এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও মেলায় দেখা নেই জনপ্রিয় লেখকদের। মেলায় এসে বই কেনার পাশাপাশি জনপ্রিয় লেখকের সঙ্গে দেখা করবার ইচ্ছাও থাকে পাঠকদের। সেটা এখন পর্যন্ত পূরণ হয়নি। হাসান আজিজুল হক, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, ইমদাদুল হক মিলন আসেননি। প্রায় কারোর দেখা নেই। সেলিনা হোসেন এসেছিলেন এক মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে কিন্তু মেলায় দেখা যায়নি। কবি নির্মলেন্দু গুণ গতকাল মেলা শেষের বেলায় এক ঝলক দেখা গেছে। কবি উপন্যাসিক আনিসুল হক এসেছেন দুই একবার। পাঠকদের মন ভরে এমন করে কেউ থাকছেন না মেলায়। বই কিনে পাঠকরা লেখকদের খুঁজে হয়রান।
সোহরাওয়ার্দীর বড় পরিসর, সুন্দর ছিমছাম পরিবেশ। শুরু থেকেই মেলায় দর্শনার্থীর সংখ্যা একেবারে কম নয়। প্রথম সপ্তাহে সবসময়ই মানুষের সমাগম কম থাকে মেলায়। তবে এবছর শুরু থেকেই জমে উঠবার আভাস।
তাম্রলিপির স্টল থেকে মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘ক্রেনিয়াল’ কিনলেন ভিকারুননিসা স্কুলের ছাত্রী অরণি মাহমুদ। কিন্তু তার প্রিয় লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবাল আসছেন না– সেই অভিযোগ কণ্ঠে তার।
এদিকে, দর্শনার্থী বাড়ার সাথে বাড়ছে মেলার বেচাকেনাও। মেলার সপ্তম দিনে বেশ ছিমছাম পরিবেশে মেলায় ঘুরে ঘুরে বই কিনেছেন পাঠকরা। প্রকাশকরা খুশি। প্রকাশকরা অনেকে বললেন, ‘আসলে মেলায় উপচেপড়া ভিড় থাকলেই বিক্রি ভালো হয় তা নয়। হালকা মেলায় বিক্রিটা বেশ ভালো হয়। তারপরও আমরা চাই, মেলায় পাঠকরা আসুক, বই কিনুক। পাঠকের আনাগোনায় মেলা গম গম করছে– এটা দেখতেও ভালো লাগে।
গতকাল বইমেলায় এসেছিলেন কবি অসীম সাহা। মেলা নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা প্রতিবারই বলছি প্রাণের মেলা। কিন্তু আমার কাছে মনে হয় মেলা এখন বিনোদনের জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। রাজধানীতে বিনোদনের অভাব বলে অনেকেই মেলায় ছুটে আসেন। এখনও পর্যন্ত আমার কাছে ক্রেতার সংখ্যা কম বলেই মনে হলো। মেলার স্টল বিন্যাস ভালো হয়নি। এলোমেলোভাবে ছড়ানো-ছিটানো।’
গতকাল মেলায় প্রকাশনা সংস্থা অবসর পৃথক পৃথকভাবে প্রকাশ করেছে ৫ খ্যাতিমান কবির ‘নির্বাচিত সেরা সাত’ শিরোনামের গ্রন্থ। লেখকেরা হলেন শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, আল মাহমুদ, আহসান হাবীব ও নির্মলেন্দু গুণ।
মন্দিরের গেট প্রবেশদ্বার হিসেবে খুলে দেওয়ার দাবি প্রকাশকদের
মেলার শিশু চত্বরসহ রমনা কালী মন্দির সংলগ্ন এলাকায় রয়েছে অর্ধশতাধিক প্রকাশনা সংস্থা। যার মধ্যে রয়েছে অন্বেষা প্রকাশনী, বাংলাপ্রকাশ, যুক্ত, শিল্পতরু, ঘাসফুল, হাওলাদার প্রকাশনী, রাবেয়া বুকস, ধ্রুবপদ, পাললিক সৌরভ, বইপত্র প্রকাশন, উত্তরণ, রাত্রি প্রকাশনী, শোভাপ্রকাশ, নওরোজ কিতাবিস্তান, পার্ল পাবলিকেশনসসহ নামকরা বেশ কয়েকটি প্রকাশনা সংস্থা। প্রকাশকরা জানান, মেলার সপ্তম দিন পার হলেও এ এলাকায় বরাদ্দকৃত স্টলগুলোতে বিক্রিই হয়নি তেমন। এর কারণ হিসেবে তারা রমনা কালী মন্দির গেটকে প্রবেশদ্বার