সুন্দরবনে সাগরতীরে ৩শ বছর আগে লবণ তৈরির নিদর্শন

আপডেট : ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, ০১:২২
সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশের বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী এলাকা ও কুয়াকাটা উপকূলে প্রায় ১১০ কিলোমিটার অঞ্চলজুড়ে ৩০০ বছর আগে লবণ চাষ হতো বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় সুন্দরবনের কটকা, নারিকেলবাড়িয়া, ছাপড়াখালী, টিয়ারচর, তিনকোনা চর, গাববুনিয়া, মাঝেরচর, মান্দারবাড়িয়া ও হলদিবুনিয়া বনাঞ্চলে পাওয়া লবণ চাষের আলামত হিসাবে ব্যবহূত চুল্লি ও পোড়ামাটির পাত্রসহ কিছু দ্রব্য পরীক্ষা করে একদল গবেষক এ বিষয় নিশ্চিত হয়েছেন। গবেষকদলের সুন্দরবনের বঙ্গোপসাগর তীরের বিভিন্ন বনভূমিতে সমুদ্রে ভূমি নিমজ্জন নিয়ে বর্তমানে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের সময় এসব পাত্রের কার্বন পরীক্ষা ও এসএল পদ্ধতিতে বয়স নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০১১ সাল থেকে জার্মানি ও বাংলাদেশের গবেষকদের সমন্বয় গঠিত একটি দল মাঠ পর্যায়ে পরীক্ষা চালিয়ে সম্প্রতি এক গবেষণাপত্রে এ তথ্য প্রকাশ করে। ধারণা করা হয় যে, তখন প্রথমে সমুদ্রের পানিকে সানড্রাই করে ব্রাইন (লোনাপানির ঘন দ্রবণ) প্রস্তুত ও পরিশোধন করা হতো। পরবর্তীতে চুল্লির ছোট ছোট পোড়ামাটির পাত্র সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে তাতে ব্রাইন পূর্ণ করে তাপ দেয়া হলে পানি বাষ্পীভূত হয়ে পরিশোধিত সাদা লবণ পাওয়া যায়। এ লবণ উত্পাদন শিল্পে তখন প্রায় ১০ হাজার জনবল নিয়োজিত থাকতো বলে গবেষকদলের সদস্য বন কর্মকর্তা মেহেদী হাসান খান গতকাল শনিবার সুন্দরবন থেকে জানান। ইংল্যান্ডের লিভারপুল থেকে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এ দেশে লবণ আমদানির স্বার্থে বৃটিশ শাসন আমলে এসব লবণ উত্পাদন কারখানা বন্ধ করে দেয়া হয়। গবেষকদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সুন্দরবনের ওই সব এলাকায় লবণচাষের আলামত হিসাবে এখনও বেশকিছু স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ রয়ে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে কমবেশি ২.৫ মিটার দীর্ঘ, এক মিটার প্রস্থ ও ১.৭ থেকে ২.২ মিটার গভীরতা বিশিষ্ট চুল্লি, পোড়ামাটির পাত্রের ভাঙা অংশ, ছাই, কয়লা ইত্যাদি। পোড়ামাটির পাত্রগুলোর ব্যাস মোটামুটি ১২ থেকে ১৮ সেমি ও গভীরতা ১১ থেকে ১৪ সেমি। পাত্রের গায়ে প্রধানত ডায়মন্ডসদৃশ নকশাসহ বিভিন্ন ধরনের নকশা রয়েছে। চুল্লিগুলো খনন করা হলে উপরিভাগ হতে বিভিন্ন স্তর পাওয়া যায়। যার মধ্যে ১০ থেকে ২০ সেমি পলি ও কাদার স্তর। পরের ৫ থেকে ১০ সেমি ভাঙা পাত্রের ধসেপড়া চুল্লির ছাদের অংশ প্রায় ২৫ থেকে ৩০ সেমি পর্যন্ত কয়লা ও ছাইয়ের স্তর রয়েছে। বর্তমানে এসব স্থানে কিছু চুল্লি ১০ সেমি থেকে ৪০ সেমি উন্মুক্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে। আরও অনেক চুল্লি মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে বলে ধারণা করা হয়।
 
বর্তমান সময়ে স্থাপনাগুলোকে কি-পয়েন্ট হিসাবে ধরে নিয়ে সমুদ্রতল হতে চুল্লিগুলোর বর্তমান গভীরতা ও অবস্থান বিবেচনায় এনে বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলের ভূমি নিমজ্জন অথবা সমুদ্র উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে কিনা সে বিষয় সুন্দরবনে মাঠ পর্যায় তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। প্রাথমিকভাবে গত ৩০০ বছরে বাংলাদেশের উপকূলে ভূমি ১৫৫ সেমি নিমজ্জিত হয়েছে বলে গবেষকদের ধারণা। বছরে এ নিমজ্জনের হার কমবেশি ৫.২ মিমি। বছরে উপকূলে সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধির হার ০.৮ মিমি। সুন্দরবনে বর্তমানে যে ১৩ সদস্যের গবেষকদল কাজ করছেন তার প্রধান জার্মানির ব্রিমেন বিশ্ববিদ্যালয়ের টিল জেজে হ্যানিবার্ট। সহযোগী হিসাবে রয়েছেন আরও তিনজন জার্মান গবেষক। গবেষকদের মাঝে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ব বিভাগের প্রধান প্রফেসর ড. সৈয়দ হুমায়ুন আক্তার, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের প্রফেসর ড. মোঃ বদরুল ইসলাম, পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-পরিচালক ও হাইড্রো-জিওলোজিস্ট ড. আনোয়ার জাহিদ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের মুহাম্মদ সোহরাব উদ্দিন, ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডব্লিউএম)’র হাইড্রোলোজিস্ট কামরুল ইসলাম এবং বনবিভাগের প্রতিনিধি সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের বন্য প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা মোঃ মেহেদী হাসান খান।