কাগজের বই নিয়ে পাঠকদের মাঝে আবেগ কাজ করলেও বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও বইছে ই বুক-এর হাওয়া। বইমেলাতেও ই-বুক পড়বার সুবিধা নিয়ে হাজির রয়েছে বেশ কিছু স্টল। তরুণ-তরুণীদেরই বেশি আগ্রহ সেসব স্টলকে ঘিরে।
হোম ইকনোমিক্স কলেজের শিক্ষার্থী সূচনা বললেন, মোবাইলেই থাকি সারাদিন, নয়তো ল্যাপটপে। ঘরে বসেই যদি বই পাওয়ার সুবিধা থাকে। তাহলে তো বই কেনার দরকার পড়ে না। মোবাইল ফোনে অ্যাপ্স্ ডাউনলোড করে বই পড়ার সুবিধা পাওয়া যাবে। বেশিরভাগ বই বিনামূল্যে পড়বার সুযোগ থাকছে। তবে কিছু বিশেষ গ্রন্থ রয়েছে যা অল্পকিছু টাকার বিনিময়ে পড়া যাবে। ‘সেইবই’ নিয়ে মোবাইল ফোনে বই পড়বার অ্যাপস। এ পর্যন্ত ৩৯ হাজার পাঠক তাদের তালিকাভুক্ত হয়েছে। এই ‘বই ভাণ্ডারে অধিকাংশ বই বিনামূল্যে পড়া যাবে। তবে কিছু বই টাকা দিয়ে পড়তে হবে।
বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের বেঙ্গল পাবলিকেশন্সেও রয়েছে ই-বুক সেবা। বইমেলায় এখানে রেজিস্ট্রেশন করলে রয়েছে নানারকম লটারিতে পুরস্কার জিতে নেবার সুযোগ। শুধুমাত্র মোবাইল অপারেটর বাংলা লিংকের গ্রাহকদের জন্য রয়েছে ‘বইঘর’ সেবা। গুগ্ল্ স্টোর থেকে ই-বুক অ্যাপ ডাউনলোড করে বাংলা লিংক ফোন গ্রাহকরা জনপ্রিয় লেখকদের বই কম খরচে পড়বার সুযোগ পাবেন। এসব প্রতিষ্ঠানের ওয়েব লিংক—sheiboi.com, www.bengalboi.com
মওদুদ আহমদের ছেলে আমানকে নিয়ে স্মারণিক গ্রন্থ
গতকাল বইমেলায় সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের প্রয়াত ছেলে আমান মওদুদ স্মরণে একটি স্মরণিকা গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করা হয় গ্রন্থমেলার ‘নজরুল মঞ্চে’। ‘ইন লাভিং মেমরি অব আমান মওদুদ; হিজ লাইফ এন্ড আর্ট’ শীর্ষক বইটির মোড়ক উন্মোচন করেন শিল্পী মনিরুল ইসলাম। বইটি প্রকাশ করেছে পলাশ প্রকাশনী। প্রকাশনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, আমানের মা হাসনা মওদুদ, জন্টা ক্লাবের প্রেসিডেন্ট হোসনে আরা ইদ্রিস প্রমুখ। বইটিতে আমানকে স্মরণ করে লিখেছেন ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান স্যার ফজলে হাসান আবেদ। আরো লিখেছেন সারওয়াত আহমেদ, শিল্পী মনিরুল ইসলাম, কণক চাঁপা চাকমা ও খালিদ মাহমুদ মিঠু। এছাড়া আমানের আঁকা ছবি, ভাস্কর্য ও কিছু ফটোগ্রাফ হয়েছে স্মরণিকাটিতে।
প্রকাশনা অনুষ্ঠানে শিল্পী মনিরুল ইসলাম বলেন, আমানের আঁকা ছবি, ভাস্কর্য বেশ ভালো। সে যদি অকালে মৃত্যুবরণ না করতো তাহলে সে ক্ষেত্রে নিজের প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে পারতো। কিন্তু মৃত্যু এই প্রতিভাবান ছেলেটিকে কেড়ে নিল।
