মনে হয়, এই তো সেদিন বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টে টস করতে নামলেন নাঈমুর রহমান দুর্জয়। অথচ দেখতে দেখতে পার হয়ে যাচ্ছে ১৫টি বছর, দেড় দশক। ২০০০ সালে টেস্ট খেলা শুরু করা বাংলাদেশ দেড় দশক পার করে ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে আছে? বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট, টেস্ট ক্রিকেটে পথচলা এবং টেস্ট সংস্কৃতি নিয়ে বিস্তারিত কথা বললেন প্রথম টেস্ট অধিনায়ক ও বর্তমান বোর্ডের ক্রিকেট অপারেশন্স কমিটির প্রধান নাঈমুর রহমান। সাবেক অলরাউন্ডার, বর্তমান সংসদ সদস্যের এই কথোপকথনে ছিলেন দেবব্রত মুখোপাধ্যায়—
টেস্ট ক্রিকেটে ১৫ বছর
প্রথম টেস্টের সেই অনুভূতির কথা তো শতবার বলেছেন। দেড় দশক পর ঠিক কী মনে পড়ে?
অভিষেক টেস্টে যে ক্যাপ্টেন থাকবো, এটা তো আসলে আগে থেকে ভাবিনি। তবে বিশ্বকাপের (১৯৯৯) পর থেকে ভাবনা শুরু হয়। যেহেতু প্রথম টেস্ট, টসটাই সবচেয়ে স্মরণীয়। তারপরে কী ঘটবে, তা তো জানতাম না। তবে টসটা করতে পারবো, এইটুকু গ্যারান্টি ছিলো। ফলে সেটা নিয়েই বেশি উত্তেজিত ছিলাম।
টস ছাড়া বিশেষ কিছু বেছে নিতে বললে...
প্রত্যেকটা ব্যাপারই স্পেশাল ছিলো। প্রধানমন্ত্রী মাঠে এসে উদ্বোধন করলেন। মনে আছে, আমাদের স্পোর্টস মিনিস্টার আমাদের আগে গেটে এসে দাঁড়িয়ে আছেন। আসলে সবার কাছেই, আমাদের মতো সারা দেশের কাছেই কিন্তু স্পেশাল ছিলো।
IMG0
ক্যারিয়ারের শুরুতে কখনো ভাবতে পেরেছিলেন, একদিন টেস্ট ম্যাচের টস করতে নামবেন?
না। আমরা আসলে চিন্তাও করিনি যে, কোনো দিন টেস্ট খেলবো। আইসিসি ট্রফি জেতার পর থেকে একটু গতি বাড়লো। তখন টার্গেটগুলো বড় হতে শুরু করলো।
পনেরো বছর পর টেস্ট খেলুড়ে দেশ হিসাবে বাংলাদেশকে কোথায় দেখছেন?
একটা টেস্ট খেলুড়ে দেশের যে একটা কালচার থাকে, সেটা আমরা এখনো তৈরি করতে পারিনি। রেজাল্টের দিক দিয়ে, বিশেষ করে আমরা যদি ওয়ানডের ফলাফল বিবেচনা করি, সে ক্ষেত্রে আমি বলবো, অন্য অনেক দেশের চেয়ে আমরা অনেক দ্রুতগতিতে এগিয়েছি। কিন্তু টেস্ট বা লংগার ভার্সনে সেরকম বিশেষ উন্নতি আমি দেখি না। আমরা কিছু টেস্টে হয়তো ভালো রেজাল্ট করেছি। তবে আরও কোর জায়গাগুলোতে আমাদের আরও উন্নতি করা দরকার। কারণ আমি বিশ্বাস করি, যারা লংগার ভার্সনে ভালো খেলবে, তারা সব ফরম্যাটে ভালো খেলবে। কিন্তু আমরা এখন শুধু টি-টোয়েন্টি বা ওয়ানডে, বিশেষ করে ওয়ানডের রেজাল্টের ওপর ভিত্তি করে একটু সন্তুষ্ট হতে চাই। যেটা লংগার পিরিয়ডের জন্য স্বাস্থ্যকর না। আমরা যদি লম্বা সময় চিন্তা করি, তাহলে আমাদের লংগার ভার্সন বা টেস্ট ক্রিকেটের প্রতি আরো নজর দিতে হবে।
টেস্ট সংস্কৃতির কথা বলছিলেন। সেটাতে উন্নতি করতে গেলে আসলে কী করতে হবে?
একটা সমৃদ্ধ টেস্ট খেলুড়ে দেশে আপনি দেখতে পাবেন, ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটকে যেভাবে মূল্যায়ন করা হয়, ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটারকে যেভাবে মূল্যায়ন করা হয়, সেই জায়গায় আমরা যেতে পারিনি। হয়তো আমরা এখনো ওই মানের না। কারণ আমরা যাদের সাথে টেস্ট খেলি, তারা আমাদের চেয়ে অনেক বছর বা কয়েক যুগ এগিয়ে। তবে আমাদের ওই জায়গায় যাওয়ার টার্গেটটা তো থাকতে হবে।
সময়ের স্রোতে প্রথম টেস্টের অধিনায়ক থেকে আপনি এখন ক্রিকেট অপারেশন্সের চেয়ারম্যান। আপনার জায়গা থেকে এ জন্য যা যা করা দরকার...
আমাদের সুপারিশগুলো কিন্তু সবসময় থাকে। যেমন ধরুন জিম্বাবুয়ের সঙ্গে আমরা বেশি টেস্ট খেলতে চাই। আমরা বলি যে, আমাদের টেস্ট খেলার সংখ্যা বাড়ানো হোক। এদিকে জিম্বাবুয়ে ছাড়া আর কেউ কিন্তু দুই টেস্টের বেশি দিচ্ছে না। সেখানে আমরাই আবার (জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে) টেস্টের সংখ্যা কমিয়ে ফেলছি। এগুলো সাংঘর্ষিক। আমি মনে করি, এগুলো করা উচিত হয়নি।
উন্নতিটা তো প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ও প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট কাঠামোতে হওয়া অতি জরুরি?
ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটের কথাই আমি মিন করি। কারণ টেস্ট ক্রিকেট তো শুধু ন্যাশনাল টিমকে ঘিরে। ন্যাশনাল টিমকে এরপর যারা সাপোর্ট দেবে, তারা তো আসবে আমার ডমেস্টিক ক্রিকেট থেকে। ওইখানটাতেই আমাদের উন্নতি হয়নি। যেমন ধরেন, আমরা বলি, ডিফারেন্ট ভেন্যুতে আমরা ডিফারেন্ট উইকেট চাই। আমাদের ঘরোয়া ক্রিকেট যে ধরনের উইকেটে খেলা হয় তাতে বাইরে গিয়ে স্ট্রাগল করার কথা তো বলাই হয়। আর এই ধরনের উইকেটে খুব অর্ডিনারি টেকনিক নিয়ে খেলা সম্ভব। কিন্তু টেস্ট ক্রিকেট খেলতে গেলে আপনাকে টেকনিক্যালি আরও ভালো হতে হবে।
এই যে স্পোর্টিং উইকেট, এটা তো আমরা গত বছর দশেক ধরে শুনছি...
পনেরো বছরেরও বেশি সময় ধরে শুনছেন।
তাহলে কেন হয় না?
হয় না, কারণ গ্রাউন্ডসটাকে আমরা কখনো টেকনিক্যাল একটা কমিটি হিসাবে ভাবি না। এখানে আমরা কখনোই কোনো টেকনিক্যাল লোক পাইনি, যারা উইকেট বুঝবে, কোনো উইকেটে কী ধরনের ফল হবে, এটা বুঝবে। তারা ক্রিকেট অপারেশন্স, টিম ম্যানেজমেন্টের সাথে আলাপ করে নিজেরা সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। পাশাপাশি কিউরেটরদের উন্নতি করতে হবে। উইকেট বানালেই হবে না, রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে।
প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটকে কার্যকর করার জন্য বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সুপারিশ আছে দীর্ঘকাল ধরে।
অবশ্যই। এই বোর্ডও কাজ করছে। আমি চাই যে, এটা খুব তাড়াতাড়ি আলোর মুখ দেখুক। কারণ, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটকে যদি জোরদার করতে চাই, জাতীয় দলের যে ফ্যাসিলিটিজ, প্রতিটা বিভাগীয় দলের সেই ফ্যাসিলিটিস থাকা উচিত। একটা স্ট্রাকচার থাকতে হবে তাদের, একটা সেটআপ থাকতে হবে—কোচিং স্ট্যাফ, সাপোর্ট স্ট্যাফ। স্বাধীনভাবেই প্রতিটা দলের থাকতে হবে।
এই যে আপনারা চাহিদা দেন, শেষ পর্যন্ত ওরকম উইকেট কী পেয়েছেন এ বছরও?
না। যতোগুলো ম্যাচ রেফারি বা খেলোয়াড়দের সঙ্গে কথা বলেছি, তাতে বলা যায় হয়নি। টিমের ফরম্যাশেন দেখলেও বোঝা যায় কী হচ্ছে। সেই ব্যাটসম্যানরা প্রচুর রান করছে... এই ধরনের উইকেটের মেইনটেন্যান্স সোজা।
প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটারদের ম্যাচ ফি কী এই ক্রিকেটের সাথে মানানসই?
এখন অন্তত যেটা দেয়া হচ্ছে, সেটা পাচ্ছে। আগের কথা বলতে পারি, তখন বোর্ড থেকে যেটা দেয়া হতো, সেটাও পাওয়া যেতো না। এখনো অংকটা অনেক কম। বাড়ুক, চাই। তবে কিছু পাচ্ছে। পাশাপাশি অনেক খেলোয়াড়কে স্যালারি স্ট্রাকচারে আনা হয়েছে।
টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশ
ম্যাচ ৯৩
জয় ৭
পরাজয় ৭১
ড্র ১৫
