কাঁদছে সুন্দ্রাটিকি গ্রাম

আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, ২৩:২৭
হবিগঞ্জে ৪ স্কুল ছাত্রকে নৃশংসভাবে খুনের ঘটনার পর ঘটনাস্থল বাহুবলের সুন্দ্রাটিকি গ্রাম এখন শোকে মুহ্যমান। নিহতদের পরিবার ও স্বজনদের ঘরে ঘরে উঠছে কান্নার রোল। জেলার সর্বত্র এই খুনের ঘটনা ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। চার শিশুর এই মর্মান্তিক মৃত্যুতে অনেকেই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। অভিভাবকরা সন্তানদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠাতেও ভয় পাচ্ছেন।
 
নিখোঁজের পাঁচ দিন পর গত বুধবার স্থানীয় একটি বালুচর থেকে ওই শিশুদের লাশ উদ্ধার করা হয়। ওই দিন বিকালে হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতাল মর্গে লাশের ময়নাতদন্ত করা হয়। চিকিত্সকরা জানিয়েছেন, ৭২ ঘণ্টা আগে শিশুদের শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া প্রত্যেকের শরীরেই ভোঁতা কোনো অস্ত্রের আঘাতের আলামত পাওয়া গেছে।
 
রাতে সুন্দ্রাটিকি গ্রামের মাঠে নামাজে জানাজার পর স্থানীয় গোরস্থানে পরস্পর চাচাতো ভাই ওই চার শিশুকে দাফন করা হয়। এই ঘটনায় নিহত মনির মিয়ার পিতা আবদাল মিয়া বাদী হয়ে মঙ্গলবার রাতেই অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে অপহরণ মামলা করেছিলেন। এদিকে ঘটনার সাথে জড়িত সন্দেহে গ্রেফতারকৃত একই গ্রামের আব্দুল আলী ওরফে বাগাল (৫৫) ও তার পুত্র জুয়েল মিয়াকে (২৫) গতকাল বৃহস্পতিবার হবিগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কাওসার আলমের আদালতে হাজির করে ১৫ দিনের রিমান্ডের আবেদন করে পুলিশ। আদালত আসামিদের ১০ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এছাড়া এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে আরো তিনজনকে পুলিশ আটক করেছে বলে জানা গেছে।
 
গতকাল সুন্দ্রাটিকি গ্রামের প্রবেশপথে সুন্দ্রাটিকি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার পর দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি খুবই নগণ্য। নিহত শিশুদের সহপাঠীরা শোকে স্তব্ধ হয়ে আছে। জানা গেছে, অজানা শঙ্কায় অধিকাংশ শিশুকেই স্কুলে পাঠাননি অভিভাবকরা। এ ব্যাপারে সহকারী শিক্ষক শাহজাহান তালুকদার জানান, এই স্কুলের শিক্ষার্থী চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র তাজেল মিয়া (১০), ২য় শ্রেণির শিক্ষার্থী জাকারিয়া আহমেদ শুভ (৮) এবং ১ম শ্রেণির ছাত্র মো. মনির মিয়া (৭) নিখোঁজ হওয়ার পর গত শনিবার থেকেই আতঙ্কে শিক্ষার্থীরা স্কুলে আসা অনেকটাই বন্ধ করে দিয়েছে। স্কুলের মোট ৩৫২ শিক্ষার্থীর মধ্যে বৃহস্পতিবার মাত্র ২৮ জন উপস্থিত ছিল। এ সময় শিক্ষিকা নাজমুন নাহার ও নুরে জান্নাতও উপস্থিত ছিলেন। বিমর্ষ ও শোকাহত শিক্ষকেরা তাদের স্কুলের ৩ শিক্ষার্থী খুনে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
 
নিকটবর্তী আনোয়ারুল উলুম ইসলামিয়া মাদ্রাসায় যাওয়ার পর দেখা যায়, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা বারান্দায় বসে রয়েছেন। মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা সালাউদ্দিন জানান, নিহত ইসমাইল (৭) নুরানী ক্লাসের (১ম শ্রেণি) ছাত্র ছিল। তিনিসহ মাদ্রাসার অন্য শিক্ষকরাও এই হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার দাবি করেছেন।
 
সুন্দ্রাটিকি গ্রামে ঢুকে দেখা গেল, নিহত ৪ শিশুর বাড়ির পাশেই পুলিশ পাহারা বসানো হয়েছে। ঘরের ভিতর থেকে নারীদের বুকফাটা কান্নার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। নিহত তাজেলের বাবা আব্দুল আজিজ ও দাদী মরমচান ঘরের বারান্দায় বসে আছেন। তাদের ঘিরে দাঁড়িয়েছিলেন গ্রামবাসী ও মিডিয়াকর্মীরা। এসময় তাজেলের দাদী মরমচান তার আদরের নাতির বাংলা বই বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলেন। নিহত ইসমাইলের ঘরে গিয়ে দেখা গেল, তার মা মিনারা বেগমের মাথায় পানি ঢালা হচ্ছে। কিছুক্ষণ পরপরই তিনি মূর্ছা যাচ্ছেন। স্বজনরা কাঁদছেন। নিহত মনির ও শুভর বাড়িতে গিয়েও একই দৃশ্য দেখা গেছে। প্রসঙ্গত, নিহত ৪ শিশুর পিতাই দিনমজুরের কাজ করেন।
 
এদিকে হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক সাবিনা আলম নিহত শিশুদের প্রত্যেকের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে অনুদান দেয়ার কথা জানিয়েছেন। গ্রামবাসী জানান, গ্রেফতারকৃত আব্দুল আলী একজন প্রভাবশালী ও সমাজবিরোধী প্রকৃতির লোক। তার বিরুদ্ধে স্থানীয় পঞ্চায়েত কয়েকবার বৈঠক করে। এতে ক্ষেপে গিয়ে প্রতিপক্ষকে হয়রানি ও ক্ষতিগ্রস্ত করতে এবং আধিপত্য বিস্তারের জন্য সে এই খুনের ঘটনা সংঘটিত করে থাকতে পারে।
 
আব্দুল আলীর বাড়িতে গেলে তার পুত্রবধূ তফিনা বেগম জানান, নিহত শিশুদের মধ্যে তাদেরও আত্মীয় রয়েছে। তার শ্বশুর ও দেবরকে শিশুদের জানাজা শেষে আটক করা হয়। তিনি আরো বলেন, রুবেল (১৮) নামে তার অপর এক দেবরকেও পুলিশ আটক করেছে। এছাড়া অপর একটি সূত্রে জানা গেছে, বাচ্চু মিয়া ও আরজু মিয়া নামে আরো ২ ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে এ পর্যন্ত ৫ জনকে আটক করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে বাহুবল থানা পুলিশ।