চট্টগ্রাম বন্দরের অপারেশন (পরিচালন) কার্যক্রম বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়নে গৃহীত ৩০ বছরব্যাপী মহাপরিকল্পনার খসড়া প্রতিবেদনে এ প্রস্তাব করা হয়। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বিষয়টিসহ প্রতিবেদনের আরো কিছু অংশের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করায় খসড়াটি অনুমোদন দেয়া হচ্ছে না বলে জানা গেছে।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে জার্মানির হামবুর্গ পোর্ট অব কনসালটেন্ট (এইচপিসি) ও স্থানীয় কেএস কনসালট্যান্ট যৌথভাবে এ প্রতিবেদন তৈরি করে। যা তৈরিতে সাত কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। গত বছরের জুনের শেষের দিকে খসড়াটি বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে পেশ করা হয়। কিছু বিষয়ে আপত্তি থাকায় বন্দর কর্তৃপক্ষ ফের খসড়া জমা দিতে বলে। এর পর গত সেপ্টেম্বরে এইচপিসি সংশোধিত খসড়া প্রস্তাব জমা দেয়।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের সদস্য (প্রশাসন ও প্ল্যানিং) মো. জাফর আলম বলেন, মহাপরিকল্পনার প্রস্তাব ও সুপারিশের কিছু কিছু ক্ষেত্রে আগে থেকেই আমাদের আপত্তি ছিল। পরবর্তীতে তারা আবার মহাপরিকল্পনার খসড়া জমা দেয়। কিছু দিনের মধ্যেই আমরা এগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখব। এরপর বন্দর বোর্ড সভায় অনুমোদনের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হবে।
মহাপরিকল্পনা তৈরির সঙ্গে জড়িত প্রকৌশলী আবদুর রশিদ জানান, দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে তৈরি করা মহাপরিকল্পনা বন্দর কর্তৃপক্ষ এখনো কেন অনুমোদন দিচ্ছে না তা তার জানা নেই। তিনি বলেন, আমরা আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে মহাপরিকল্পনার খসড়া তৈরি করেছি। যেসব প্রস্তাব ও সুপারিশ করেছি তা বন্দর কর্তৃপক্ষের পালন করতেই হবে এমন কোনো কথা নেই।
জানা গেছে, প্রতিবেদনে দীর্ঘমেয়াদি (৩০ বছর) বা মধ্যমেয়াদি (১০/১৫ বছর) সময়ের জন্য বন্দরের কার্যক্রম বেসরকারি পর্যায়ে ছেড়ে দেয়ার প্রস্তাব করা হয়। বন্দরের দক্ষতা তথা উত্পাদনশীলতা বাড়ানোর লক্ষ্যে এ প্রস্তাব করা হয়েছে। পার্শ্ববর্তী দেশসহ বিশ্বের উন্নত দেশের বন্দর এভাবে পরিচালিত হয়।
খসড়া প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান অবস্থার সাথে সাথে বে-কন্টেইনার টার্মিনাল ও কর্ণফুলী কন্টেইনার টার্মিনাল নির্মাণ করা গেলে আগামী প্রায় ৩০ বছর চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের কোনো সমস্যা হবে না। তবে ২০১৮ সালের মধ্যে প্রস্তাবিত কর্ণফুলী কন্টেইনার টার্মিনাল ও ২০২৩ সালের মধ্যে বে-কন্টেইনার টার্মিনালের নির্মাণ কাজ শেষ করতে হবে। ওই প্রতিবেদনে সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের বিষয়টি সামনে রেখে বলা হয়েছে, এক পর্যায়ে অতিরিক্ত ও প্রয়োজনীয় কন্টেইনার গভীর সমুদ্র বন্দরে হ্যান্ডলিং করা যেতে পারে।