না করে বাহিরগেট বাইরের গেট করাকে দায়ী করেন। এ বিষয়ে গতকাল মেলার হুমায়ূন আহমেদ চত্বরে প্রকাশকরা প্রতিবাদ জানান একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খানের কাছে। এদিকে, এখানকার বেশ কিছু প্রকাশক লটারিতে বরাদ্দ হওয়ার পরে স্বেচ্ছায় এই জায়গাগুলো বেছে নিয়েছিলেন। এখন গেট বন্ধ হওয়ায় তাদের অতি লোভে তাতি নষ্ট’ দশা। কারণ প্রবেশ দ্বার না হয়ে বের হওয়ার পথ হওয়ায় মানুষ বের হওয়ার মুখে এসব স্টলের কাছে আসছে। যার কারণে এই প্রকাশকদের বিক্রিতে ভাটার টান।
অন্বেষা প্রকাশনীর শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘বইমেলার যে ম্যাপটি করা হয়েছিল, সেখানে মন্দিরের গেটটি ছিল প্রবেশপথ। কিন্তু মেলার শুরু থেকে সেটি ব্যবহূত হচ্ছে বহির্গমন পথ হিসেবে। এতে শিশুচত্বরসহ মন্দির এলাকায় যেসব স্টল পড়েছে, সেখানে ক্রেতা-পাঠকদের আগমন নেই বললেই চলে। এবার এখনও তেমন বিক্রিই হয়নি। আমাদের দাবি, মন্দিরের গেটটি প্রবেশদ্বার হিসেবে খুলে দেয়া হোক।’
প্রকাশকদের দাবির পরিপ্রক্ষিতে শামসুজ্জামান খান বলেন, ‘ম্যাপে মন্দিরের গেটটি প্রবেশদ্বার হিসেবে ছিল এটি ঠিক। কিন্তু আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পরামর্শে এটিকে নির্গমণপথ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রকাশকরা যে দাবি করেছেন সে ব্যাপারে এখনই কোনো সিদ্ধান্ত দেয়া ঠিক নয়। এটা আমাদের ব্যাপার না। নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যাপার।’
বাংলা একাডেমির নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন
বাংলা একাডেমি কর্তৃক সম্প্রতি প্রকাশিত ‘সালাহ্উদ্দীন আহ্মদ সংবর্ধনাগ্রন্থ’-এর মোড়ক উন্মোচন হয় বিকাল সাড়ে ৪টায়, সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যান অংশের হুমায়ূন আহমেদ চত্বরে। মোড়ক উন্মোচনে অংশ নেন বাংলা একাডেমির সভাপতি ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান, বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন ও বিশিষ্ট গবেষক অধ্যাপক ড. গোলাম মুরশিদ।
গ্রন্থটির সম্পাদনা করেছেন আনিসুজ্জামান, শামসুজ্জামান খান ও সিরাজুল ইসলাম।
এক সপ্তাহে মেলায় যত বই
এবারের মেলার প্রথম সপ্তাহে নতুন বই এসেছে ৬৯২টি। যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি কবিতার বই এসেছে ১৫৯টি। এ ছাড়া উপন্যাস ১২৭, গল্প ১১৫, প্রবন্ধ ৪৩, গবেষণা ১০, ছড়া ২৫, শিশুতোষ ৩১, জীবনী ১১, রচনাবলি ১, মুক্তিযুদ্ধ ১৩, নাটক ১, বিজ্ঞান ১৩, ভ্রমণ ১১, ইতিহাস ১১, রাজনীতি ৪, স্বাস্থ্য ৫, কম্পিউটার ২, রম্য/ধাঁধা ৪, ধর্মীয় ৮, অনুবাদ ১, অভিধান ৬, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি ৬ এবং অন্যান্য বিষয়ের ওপর এসেছে ৮৫টি।
নতুন বই
একাডেমির তথ্যানুযায়ী গতকাল রবিবার মেলার সপ্তম দিনে নতুন ১১৮টি বই এসেছে। এর মধ্যে গল্প ১৪, উপন্যাস ২০, প্রবন্ধ ৮, কবিতা ৩৩, গবেষণা ৯, ছড়া ৩, শিশুসাহিত্য ৩, জীবনী ২, মুক্তিযুদ্ধ ৪, ভ্রমণ ২, ইতিহাস ২, রম্য/ধাঁধা ৪, ধর্মীয় ২, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি ২ এবং অন্যান্য বিষয়ের ওপর বই এসেছে ১৯টি।
