বাঁশ-বেতের হস্তশিল্প, লুঙ্গি-গামছা-চাদর তৈরিসহ তাঁতজাত বস্ত্র তৈরি, পাটজাত পণ্য, রকমারি বিস্কুটসহ খাদ্যপণ্য তৈরি, রান্নার কাজ, ইলেক্ট্রিক কাজ, সেলাই (দর্জি) ও লন্ড্রিসহ বিভিন্ন কাজে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারের বন্দিদের। এসব প্রশিক্ষণ তাদের স্বাবলম্বী হওয়ার দ্বার খুলে দিচ্ছে। বিভিন্ন মামলায় সাজাপ্রাপ্ত বন্দি-কয়েদিদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গড়ে তোলা হচ্ছে নিপুণ কারিগর হিসেবে।
অপরাধীদের মানসিকতার পরিবর্তন ও কর্মক্ষম করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে কুমিল্লা কারা কর্তৃপক্ষ বেশ সফলতা অর্জন করেছে। অশিক্ষিত বন্দিদেরকে প্রদান করা হচ্ছে ধর্মীয় ও গণশিক্ষা। খেলাধুলাসহ বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ড তো আছেই। ‘রাখিব নিরাপদ, দেখাব আলোর পথ’— এ স্লোগান যেন পূর্ণতা পেয়েছে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে।
কারা সূত্রে জানা যায়, ১৭৯২ সালে ৬৭ একর জায়গার উপর কুমিল্লা জেলা কারাগারের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৬২ সালে এ কারাগারকে কেন্দ্রীয় কারাগারে রূপান্তর করা হয়। ১ হাজার ৭৪২ জন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন এ কারাগারে গড়ে প্রতিদিন পুরুষ-মহিলাসহ আড়াই সহস্রাধিক হাজতি-কয়েদি অবস্থান করে থাকে। বন্দি মহিলা ও পুরুষদেরকে বিভিন্ন কাজে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। এসব কাজের মধ্যে রয়েছে কুটিরশিল্পজাত পণ্যসামগ্রী তৈরি, তাঁতের কাজ, দর্জির কাজ, চরকা কাটা, রান্নার কাজ, ইলেক্ট্রিক কাজ, লন্ড্রি কাজ ও সুস্বাদু বিস্কুট-কেক তৈরি। বন্দিরা কাঠ, বেত, বাঁশ, তাঁত, সুতা ও বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে তৈরি করছে ছোট-বড় মোড়া, চেয়ার, বাঁশ-বেতের ঝুড়ি, বাঁশের দোলনা, কলমদানিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যবহার সামগ্রী। এসব পণ্যসামগ্রী কারাগারের চাহিদা মিটিয়ে বিক্রির জন্য কারাগারের প্রধান ফটকের পাশে রয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ পরিচালিত প্রদর্শনী বা বিক্রয় কেন্দ্র। খুচরা ও পাইকারি দরে দৃষ্টিনন্দন এসব পণ্যসামগ্রী কিনতে প্রতিদিন ভিড় জমান বন্দিদের স্বজন ছাড়াও সাধারণ ক্রেতারা।
এখান থেকে কিনে নেয়া বেতের মোড়া, চেয়ার, ঝুড়ি, দোলনা, কলমদানিসহ পণ্যসামগ্রী শোভা পায় সৌখিন পরিবারের ড্রইংরুমে। বন্দিদের কর্মমুখি করা ছাড়াও ‘সুস্থ দেহে সুন্দর মন’ বিকাশের জন্য আয়োজন করা হয় গান, খেলাধুলাসহ বিনোদনমূলক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। এসব অনুষ্ঠানে বন্দিরা তাদের ইচ্ছানুযায়ী গান পরিবেশন, ব্যাডমিন্টন, ভলিবল, ক্যারাম, দাবা, লুডুসহ বিভিন্ন আয়োজনে অংশগ্রহণ করে থাকেন।
মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা-কুমিল্লা শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট নাজমুল আলম চৌধুরী নোমান বলেন, কারাগার শুধু অপরাধীদের বন্দিশালা এমনটা নয়, সময়ের প্রয়োজনে ক্রমে এতে পরিবর্তন এসেছে। বিভিন্ন অপরাধে বন্দি হাজতি-কয়েদিদের মানসিক শোধনাগার ও প্রশিক্ষিত দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করার একটি প্রতিষ্ঠানের দিকে এগুচ্ছে। কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার মো. মুজিবুর রহমান জানান, বন্দিদের সংশোধনের মাধ্যমে তাদের কর্মসৃজন করে গড়ে তুলতে কারা অভ্যন্তরে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে।
কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার জাহানারা বেগম জানান, এখানে পুরুষ ও নারী কয়েদিরা সমানভাবে হাতের কাজ করে দক্ষ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে গিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ খুঁজে পাচ্ছে।
