ফেসভ্যালুর নিচেও বিক্রি হচ্ছে না শেয়ার

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, ২৩:২০

পুঁজিবাজারে মন্দা যেন ছাড়ছেই না। লেনদেন কিংবা সূচক কোনো কিছুতেই ইতিবাচক প্রবণতা টিকছে না। কয়েকদিন লেনদেন ভালো হয় তো কয়েকমাস লেনদেন পরিস্থিতি থাকে খুবই খারাপ। সূচকেও একই পরিস্থিতি। বাজার মন্দা এতটাই তীব্র যে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ২১টি কোম্পানির শেয়ার গায়ের দরেও (ফেসভ্যালু) বিক্রি হচ্ছে না। এরমধ্যে কিছু কোম্পানি মুনাফা করার পরও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। আর বেশ কিছু কোম্পানির শেয়ার বিক্রি হচ্ছে একেবারে গায়ের দরে। এর বাইরে মিউচুয়াল ফান্ড খাতের পরিস্থিতি খুবই করুণ। তালিকাভুক্ত ৪৩টি মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ৩১টির ইউনিট বিক্রি হচ্ছে গায়ের দরের চেয়ে অনেক কমে।

 
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে সবচেয়ে ভালো কোম্পানি হিসেবে ব্যাংকগুলোকে বিবেচনা করা হয়। অথচ বর্তমানে ব্যাংকের শেয়ারদরেরই সবচেয়ে করুণ অবস্থা। ৮টি ব্যাংকের শেয়ারদর বর্তমানে ফেসভ্যালুর নিচে অবস্থান করছে। এসব ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, কোম্পানির শেয়ারদর এত কমে যাওয়া যুক্তিসঙ্গত নয়। আর ব্যাংকগুলোর পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে ব্যাংকগুলো মুনাফা করছে। লভ্যাংশও দিচ্ছে। তাছাড়া পিই রেশিও (দাম-আয় অনুপাত) নিরাপদ। এরপরও শেয়ারদর এত কমে যাওয়ার কারণ নেই। তাই বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমই এর কারণ বলে মনে হয়।
 
বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী ইত্তেফাককে বলেন, শেয়ারবাজারে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা দ্রুত লাভ করতে চান। বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলো থেকে দ্রুত লাভ (ক্যাপিটাল গেইন) পাওয়ার সুযোগ কম। তাই এর প্রতি  মানুষের আগ্রহও কম। বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান আরও বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকিং খাতের পরিস্থিতি খুব একটা ভালো নেই। বিনিয়োগ প্রবণতা কম হওয়ায় ব্যাংকগুলোতে অলস টাকা পড়ে আছে। ঋণ প্রদানের হার কম। খেলাপি ঋণও বাড়ছে। তিন বছর আগের তুলনায় ব্যাংকের মুনাফাও কম। ফলে এ খাতে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমে গেছে। তাই বলে শেয়ারদর এতটা কমে যাওয়ার কথা নয়।
 
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্যে দেখা গেছে, ফেসভ্যালুর (১০ টাকা) চেয়ে কম দামে বিক্রি হওয়া শেয়ারের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কোম্পানি আর্থিক খাতের। এ খাতে এক্সিম ব্যাংকের শেয়ারদর ৮ দশমিক ৮০ টাকা। ন্যাশনাল ব্যাংক ৯ দশমিক ৪০ টাকা, এনসিসি ব্যাংক ৮ দশমিক ৯০ টাকা, প্রিমিয়ার ব্যাংক ৮ দশমিক ৪০ টাকা, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক ৪ দশমিক ৫০ টাকা, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক ৯ দশমিক ২০ টাকা, ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংক ৮ দশমিক ৭০ টাকা এবং প্রিমিয়ার লিজিং ৯ দশমিক ২০ টাকা। ফেসভ্যালুর চেয়ে কম দামে বিক্রি হওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে বস্ত্র খাতেরও প্রাধান্য রয়েছে। এ খাতের জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশনের শেয়ার বিক্রি হচ্ছে ৯ দশমিক ৯০ টাকা। এছাড়া অন্য কোম্পানিগুলো হলো— সোনারগাঁও টেক্সটাইল ৯ দশমিক ৯০ টাকা,  ডেল্টা স্পিনার্স ৯ দশমিক ৯০ টাকা, মেট্রো স্পিনিং ৮ দশমিক ৭০ টাকা, ম্যাকসনস স্পিনিং ৯ দশমিক ৩০ টাকা, বেক্সিমকো সিনথেটিক ৮ দশমিক ১০ টাকা এবং দুলামিয়া কটন ৭ দশমিক ২০ টাকা।
 
এসব কোম্পানির শেয়ারদর ফেসভ্যালুর নিচে থাকার কারণ সম্পর্কে ফান্ড ম্যানেজাররা বলছেন, ব্যাংক সম্পর্কে শেয়ার বিনিয়োগকারীদের আস্থা খুবই কম। ব্যাংকগুলোর দেয়া ঋণের মান এবং কু-ঋণ পরিস্থিতির কারণে ব্যাংকের শেয়ারে তারা বিনিয়োগ করতে চান না। তাই ব্যাংকগুলো মুনাফা করলেও বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ নেই। এতে ব্যাংকগুলোর শেয়ার দর ফেসভ্যালুরও নিচে নেমে এসেছে। এ ধরনের প্রবণতা ব্যাংকিং খাতের জন্য খুবই নেতিবাচক ইঙ্গিত। বস্ত্র খাত প্রসঙ্গে বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বস্ত্র খাতের কোম্পানিগুলো ভালো মুনাফা করলেও অনেক কোম্পানিই ভালো লভ্যাংশ দেয় না। কোম্পানিগুলোর এ প্রবণতার কারণে বিনিয়োগকারীরা বস্ত্র খাতের দিকে আসতে চায় না। তবে এবার এ খাতের যেসব কোম্পানি মুনাফা করতে পারছে না সে কোম্পানিগুলোর শেয়ারদর ফেসভ্যালুরও নিচে নেমে গেছে। এছাড়া মিউচুয়াল ফান্ডগুলো ভালো মুনাফা করতে না পারায় এ খাতের দিকেও আগ্রহ নেই বিনিয়োগকারীদের।
 
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোম্পানিগুলোর পারফরম্যান্সের পাশাপাশি পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন ধরে চলা মন্দাও ফেসভ্যালুর নিচে শেয়ারদর নেমে আসার কারণ। মন্দার কারণে নতুন বিনিয়োগ নেই। এখন বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে পদক্ষেপ নিতে হবে। বাজারে মন্দাভাব দূর না হলে এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ হওয়া কঠিন।
 

ডিএসইর তথ্যে দেখা গেছে, বাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে শেয়ারদর ফেসভ্যালুর নিচে রয়েছে ইউনাইটেড এয়ার ৭ দশমিক ৪০ টাকা, ফাইন ফুডস ৮ দশমিক ৯০ টাকা,  মেঘনা মিল্ক ৭ দশমিক ৩০ টাকা, মেঘনা পেট ইন্ডাস্ট্রিজ ৫ দশমিক ৭০ টাকা, শ্যামপুর সুগার মিলস ৬ দশমিক ৫০ টাকা এবং জীল বাংলা সুগার মিল ৬ দশমিক ৭০ টাকা।