ধ্বংস পার করে উত্সব

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, ০৮:৫০

২৫ এপ্রিল, ২০১৫। সবেমাত্র চঞ্চল হয়ে উঠেছে কাঠমান্ডু। আর দশটা দিনের মতো জীবন চলছিলো, ফুটবল-ক্রিকেটেরও প্রস্তুতি চলছিলো। সাধারণ এই দিনটাই তখন চোখের পলকে নেপালের ইতিহাসে করুণতম দিন হয়ে উঠলো।

৮.১ মাত্রার ভয়াবহ এক ভূমিকম্পে কেঁপে উঠলো নেপাল; কাঁপলো সারা দুনিয়া। ভয়াবহ এই ভূমিকম্পে আট হাজারেরও বেশি প্রাণ গেলো, আহত হলেন অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ। ক্রিকেট তো দূরে থাক, নেপালে জীবনেরই তখন উঠে দাঁড়ানো শক্ত ব্যাপার। নেপালের প্রধানতম ক্রিকেট ভেন্যু ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় মাঠের কাঠামো প্রায় ধসে পড়লো ভূমিকম্পে। মূল মাঠটিতে বসানো হলো ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের পুনর্বাসনের জন্য তাঁবুর সারি। এমন দেশ কী আবার উঠে দাঁড়াতে পারে?

সুদীপ অধিকারী অনেক কষ্টে আবেগ সামলে লিখেছেন, ‘আমাদের উত্তেজনা-রোমাঞ্চ আজ চরমে। আমাদের নেপালে যে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অস্বাভাবিক পরিস্থিতি চলছে, তা কাটিয়ে অবশেষে মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর একটা উপলক্ষ এসেছে। গুড লাক, বয়েস। হ্যাঁ, সেই নেপাল ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আরও অনেক ক্ষেত্রের মতো ক্রিকেট থেকেও তারা হাসির উপলক্ষ পাচ্ছে। সেই শোক, ধাক্কা কাটিয়ে যুব বিশ্বকাপকে চমকে দিয়ে, নিউজিল্যান্ডকে ছিটকে দিয়ে গতকাল কোয়ার্টার ফাইনাল খেলে ফেললো বিধ্বস্ত সেই নেপালের যুব ক্রিকেট দল। দিনশেষে ফলাফল যাই হোক, এটা ছিলো নেপালের লাখো মানুষের স্বপ্ন দেখার, ধ্বংসপুরীর মাঝে দাঁড়িয়ে আরেকটি আনন্দের কারণ খুঁজে পাওয়ার উপলক্ষ। টেলিভিশন, পত্রিকা থেকে শুরু করে অনলাইন; সব জায়গাতে নেপালী সমর্থকরা একটাই সুরে কথা বলছিলেন—ক্রিকেট দল তাদের একদণ্ডের স্বস্তি দিয়েছে।

ক্রিকেটবিষয়ক ওয়েবসাইট ক্রিকইনফোর সরাসরি সম্প্রচারে একটার পর একটা নেপালী সমর্থকদের মন্তব্য বলে দিচ্ছিলো এই উত্সবের কথা। সুয়োগ নামে এক কিশোর লিখেছেন, এই প্রথম আমার মা ক্রিকেট দেখার জন্য রাগ করছেন না; বরং তিনি কফি বানিয়ে দিচ্ছেন। বিস্ময়কর কিছু নয়। নেপাল যে বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে। হোক যুব বিশ্বকাপ। তারপরও নেপালের মানুষের কাছে গতকালকের এই কোয়ার্টার ফাইনাল ছিলো সত্যিকারের এক বিশ্বকাপের সেরা আটে খেলার আনন্দ। সেই আনন্দ এতোটাই তীব্র ছিলো যে, স্কুল-কলেজ অনেকটা ছুটির আমেজে চলে গিয়েছিলো।

সারা নেপালই ছুটির আমেজ কাটাচ্ছিলো বলে ভূমিকম্পে অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত পোখরা থেকে কিশোর লিখেছেন, ‘গুড লাক নেপাল। আমাদের তরুণদের ওপর আমাদের বিশ্বাস আছে। পুরো দেশ আজ ছুটির মতো করে উপভোগ করছে। আমি পোখরার রাস্তায় দাঁড়িয়ে সরাসরি সম্প্রচার উপভোগ করছি।’

ছুটির এই আমেজের প্রভাব পড়েছিলো স্কুল-কলেজে। স্কুলের ক্লাসরুম থেকেই অচ্যুত নামে একজন সরাসরি লিখেছেন, ‘আমি ক্লাসের লাস্ট বেঞ্চে বসে আছি। আমাদের শিক্ষকও কিছু বলছেন না। উপরন্তু তিনি আমাকে স্কোর জিজ্ঞেস করছেন। আমরা মুখে হাত দিয়ে সবাই বসে আছি।’

আবার অনেকে স্কুল, এমনকি পরীক্ষার প্রস্তুতিও একদিনের জন্য তুলে রেখেছিলেন। গনেশ তিওয়ারি যেমন বলছিলেন, ‘আমার সামনে পরীক্ষা। একদিনের জন্য পড়াশোনা ত্যাগ করা যায়, কিন্তু আমার দেশের দল যখন বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনাল খেলছে, সেটা ত্যাগ করা যায় না।’

ক্রিকেট সম্ভবত এই-ই। দিনশেষে ফলাফল বা ট্রফি নয়, ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় অর্জন, এই খেলাটিই পারে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে।