মেলা যেন পেয়েছে নতুন প্রাণ

আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, ০৯:১৫
শেষ বেলায় এসে যেন নতুন করে প্রাণ পেয়েছে মেলা। পাঠকের ভিড়ে, স্টলে স্টলে বই কেনাবেচায় সরগরম মেলা। মা-বাবা ছেলেমেয়েদের নিয়ে ঘুরে ঘুরে কিনেছেন বই। কেউ কেউ ছবি তুলছেন মেলায় আসা প্রিয় লেখকের সঙ্গে, নিচ্ছেন অটোগ্রাফ। ছবি তুলছেন ভাষা শহীদদের প্রতিকৃতির সামনে দাঁড়িয়ে। বন্ধুদের নিয়ে সারাদিন ধরে মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে আড্ডা দিয়ে কাটালেন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বাংলা একাডেমি  আর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সবুজ চত্বরে ‘কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা’র দিন ফুরিয়ে আসছে। বইমেলার পর্দা নামবে আগামী সোমবার।
 
গতকাল শুক্রবার ছুটির দিনে মেলা উপচে পড়েছিল পাঠকের পদচারণায়। বিকেল পাঁচটার দিকে মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে প্রবেশের সারি ছাড়িয়েছিল একদিকে টিএসসি; অন্য দিকে দোয়েল চত্বর পর্যন্ত। দীর্ঘ সময় সারিবদ্ধ হয়ে মেলায় প্রবেশ করতে আক্ষেপ ছিল না কারও। মেলায় এখন আর ছুটির দিন বলে আলাদা করা যাচ্ছে না। পাঠক মেলায় আসছেন বই কিনতেই। সব স্টলে বই চলে এসেছে। এখনো আসছে। বিক্রিও হচ্ছে। যারা ভালো বই প্রকাশ করে তাদের তো দীর্ঘদিনের একটা পরিচিতি রয়েছেই। নতুন প্রকাশকরাও শেষবেলায় এসে বলছেন বিক্রি ভালো। শেষ সময়ে এসে পাঠকরা আর ঘুরে বেরিয়ে সময় নষ্ট করেন না, নির্দিষ্ট প্রকাশনী প্রতিষ্ঠানগুলোতে গিয়ে পছন্দের বই কিনছেন তারা।
 
প্রতিবছরই মেলা শেষের আগে সময় বাড়ানোর দাবি ওঠে। এবার ঝড়-বৃষ্টিতে ক্ষতি হওয়ায় সেই দাবিতে জোর হাওয়া লেগেছে। মেলা কর্তৃপক্ষ সময় বাড়িয়েছে। কিন্তু সেটা মনঃপূত হয়নি প্রকাশকদের। সে জন্য গতকাল বিকালে জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি সাংবাদিক সম্মেলন ডেকেছিল। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করলেন মেলা কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে। শেষ সময়ে এই সিদ্ধান্তে প্রকাশকরা খুব উচ্ছ্বসিত না হলেও আগামী বছর যেন এই সময়সীমা শুরু থেকেই বাড়ানো হয়— সেই দাবি জানালেন তারা।
 
মুখর শিশু প্রহর
শুক্রবার এবারের মেলার শেষ শিশু প্রহরে ছিলো শিশুদের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ। তাদের আগমন উপলক্ষে সকাল সাড়ে ১০টায় উন্মুক্ত হয় মেলার দ্বার। শিশুরা এক হাতে ধরে ছিল বাবা-মা কিংবা অভিভাবকের হাত, আর অন্য হাতে ধরা ছিল নতুন বইয়ের প্যাকেট। দুপুর একটা পর্যন্ত শিশুরা অভিভাবকদের হাত ধরে মেলায় প্রবেশ করে এবং নিজেদের পছন্দ মতো বই কিনে তবেই ঘরে ফিরেছে।
 
আর তাদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ ছিল সিসিমপুর বটতলা। সেখানে দারুণ আনন্দমুখর সময় পার করেছে শিশুরা।
 
অভিজিত্ স্মরণে নীরবতা পালন বাংলা একাডেমির
মুক্তচিন্তার লেখক ও ব্লগার অভিজিত্ রায়ের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে গতকাল বিকাল ৪টায় এক মিনিট নীরবতা পালন করেছে বইমেলার আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি।
 