মওদুদ আহমদ বলেন, এটা মেনে নেয়া কষ্টের যে সে নেই। কিন্তু তার স্মৃতি রয়েছে সেসব স্মৃতি ধরে রাখতে বইটি প্রকাশ পেল। তার আত্মা শান্তি পাক এটাই কামনা করি।
ইন্দ্রজিত্ সরকারের দুটি বই
সমকালের অপরাধ বিষয়ক নিজস্ব প্রতিবেদক ইন্দ্রজিত্ সরকারের দুইটি বই প্রকাশ পেয়েছে এবারের মেলায়। পার্ল পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত হয়েছে ‘বল্টুর ভয়ংকর অভিযান’ ও দেশ পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত হয়েছে ‘মানুষখেকোর জঙ্গলে গোয়েন্দা সপ্তক’। গতকাল মেলার ‘নজরুল মঞ্চে’ বইদুটির মোড়ক উন্মোচন করেন সমকালের নির্বাহী সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি, আমাদের সময়ের বার্তা প্রধান হুমায়ুন কবীর খোকন, সমকালের সুহূদ সমাবেশ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম আবেদ, চিত্রশিল্পী রাজীব রায়। ‘বল্টুর ভয়ংকর অভিযান’ বইটির মূল্য ২০০ টাকা। এটির প্রচ্ছ করেছেন হিরন্ময় চন্দ। ‘মানুষখেকোর জঙ্গলে গোয়েন্দা সপ্তক’ বইটির মূল্য ১৫০ টাকা।
খ্যাতিমান ৫ কবির নির্বাচিত গ্রন্থ
এবারের বইমেলায় প্রকাশনা সংস্থা অবসর থেকে প্রকাশিত হয়েছে পাঁচ খ্যাতিমান কবির ‘নির্বাচিত সাত’ শিরোনামের বই। খ্যাতিমান পাঁচ কবি হলেন শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, আহসান হাবীব, সৈয়দ শামসুল হক ও নির্মলেন্দু গুণ। ‘শামসুর রাহমানের নির্বাচিত সাত’ গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’, ‘রৌদ্র করটিতে’, ‘নিজ বাসভূমে’, ‘বন্দি শিবির থেকে’, ‘মাতাল ঋত্বিক’, ‘নিবালোকে দিব্যরথে’ ও ‘না বাস্তব, না দুঃস্বপ্ন’। ‘আল মাহমুদের নির্বাচিত সাত’ গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে-‘লোক লোকান্তর’, ‘কালের কলস’, ‘সোনালি কাবিন’, ‘মায়াবী পর্দা পুলে ওঠে’, ‘উড়াল কাব্য’, ‘বিরামপুরের যাত্রী’ ও ‘সেলাই করা মুখ’। ‘আহসান হাবীবের নির্বাচিত সাত’ গ্রন্থে রয়েছে- তার কাব্যগ্রন্থ ‘রাত্রিশেষ’, ‘ছায়াহরিণ’, ‘সারা দুপুর’, ‘আশায় বসতি’, ‘মেঘ বলেছে চৈত্রে যাবো’, ‘দুই হাতে দুই আদিম পাথর’ ও ‘বিদীর্ণ দুর্পণে মুখ’। ‘সৈয়দ শামসুল হকের সেরা সাত’ গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- ‘একদা এক রাজ্যে’, ‘বিরতিহীন উত্সব’, ‘বৈশাখের রচিত পঙক্তিমালা’, ‘প্রতিধ্বনিগণ’, ‘অপর পুরুষ’, ‘পরানের গহীন ভিতর’ ও ‘অপার্থিব তাঁতের বয়ান’। ‘নির্মলেন্দু গুণের নির্বাচিত সাত’-এ রয়েছে- ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’, ‘অমীমাংসিত রমণী’, ‘দীর্ঘ দিবস দীর্ঘ রজনী’, ‘চৈত্রের ভালোবাসা’, ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’, ‘চাষাভুষার কাব্য’ ও ‘মুঠোফোনের কাব্যসমগ্র’।
