হত্যাকাণ্ডের প্রায় ২৬ মাস পর বগুড়ায় গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠক প্রভাষক জাকারিয়া বাবু হত্যাকাণ্ডে জড়িত মূল ঘাতকসহ তিন জনকে গ্রেফতার করেছে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। গ্রেফতারকৃতরা এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে বলেও দাবি করছে পুলিশ।
স্থানীয় ছাত্রশিবির নেতাদের পরিকল্পনায় অংশ হিসেবেই জাকারিয়া বাবুকে হত্যা করা হয়েছে - পুলিশের কাছে এমনটাই স্বীকারোক্তি দিয়েছে গ্রেফতারকৃতরা। শুক্রবার রাতে বগুড়া চকসূত্রাপুর, সবুজবাগ ও জামিল নগর থেকে এ হত্যাকাণ্ডের মূল ঘাতকসহ তার সহযোগী ২ ঘাতককে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। গ্রেফতারকৃতরা হচ্ছে জেলার সারিয়াকান্দি উপজেলার নারচী তরফদার পাড়া গ্রামের মো. ইব্রাহীম ফকিরের ছেলে মাইনুর ইসলাম ফকির (২১) শিবগঞ্জ উপজেলার সাত আনা কিচক গ্রামের মোশাররফ হোসেনের ছেলে মহসিন আলী (২১) এবং সদরের সবুজবাগ এলাকার মো. বেলায়েত হোসেনের মো. হাবিবু নাঈম (১৯)।
শনিবার দুপুরে নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান জানান, ২০১৩ সালের ৯ ডিসেম্বর রাতে শহরের রেলগেট এলাকায় বাড়ি ফেরার পথে সন্ত্রাসীদের ধারালো অস্ত্রের এলোপাথাড়ি আঘাতে খুন হন বগুড়া গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠক ও শেরপুর ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক জাকারিয়া বাবু। আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের পর দীর্ঘদিন ধরে জড়িতদের চিহ্নিত করতে তদন্ত করছিলো পুলিশ। এর একপর্যায়ে গত শুক্রবার শহরের সবুজবাগ ও জামিলনগর এলাকা থেকে মাইনুর, মহসিন ও নাঈমকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় পুলিশ।
পুলিশ সুপার দাবি করেন, স্থানীয় ছাত্রশিবির নেতাদের পরিকল্পনায় বাবু হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে গ্রেফতার হওয়া ৩ জন।
পুলিশ সুপার আরো জানান, গ্রেফতারকৃতদের আদালতে সোপর্দ করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন জানিয়েছে পুলিশ।
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ৯ ডিসেম্বর রাত অনুমান ৯ টায় বগুড়া শহরস্থ সেলিম হোটেলের সামনে কয়েকজন সন্ত্রাসী কর্তৃক বগুড়া গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠক ও শেরপুর ডিগ্রী কলেজের গণিত বিভাগের প্রভাষক জিয়া উদ্দিন জাকারিয়া বাবু (৪৭) কে কুপিয়ে নির্মম ও নৃশংসভাবে হত্যা করে। নিহত প্রভাষক জাকারিয়া বাবু বগুড়া সদরের গোকুল দক্ষিণপাড়া গ্রামের মৃত ইদ্রিস আলীর ছেলে। ঘটনার দুই দিন পর ভিকটিমের ছোট ভাই সামছুদ্দিন সোলায়মান সাধু বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামীদের বিরুদ্ধে বগুড়া সদর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
