সন্তানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই ‘সময় শেষ’

আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০১৬, ০১:১৩
দুইটা রুটি, একটা ডিম আর পলিথিনে করে মুড়ি। এই নিয়ে ছেলেকে দেখতে এসছেন এক মা। অনেকের সঙ্গে অপেক্ষা করছেন তিনি। একটু পরে কয়েকজন কিশোরকে নিয়ে আসা হলো। এবার সন্তানকে দেখেই মায়ের চোখে পানি। দেখা হওয়ামাত্রই ছেলেকে পাশে বসিয়ে খাবার বের করে খাওয়াতে শুরু করলেন নিজ হাতে। এতদিন পর মায়ের হাতের খাবার আর আদর পেয়ে ছেলেরও চোখের পানি বাধা মানল না।
 
গাজীপুর কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে গিয়ে এমন দৃশ্য চোখে পড়ে। এটিকে শিশু-কিশোরদের কারাগারও বলা হয়। ছেলের সঙ্গে থাকার জন্য সময় বরাদ্দ মাত্র ২০ মিনিট। তবে এই অল্প সময় নিয়ে অভিভাবকদের অভিযোগ রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে কী খাওয়াবেন, আর কী বা খোঁজ নেবেন? সন্তানের মাথায় একটুখানি হাত বুলাতেই যেন সময় শেষ!
 
এক মাস পর ছেলে ইমরানকে দেখতে এসেছেন বাবা ইসমাইল হোসেন। নিজেও জানেন, সকাল ১০টার আগে সাক্ষাতের দরজা খুলবে না। তবুও প্রায় পৌনে দুই ঘণ্টা আগে এসে কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের দরজার সামনে বসে অপেক্ষা করছেন। এসেছেন ঢাকার মোহাম্মদপুর থেকে। অপেক্ষার পর ছেলের সঙ্গে দেখা হওয়া মাত্রই মোবাইল ফোনে মায়ের সঙ্গে কথা বলিয়ে দিলেন।
 
‘আমি ভালো আছি মা। তুমি কেমন আছ? আমি ভালো আছি, আমার কোনো সমস্যা নেই, তুমি কাইন্দো না মা।’ কথাগুলো বলতে বলতে নিজেও চোখ মুছল ইমরান। পাশে বসে বাবা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে ছেলেকে বললেন, ‘খাওয়া শেষ করো বাবা’। তোমার সময় শেষ হচ্ছে। একটু পর বাবাই ছেলেকে নিতে আসা নিরাপত্তা প্রহরীর কাছে দুই মিনিট সময় চেয়ে নিলেন ছেলের খাবার শেষ করার জন্য।
 
সাক্ষাত্ শেষে একে একে কিশোরদের তল্লাশি করা হলো। বাইরে থেকে কিশোরদের কিছু ভেতরে নেয়ার অনুমতি নেই। তল্লাশি শেষ। আবাসিক হোস্টেলে ফিরছে তারা। পেছন থেকে আঁচলের আড়ালে চোখ মুছে বিদায় দিয়ে বাড়ি ফেরেন মানিকগঞ্জ থেকে আসা সবুজের মা।
 
নিজেদের থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে চার মাস আগে আসা এক কিশোর বলেন, আমাদের থাকা-খাওয়ার খুব বেশি সমস্যা হয় না। শুধু আব্বা-আম্মার জন্য মন খারাপ হয়। আমার ঘরের সঙ্গীর সঙ্গে আমার খুব মিল হয়েছে। আমরা গল্প করেই সময় কাটাই।
 
জানা যায়, গাজীপুর কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের আসন সংখ্যা ২০০। বর্তমানে ৩৫৪ জন কিশোর রয়েছে। কিশোরদের পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার সুযোগ আছে। যারা পড়াশোনা করে না তাদের জন্য বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা রয়েছে। বর্তমানে স্কুলপড়ুয়া কিশোরের সংখ্যা ১৫১ এবং কারিগরি প্রশিক্ষণ গ্রহণকারীর সংখ্যা ৮০।
 
এখানে থাকছেন এমন কয়েকজন কিশোর জানায়, অপেক্ষাকৃত জ্যেষ্ঠদের দাপট বেশি। তারা কনিষ্ঠদের দিয়ে কাপড় কাচা থেকে শুরু করে জোর করে যাবতীয় ব্যক্তিগত কাজ করায়। না করলে মারারও হুমকি দেয় বলে জানায় তারা।  কেন্দ্রের এক কর্মকর্তা জানান, নির্ধারিত সরকারি  ডাক্তার না থাকায় অসুস্থ হওয়া কিশোরদের চিকিত্সার অসুবিধা রয়েই গেছে। এছাড়া পুলিশের হাতে আটক এবং অভিভাবকদের আবেদনের মাধ্যমে আসা কিশোরদের আলাদা আবাসন ব্যবস্থা নেই। ফলে অপরাধ করে আসা কিশোরদের সঙ্গে স্বাভাবিক কিশোরদের বিবাদ লেগেই থাকে। কেন্দ্রে দৈনিক পত্রিকাও সরবরাহের ব্যবস্থা নেই। কিশোরদের পঞ্চম শ্রেণির পর সাধারণ শিক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা নেই। পর্যাপ্ত কিশোর আদালত না থাকায় মামলা নিষ্পত্তি নিয়েও জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
 
সমাজসেবা অধিদফতরের মহাপরিচালক গাজী মোহাম্মদ নূরুল কবির জানান, কেন্দ্রে কিছু সমস্যা এখনো আছে। সমাধান হতে সময় লাগবে। এছাড়া ঝিনাইদহ এবং জয়পুরহাটে শিগগিরই দুটো কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র করার কথা রয়েছে।