নতুন বই
বাংলা একাডেমির তথ্যানুযায়ী, মঙ্গলবার মেলার নবম দিনে প্রকাশিত হয়েছে ১১০টি নতুন বই। এর মধ্যে গল্প ২০, উপন্যাস ১৫, প্রবন্ধ ৮, কবিতা ২৮, শিশু সাহিত্য ৩, ছড়া ৫, জীবনী ৪, মুক্তিযুদ্ধ ১, নাটক ১, বিজ্ঞান ৫, ভ্রমণ ১, ইতিহাস ৩, স্বাস্থ্য ১, রম্য/ধাধা ১, অনুবাদ ১, সায়েন্স ফিকশন ৩ ও অন্যান্য ১০টি বই।
মেলায় আসা নতুন বইয়ের মধ্যে রয়েছে— সৈয়দ শামসুল হকের ‘বাবার সাথে যাওয়া ও অন্যান্য বিষয়ের গল্প’ (রাত্রি প্রকাশনী), মুনতাসীর মামুনের ‘ইতিহাসের খেরোখাতা সাত, ইমদাদুল হক মিলনের ‘গোস্টস্্ স্টোরিজ ফর ইউ ও মোস্তফা কামালের ‘সায়েন্স ফিকশন সমগ্র ২’ (অনন্যা), অসীম সাহার ‘শ্মশান ঘাটের মাঝি’ (চন্দ্রদ্বীপ), মুহাম্মদ জাহাঙ্গীরের ‘মিডিয়ার নানা কথা’, আবদুল মওদুদ অনূদিত ‘দি ইন্ডিয়ার মুসলমানস’ (মাওলা ব্রাদার্স), বিচারপতি মো. গোলাম রব্বানীর ‘বাংলাদেশের সংবিধানের বিকাশ, বৈশিষ্ট্য ও বিচ্যুতি’, বুলবুল সরওয়ার অনূদিত ‘হূদয়ে আমার মির্জা গালিব’ ও পিয়াস মজিদের ‘এলামেলো ভাবনাবৃন্দ’ (ঐতিহ্য), রাজু আলাউদ্দিন অনূদিত ‘কথাসমগ্র’ (কথাপ্রকাশ), স্বকৃত নোমানের ‘তাজউদ্দীন আহমদ’ (উত্স), রাগিব হাসানের ‘বিদ্যাকৌশল : লেখাপড়ায় সাফল্যের সহজ ফরমুলা’ ও আসিফ সিবগাত ভূঞা ‘সহজ কুরআন’ (আদর্শ), অরণ্য পাশার ‘আনন্দ আশ্রম’ (দেশ পাবলিকেশন্স), মানিক মুনতাসীরের ‘খবরের কবর’ (মনের কথা প্রকাশনা)।
মেলামঞ্চের আয়োজন
গতকাল মেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘বাংলাদেশের প্রকাশনা কার্যক্রম : অতীত থেকে বর্তমান’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আহমাদ মাযহার। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন শিল্পী রফিকুন নবী, কবি তারিক সুজাত, লেখক রেজানুর রহমান এবং পশ্চিমবঙ্গের লেখক-গবেষক ইমানুল হক। সভাপতিত্ব করেন শিল্পী হাশেম খান।
এতে হাশেম খান বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রকাশনা জগত্ ঐতিহ্যবাহী এক শিল্পক্ষেত্র। জ্ঞানান্বেষু মানুষের প্রয়োজন এবং নান্দনিক উত্কর্ষ— উভয়ের মিলিত সারাত্সারে ঐতিহ্যের পথ বেয়ে এখন তা আধুনিক রুচির সঙ্গে মিলিত হয়েছে। তবে এই প্রকাশনা জগেক আরও সমৃদ্ধ করতে আমাদের আরও বহু পথ পাড়ি দিতে হবে।’ সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ছিল সত্যেন সেন শিল্পগোষ্ঠীর শিল্পীদের পরিবেশনা। সঙ্গীত পরিবেশন করেন কণ্ঠশিল্পী নাদিরা বেগম, দিলরুবা খান, আজগর আলীম, মো. নূরুল ইসলাম, আবদুল কুদ্দুস ও মনিরা ইসলাম।