নতুন আসা বইগুলোর মধ্যে রয়েছে মাওলা ব্রাদার্স থেকে মুস্তাফা মজিদের ‘কবিতা সমগ্র’, অন্যপ্রকাশ থেকে জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের ‘অমল তরণী তার’, চারুলিপি থেকে সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ‘যখন সাংবাদিক ছিলাম’, লিটল ম্যাগাজিন ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’, শামসুর রাহমানের ‘নির্বাচিত সেরা সাত’, আল মাহমুদের ‘নির্বাচিত সেরা সাত’, নির্মলেন্দু গুণের ‘নির্বাচিত সেরা সাত’ ও হরিশংকর জলদাসের ‘কসবি’, অবসর; যতীন সরকারের ‘সাঁকো বাঁধার প্রত্যয়’ ও মুনতাসীর মামুনের ‘ষড়যন্ত্রের রাজনীতি দুই’, কথা প্রকাশ; হাসান আজিজুল হকের ‘দ্য ফায়ার বার্ড’ ও শাকুর মজিদের ‘মাহিউবার গেন্দাকুল কিংবা ফৌজদারের হাটের মেরিগোল্ড’, পাঞ্জেরি; আখতার হোসেনের ‘ভোজের ভোজবাজি’, ময়ূরপঙ্খী; আলম তালুকদারের ‘ষোলো কোটির ভোট’ ও সাইদ হাসান দারার ‘উপাখ্যান : মুজিব ইয়াহিয়া ভুট্টো এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ’, পারভেজ চৌধুরী অনূদিত ‘কানাডার সমকালীন কবিতা’, সময় প্রকাশন; পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ইটিং বিটিং’, বটেশ্বর বনণ; আমিনুর রহমান সম্পাদিত ‘পৃথিবী সেরা সমকালীন চার কবির কবিতা’, অ্যাডর্ন; আনিসুল হকের ‘গুড্ডুবুড়ার হাসির কাণ্ড গুড্ডুবুড়ার দারুণ কীর্তি’, ফরিদুর রেজা সাগরের ‘টেলিভিশনে ছোট কাকু’, অনন্যা; সুমন্ত আসলামের ‘বাউণ্ডুলে ১৫’ ও তৌহিদুর রহমানের ‘আমি তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ’, পার্ল পাবলিকেশনস; ইজাজ আহেমদ মিলনের ‘কোনখানে রাখবো প্রণাম’, বিভাস।
মূলমঞ্চের আয়োজন
বিকাল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘বাংলা একাডেমির হীরকজয়ন্তী : অনুবাদ কার্যক্রম, অতীত থেকে বর্তমান’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশিষ্ট অনুবাদক অধ্যাপক আবদুস সেলিম। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন ড. নিয়াজ জামান, অধ্যাপক কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়, ড. ফকরুল আলম এবং অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মামুন। সভাপতিত্ব করেন ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশ করে গোলাম কুদ্দুছের পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘বহ্নিশিখা’র শিল্পীরা। সঙ্গীত পরিবেশন করেন কণ্ঠশিল্পী লিলি ইসলাম, ফাহিমা হোসেন চৌধুরী, সাজেদ আকবর, সালমা আকবর, অণিমা রায়, শরীফ মো. সজীব।
আজকের আয়োজন
সোমবার বিকাল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘বাংলা একাডেমির হীরকজয়ন্তী : পাঠ্যপুস্তক রচনা, অতীত থেকে বর্তমান’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন সুব্রত বড়ুয়া। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন রতন সিদ্দিকী, মলয় ভৌমিক ও নূরুন্নাহার মুক্তা। সভাপতিত্ব করবেন অধ্যাপক অজয় রায়। এ ছাড়া প্রতিদিনকার মতো সন্ধ্যায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
