ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪৪ কোটি টাকার উন্নয়নমূলক কাজের টেন্ডার ও কাজ বন্টনে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে আর্থিক সুবিধা পেয়ে ইবি কর্তৃপক্ষ পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ বন্টন ও কার্যাদেশ প্রদান করেছে- এমন অভিযোগ এনে সংক্ষুদ্ধ ঠিকাদাররা ইবি ভিসি অধ্যাপক ড. আব্দুল হাকিম সরকারসহ সংশ্লিষ্টদের উকিল নোটিশ পাঠিয়েছেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে ক্ষোভ ও চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে।
জানা যায়, গত বছর ৫ অক্টোবর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ৪৪ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজের টেন্ডার আহ্বান করা হয়। চার গ্রুপের ওই কাজে লট- এ তে রয়েছে আর্টস ফ্যাকাল্টি বা দ্বিতীয় সমাজ বিজ্ঞান অনুষদ। এ কাজের প্রাক্কলিত মূল্য ধরা হয়েছে ১৬ কোটি ২৪ লাখ টাকা। টেন্ডারে মোট ৫টি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান অংশ নেন। এ কাজে সর্বনিম্ন দরদাতা ছিল ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কেইএনআইজেভি। তাদের দর ছিল ৯ কোটি ৭৯ লাখ ১৩ হাজার আটশত ৩৩ টাকা। মেসার্স কোহিনূর ইন্টারপ্রাইজ এবং মডার্ন স্ট্রাকচারস (জেভি) লিমিটেড নামে একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এ কাজের জন্য ১৫ কোটি ২০ লাখ ৩৫ হাজার আটশত ৩৭ টাকা দর দেন। এই গ্রুপে কাজ পেয়েছে বাংলাদেশ ফাউন্ডারি ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমেটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান। তাদের দর ছিল ১৫ কোটি ৭০ লাখ ৬৮ হাজার ৩’শ ১২ টাকা।
লট- বি তে রয়েছে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি আবাসিক হল নির্মাণ। এ কাজের জন্য বরাদ্দ ধরা হয়েছে ১৩ কোটি ১০ লাখ টাকা। এখানে মোট ১০টি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান অংশ নেন। এ কাজের জন্য সর্বনিম্ন দরদাতা ছিল শামিম এন্টারপ্রাইজ। তাদের দর ছিল ১০ কোটি ২৫ লাখ ৭০ হাজার ছয়শত টাকা। কিন্তু এ কাজটি প্রদান করা হয়েছে ইনফিনিটি নামে একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে। তাদের দর ছিল ১১ কোটি ৭৩ লাখ নয় হাজার আটশত ২৭ টাকা। কিন্তু এখানেও কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে ১৩ কোটি ১০ লাখ টাকার।
লট-সি তে মোট ১০টি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। শেখ হাসিনা হলের দ্বিতীয় ফেইজ নির্মাণের জন্য এ কাজে বরাদ্দ রয়েছে ৯ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। এখানে সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান ছিল এবিএইচ (জেভি)। তারা ৭ কোটি ৬১ লাখ টাকা দর দেয়। কিন্তু ৯ কোটি ৭৮ লাখ টাকায় এ কাজের কার্যাদেশ পেয়েছে প্রকৌশলী নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। গত ২ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ওই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যাদেশ প্রদান করেন।
লট-ডি তে রয়েছে গেস্ট হাউজের তৃতীয় ও চতুর্থতলা নির্মাণ কাজ। এখানে বরাদ্দ রয়েছে এক কোটি ৬৮ লাখ টাকা। এ কাজের বিষয়ে এখনও নিস্পত্তি হয়নি। তবে এখানে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসাবে রয়েছেন মেসার্স আতাউর রহমান। তারা ১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা দরপত্র জমা দিয়েছে।
উকিল নোটিশের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফরিদুল ইসলাম উল্লেখ করেন যে, আমার মক্কেলগণ (ঠিকাদার) দরপত্রের শর্ত যথাযথভাবে পালন করে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসাবে টেন্ডার দাখিল করেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়ম উপেক্ষা করে সর্বনিম্ন দরদাতা ঠিকাদারদের কাজ দেননি। টেন্ডার ও কার্যাদেশ প্রদানে অনিয়ম করার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ কোটি ৫২ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে উকিল নোটিশে উল্লেখ করা হয়। টেন্ডার ও কাজ বন্টনে অনিয়মের অভিযোগে মেসার্স কোহিনূর ইন্টারপ্রাইজ এবং মডার্ন স্ট্রাকচারস্ (জেভি) লিমিটেডের প্রতিনিধি আনিছুর রহমান বিকাশ, মেসার্স টিই এন্ড জেএস (জেভি) প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি শামসুজ্জামান তুহিন ও মেসার্স এমএন এন্ড ই এইচ (জেভি) প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী ইহসানুল হকের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফরিদুল ইসলাম গত ৬ ফেব্রুয়ারি উকিল নোটিশ পাঠিয়েছেন।
উকিলনোটিশ প্রাপ্তরা হলেন, শিক্ষা সচিব, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার, প্রধান প্রকৌশলী, ডিন, ব্যবস্থপনা বিভাগ ও টিইসি-১ কমিটির সভাপতি, অর্থ ও হিসাব বিভাগের পরিচালক, পরিকল্পনা বিভাগের পরিচালক, নির্বাহী প্রকৌশলী ও কুষ্টিয়া এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী। জনস্বার্থে ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ক্ষতি ঠেকাতে উকিল নোটিশ পাঠানো হয়েছে বলে ওই ঠিকাদাররা জানান। অনিয়ম বন্ধ ও কার্যাদেশ বাতিল না করা হলে উচ্চ আদালতে রীট করা হবে বলেও জানিয়েছেন সংক্ষুব্ধ ঠিকাদাররা।
এদিকে উন্নয়ন কাজে টেন্ডারের অনিয়মকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে চাপা অসন্তোষ বিরাজ করছে। ছাত্রলীগের ইবি শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক শামসুজ্জামান তুহিন একটি কাজে সর্বনিম্ন দরদাতা ছিলেন। নিয়ম অনুযায়ী ওই কাজটি তার পাওয়ার কথা থাকলেও তাকে কাজটি দেয়া হয়নি। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাস অশান্ত হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এ ব্যাপারে জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী মকবুল হোসেনের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি চরম ক্ষিপ্ত হয়ে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন এবং বিষয়টি নিয়ে কোন কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান। ইবি’র প্রোভিসি অধ্যাপক ড. শাহিনূর রহমান জানান, টেন্ডার প্রক্রিয়ার সাথে তার কোন সংশ্লিষ্টতা নেই, তাই এ ব্যাপারে তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজী হননি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার এসএম আব্দুল লতিফ জানান, টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটির মতামতের ভিত্তিতে তিনটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে ইতিমধ্যে কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে নিয়মের কোন ব্যত্যয় ঘটলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন উপদেষ্টামণ্ডলীর মতামতের ভিত্তিতে কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। এ ব্যাপারে ভিসি অধ্যাপক ড. আব্দুল হাকিম সরকারের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, টেন্ডার প্রক্রিয়া ও কার্যাদেশ প্রদানে কোন অনিয়ম হয়নি। টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটির সদস্যদের যাচাই-বাছাই ও সুপারিশের ভিত্তিতে কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীর দেয়া উকিল নোটিশ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন উপদেষ্টাগণ আইনগত আইনী বিষয়টি পর্যালোচনা করে তা নিষ্পত্তি করবেন।