ঘাতক মহসিন কর্তৃক পুলিশের কাছে দেয়া হত্যাকান্ডের বিবরণ : পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে ঘাতক মাইনুর জানায় যে, ঘটনার দিন বিকালে তার আশ্রয় দাতা ইসলামী ছাত্র শিবিরের আযিযুল হক কলেজ শাখার তৎকালীণ শীর্ষ এক নেতা তাকে জামিলনগর মোড়ে ডেকে পাঠায়। সেখানে গিয়ে সে ইসলামী ছাত্র শিবিরের ঐ নেতাসহ আরো অনেক নেতা কর্মীকে দেখতে পায়। শিবিরের শীর্ষ স্থানীয় ২ জন নেতা তাকে গণজাগরণ মঞ্চের আহ্বায়ক জিয়াউদ্দিন জাকারিয়া বাবুকে হত্যার পরিকল্পনার কথা জানায়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী ঐ দুই শিবির নেতা গ্রেফতারকৃত আসামী মো. মহসিন আলী ও আসামি মো. হাবিবুল্লাহ নাঈমকে ২টি হোন্ডাযোগে অগ্রগামী দল হিসেবে সাতমাথা থেকে শুরু করে থানা মোড়, সেলিম হোটেল ও আশপাশের এলাকায় পুলিশের কোন টহল দল আছে কিনা তা দেখার জন্য পাঠায়। মহসিন ও নাঈম উক্ত এলাকাগুলোতে পুলিশের উপস্থিতি নাই নিশ্চিত করলে মুল পরিকল্পনাকারী ঐ দুই শীর্ষ স্থানীয় শিবির নেতা ৪টি হোন্ডাযোগে অনুমান ৭/৮জন সহযোগী কর্মীসহ ১টি ককটেল ভর্তি ব্যাগ ও কয়েকটি ধারালো চাকু নিয়ে রাত অনুমান পৌণে ৯টায় সেলিম হোটেলের সামনে উপস্থিত হয়।
এরপর শিবিরের এক নেতা মাইনুরকে একটি নেশা জাতীয় ট্যাবলেট খাওয়ায়ে তার হাতে ১টি ধারালো চাকু ধয়িয়ে দেয়। ইতোমধ্যে তার সহযোগি মহসিন ও নাঈম সেলিম হোটেলের সামনে পৌঁছে যায়। বাবু সেলিম হোটেলের পার্শ্বে অবস্থিত তৃপ্তি প্রেসে বসে ছিল। মহসিন টার্গেট বাবুর অবস্থান নিশ্চিত করার জন্য কার্ড তৈরীর নাম করে উক্ত প্রেসে প্রবেশ করে প্রেসের মালিক ও বগুড়া জেলা সেক্টরস কমান্ডার্স ফোরামের বর্তমান সভাপতি মো. মাছুদুর রহমান হেলাল এর সাথে কথা বলে বাবুর উপস্থিতি নিশ্চিত করে বের হয়ে আসে। এরপর শিবিরের অপর এক নেতা জিয়া উদ্দিন বাবুকে অনুসরণ করতে থাকে। অনুমান রাত ৯ টার দিকে বাবু সেলিম হোটেলের পার্শ্বে অবস্থিত তৃপ্তি প্রেস থেকে বের হওয়ামাত্র তাকে অনুসরণকারী শিবির নেতা তার গালে সজোড়ে থাপ্পড় মারে এবং মাইনুরকে বলে 'মার শালাকে'। ঘাতক মাইনুর সাথে সাথেই তার হাতে থাকা ধারালো চাকু দিয়ে প্রথমে পাঁজরে আঘাত করে ও পরে কানের নিচে সজোড়ে চাকু ঢুকিয়ে মোচড় মারে। বাবু মাটিতে লুটিয়ে পড়লে শিবিরের অপর নেতা কর্মীরা তাকে এলোপাথারীভাবে কুপিয়ে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে এলাকায় আতংক সৃষ্টির জন্য ১০/১৫টি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ত্রাস সৃষ্টি করে মোটরসাইকেইযোগে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। এরপর জামিলনগর মোড়ে গিয়ে উক্ত নেতা মাইনুর’কে ৩হাজার টাকা দিয়ে এক মাসের জন্য শহরের বাইরে পাঠিয়ে দেয়।
মূল ঘাতক মো. মাইনুর ইসলাম ফকিরকে জিজ্ঞাসাবাদে জানায় যে, সে ২০০৯ ও ২০১০ সালে ছাত্র শিবির পরিচালিত বগুড়া শহরের রেটিনা কোচিং সেন্টারের নৈশ্য প্রহরী (নাইট গাডর্) হিসেবে কর্মরত ছিল। পরবর্তীতে ২০১১ সাল হতে ইসলামী ছাত্র শিবির বগুড়া আযিযুল হক কলেজ শাখার শীর্ষ স্থানীয় একজন নেতার তত্ত্বাবধানে থেকে ইসলামী ছাত্র শিবির কর্তৃক আহুত হরতাল, অবরোধ ও বিক্ষোভ মিছিলসহ দলীয় বিভিন্ন কর্মকান্ডে ককটেল, পেট্রোল বোমা ও অগ্নি সংযোগসহ যাবতীয় নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়ে।
ধৃত মাইনুর ২০১৫ সালের অবরোধ চলাকালীন পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ, গাড়িতে অগ্নি সংযোগসহ যাবতীয় নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের মূল হোতা ছিল এবং সে বগুড়া শহরের বিভিন্ন স্থানে ৪ শতাধিক ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। গ্রেফতার হবার পর সে এসব ঘটনা পুলিশকে জানিয়েছে।
