবাদিক ইদ্রিসসহ চারজনকে গ্রেফতার করা হয়। পরে ইদ্রিস জামিনে মুক্তি পান। এ হত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার তথ্য জানিয়ে মান্নান রাহী আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি অমর একুশে বই মেলা থেকে বাসায় ফেরার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিত্ রায়কে (৪০) একই কায়দায় দুইজন কুপিয়ে হত্যা করে। হত্যাকারীদের ছুরিকাঘাতে আহত হন তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা (৩০)। বন্যার বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি খুনিদের চাপাতির কোপে কেটে পড়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হওয়ায় সেদেশটির কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার (এফবিআই) একটি দল ঘটনা তদন্তে বাংলাদেশে এসে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশকে সহায়তা করে। এখন পর্যন্ত এ হত্যার তদন্ত ফল ‘শূন্য’।
২০১৩ সালের ১৪ জানুয়ারি উত্তরায় ব্লগার আসিফ মহিউদ্দিনের ওপর হামলা চালানো হয়। শরীরে শীতের পোশাক থাকায় তিনি প্রাণে বেঁচে যান। ঐ ঘটনায় পুলিশ একজন প্রতিমন্ত্রীর ভাতিজা সাদ আল নাহিয়ান ও মাসুদ রানাসহ চারজনকে গ্রেফতার করে। পরে তাদের খিলগাঁওয়ে ব্লগার নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। গত ৭ আগস্ট খিলগাঁওয়ের উত্তর গোড়ানের ৮ নম্বর রোডের ১৬৭ নম্বর বাসার পঞ্চম তলার ফ্ল্যাটে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা নীলাদ্রিকে কুপিয়ে হত্যা নিশ্চিত করে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার তত্ত্বাবধায়ক কর্মকর্তা ডিবির সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ ইকবাল বলেন, নীলাদ্রি হত্যা ঘটনায় গ্রেফতারকৃত চার জনকে বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে তাদের এ হত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার তথ্য মিলেছে। তবে এ হত্যার সঙ্গে সরাসরি জড়িতদের এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি।
২০১৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন চলাকালীন জামায়াত-শিবির কর্মীরা মতিঝিলে অগ্রণী ব্যাংকের কর্মচারী ও ব্লগার জাফর মুন্সিকে পিটিয়ে হত্যা করে। ঐ সময় মতিঝিল থানায় দায়ের করা মামলাটি এখন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ তদন্ত করছে। এ মামলায় হামলাকারী হিসাবে বেশ কয়েকজন জামায়াত-শিবির কর্মীকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত মামলাটির চার্জশিট দেয়া হয়নি বলে ডিবি সূত্রে জানা গেছে।