এ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের জন্য মেলার তথ্যকেন্দ্র থেকে সবাইকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। বিকালে মেলার মূলমঞ্চের আলোচনা সভার আগে একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান এক মিনিট নীরবতা পালনের কর্মসূচির ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, মৌলবাদী-সাম্প্রদায়িক চক্র মুক্তবুদ্ধির লেখকদের হত্যার মধ্য দিয়ে দেশে অন্ধকারের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তাদের অপতত্পরতার বিরুদ্ধে আমাদের সবাইকে সোচ্চার হতে হবে।
 
নীরবতা পালন ছাড়াও মেলার দুই মঞ্চের পাশে কালো দুইটি ব্যানার লাগানো হয়। এতে লেখা ছিল, ’গত বছরের এই দিনে অভিজিত্ রায়ের নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানাই। অবিলম্বে হত্যাকারীদের গ্রেফতার ও বিচার দাবি করছি।’
 
প্রকাশকরা আয়োজন করতে চায় বইমেলা
আগামী বছর থেকে অমর একুশে বইমেলা আয়োজনের দায়ভার প্রকাশকদের হাতে ছেড়ে দেয়ার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি। মেলার বাকি তিন দিন সকাল ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চালু রাখা এবং বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত প্রকাশকদের ক্ষতিপূরণের দাবিও জানিয়েছে প্রকাশকদের সর্বোচ্চ এ সংগঠনটি।
 
গতকাল মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশের মোড়ক উন্মোচন মঞ্চে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে এ দাবি জানান সমিতির সভাপতি ওসমান গণি। এ সময় লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সমিতির সাবেক নির্বাহী পরিচালক মিলনকান্তি নাথ। আরও বক্তব্য রাখেন অনন্যা প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী মনিরুল হক ও চারুলিপি প্রকাশনের হুমায়ূন কবির। লিখিত বক্তব্যে মেলার নানা অসঙ্গতি তুলে ধরা হয়।
 
এ প্রসঙ্গে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান জানান, তাদের এ উদ্যোগকে আমি স্বাগত জানাই। তারা যদি সত্যিই এ দায়িত্ব নিতে চান, সেটি খুবই ভালো হবে।
 
নতুন বই
একাডেমির তথ্যমতে গতকাল নতুন বই এসেছে ১৯৬টি। এর মধ্যে রয়েছে হুমায়ূন আহমেদের ’শ্রেষ্ঠ রোমান্টিক উপন্যাস’ ও সৈয়দ আনোয়ার হোসেনের ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চা’ (অনুপম প্রকাশনী), যতীন সরকারের ‘বাংলার লোক সংস্কৃতি বিষয়ক প্রবন্ধ’ (চর্চা গ্রন্থপ্রকাশ), ইমদাদুল হক মিলনের ‘যত ভালবাসা পাই’ ও ‘মেঘবালিকা’ (পুঁথি নিলয়), আনোয়ারা সৈয়দ হকের ‘দশ রঙের ছড়া’ (চন্দ্রছাপ), এ কে এম শহিদুল হকের ‘আমার পাঁচ মিশালী গান’ (জাতীয় গ্রন্থপ্রকাশ), ফয়জুল আলম পাপ্্পুর ‘এসো বানান শিখি’ (আপন প্রকাশ), খান চমন-ই-এলাহির ’ভূমিকণ্যা’  (দেশ পাবলিকেশন্স)।
 
নাজমা পারভিনের কাব্যগ্রন্থ ’অদ্ভুত এইসব হালচাল’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. বিশ্বজিত্ ঘোষ।
 
মেলামঞ্চের আয়োজন
গতকাল বিকেলে মেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘২০২১ সালের বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন ড. খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ, ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল এবং রাশিদ আশকারী। সভাপতিত্ব করেন শিক্ষাবিদ অধ্যাপক এ. কে. আজাদ চৌধুরী। এর আগে অমর একুশে উপলক্ষে একাডেমি আয়োজিত শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন, সংগীত, সাধারণ জ্ঞান ও উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের পুরস্কার প্রদান করা হয়।