প্রতিবেদনে বন্দরের অনেকগুলো সমস্যার কথা তুলে ধরা হয়েছে। একইসাথে এর কিছু কিছু সমাধানও উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দরের সীমাবদ্ধতার মধ্যে রয়েছে বন্দরে ১৯৮ মিটারের বড় এবং ৯ দশমিক ৫ মিটারের বেশি গভীরতার জাহাজ ভিড়তে পারে না। তখন ফিডার ভেসেল (ছোট জাহাজ) সর্বোচ্চ ১৫শটি কন্টেইনার নিয়ে আসতে পারে। চট্টগ্রাম বন্দরের কর্ণফুলী নদীতে ট্রাফিক বেশি। এখানে ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ৩ হাজার নৌযান চলাচল করে। এখানে রপ্তানি পণ্যবাহী কন্টেইনার কোনো প্রকার সিস্টেমের মধ্যে না এসে সরাসরি জাহাজে লোড করা হয়। এতে করে জাহাজকে কার্গোর জন্য অপেক্ষা করতে হয়। এইচপিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, এর জন্য জাহাজকে ৩০ ঘণ্টা পর্যন্তও বসে থাকতে হয়। যদিও চট্টগ্রাম বন্দর তাদের এ পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে ভিন্ন মত পোষণ করে বলে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান। চট্টগ্রাম বন্দর বলে আসছে- একটি জাহাজকে প্রায় ৬ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। এইচপিসির রিপোর্টে এর সমাধান হিসেবে বলেছে, রপ্তানি কার্গো বন্দরে চালু কন্টেইনার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের (সিটিএমএস) অধীনে এনে সরাসরি জাহাজে লোডের বর্তমান পদ্ধতি থেকে সরে আসলে জাহাজের দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার প্রয়োজন পড়বে না। এর জন্য রপ্তানি কার্গোসমূহ বাইরের ইয়ার্ডে এনে সংরক্ষণ করে পরবর্তীতে নির্দিষ্ট সময়ে জাহাজে লোড করা যেতে পারে।
এইচপিসির প্রতিবেদনে সাধারণ কার্গো বার্থে (জিসিবি) বর্তমানে অতিরিক্ত পণ্য হ্যান্ডলিং করা হচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।
তাছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরের ভেতর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নেই। প্রতিদিন কয়েক হাজার ট্রাক ও কয়েক হাজার মানুষ আসা-যাওয়া করে থাকে। এটা সম্পূর্ণ এলোমেলো হয়ে থাকে। বিভিন্ন সময় এর জন্য দুর্ঘটনা হয়ে থাকে বলে বন্দরের পক্ষ থেকেও স্বীকার করা হয়। প্রতিবেনে বলা হয়েছে, বন্দরের ভেতর কন্টেইনার ফ্রেইট স্টেশন (সিএফএস) সুবিধা বন্ধ করতে হবে। কন্টেইনারবাহী পণ্যসমূহকে বন্দরের ভেতর না খুলে বাইরে ইয়ার্ডে খুলে পণ্য নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এতে করে হাজার হাজার ট্রাক ও লোকজনের গমনাগমন বন্ধ হবে। জানা যায়, ওয়ান ইলেভেনের সময় বন্দরের বাইরে নর্থ ইয়ার্ডে কন্টেইনার খুলে পণ্য সরবরাহ দেয়া হতো।
এইচপিসির রিপোর্টে বলা হয়, বন্দরের তথ্য প্রযুক্তি পদ্ধতি (আইটি সিস্টেম) একজন প্রধান তথ্য কর্মকর্তার অধীনে সমন্বয় সাধন করে এক স্থান থেকে পরিচালিত হতে হবে। চালু সিটিএমএস আংশিকভাবে কাজ করছে। এর অধীন যেমন রপ্তানি কন্টেইনার নেই। একই সাথে গেটগুলো এর সাথে সমন্বয় করা হয়নি। এতে বলা হয়, সিটিএমএস রিয়েল টাইম মুডে ব্যবহার করা হয় না। সিডিএমএস বর্তমানে ব্যবহার উপযোগিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এর হার্ডওয়্যার দুর্বল ও পুরাতন। এটাকে অবিলম্বে যুগোপযোগী করতে বলা হয়েছে।
