দুই দলে দুই রকম বিপত্তি

আপডেট : ০১ মার্চ ২০১৬, ০০:২৩
২২ মার্চ শুরু হচ্ছে ইউপি নির্বাচন। নির্বাচনকে সামনে রেখে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগকে পৌর নির্বাচনের মতোই বিদ্রোহী প্রার্থী সামাল দিতে নিতে হচ্ছে কঠোর পদক্ষেপ। অন্যদিকে বিএনপি ভুগছে নির্বাচনী আতঙ্কে। দলটির প্রার্থী সংকট যেমন রয়েছে, তেমনি নির্বাচন শেষ পর্যন্ত সুষ্ঠু হবে কি না তা নিয়ে বিএনপির শীর্ষ মহল শুরু থেকেই আশংকা প্রকাশ করে আসছে। যারা প্রার্থী হয়েছেন তাদের বেশিরভাগই ভীত-শংকিত আছেন কখন কি হয়। অনেকে পলাতক থেকে নির্বাচন করছেন
 
০০০০০০০
 
বিদ্রোহী ঠেকাতে আওয়ামী লীগে বহিষ্কার শুরু
 
 
আগামী ২২ মার্চ প্রথম ধাপের ৭২৬টি ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থীদের নিবৃত্ত করতে বহিষ্কারের প্রক্রিয়া শুরু করেছে আওয়ামী লীগ। গত এক সপ্তাহ ধরে বুঝিয়ে বিদ্রোহীদের বসিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলেও অধিকাংশ জায়গায় তা ব্যর্থ হয়েছে।
 
এ কারণে বিদ্রোহীদের বহিষ্কারের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে উপজেলা ও জেলা আওয়ামী লীগ বিদ্রোহীদের কাছে কারণ দর্শানোর নোটিশ গতকাল সোমবার থেকে পাঠাতে শুরু করেছে। নোটিশে আগামী ২ মার্চের মধ্যে তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে বলা হয়েছে। অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। সূত্র জানায়, বিদ্রোহীরা প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করলে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন অতিক্রম হওয়ার পরই প্রথমে তৃণমূল এবং পরে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ বিদ্রোহীদের বহিষ্কার করবে।
 
জানা গেছে, প্রথম ধাপের নির্বাচনে দুই তৃতীয়ংশ ইউপিতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর ছড়াছড়ি। স্থানীয় সংসদ সদস্যরা প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে বিদ্রোহীদের পক্ষে অবস্থান নেয়ায় শত বুঝিয়েও তাদের বসিয়ে দিতে পারছে না তৃণমূল আওয়ামী লীগ। পৌরসভা নির্বাচনে বিদ্রোহীদের স্থায়ীভাবে শাস্তি না হওয়াকেই ইউনিয়ন পরিষদে বিদ্রোহী প্রার্থী বৃদ্ধি পাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তৃণমূলের নেতারা। এছাড়া তৃণমূলে নেতাদের তীব্র প্রতিযোগিতা, তৃণমূল থেকে জনপ্রিয় প্রার্থীদের বাদ দিয়ে প্রভাবশালী নেতাদের পছন্দের ব্যক্তিদের প্রার্থী করা এবং সারাদেশে বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতাকেও কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের দু’জন সাংগঠনিক সম্পাদক ইত্তেফাককে জানান, পৌরসভা নির্বাচনে বিদ্রোহীদের স্থায়ী বহিষ্কারের ঘোষণা না হওয়ায় ইউপি বিদ্রোহীরা এখন মনে করছেন, দল সাময়িক বহিষ্কার করলেও স্থায়ীভাবে তাদের শাস্তি দেবে না।
 
এদিকে প্রথম ধাপের ইউপি নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় শেরপুরের নালিতাবাড়ীতে ১০ প্রার্থীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠিয়েছে উপজেলা আওয়ামী লীগ। শোকজপ্রাপ্ত প্রার্থীরা হলেন- নন্নী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা ও বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুল হাই আজাদ, রামচন্দ্রকুড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য খোরশেদ আলম খোকা, কাকরকান্দি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান নাজিম উদ্দিন আহমেদ, সদস্য নাজমুল হাসান ও নিয়ামুল কাউসার সোহাগ, যোগানিয়া ইউনিয়নে উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-প্রচার সম্পাদক তাকিজুল ইসলাম তারা, বাঘবেড় ইউনিয়নে ছাত্রলীগ নেতা হাসানুজ্জামান রিয়াদ, কলসপাড় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য ও বর্তমান চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক কলসপাড় ইউনিয়ন কমিটির সভাপতি ফকর উদ্দিন নয়ন।
 
আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য ও দলের কৃষি ও সমবায় বিষয়ক সম্পাদক ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, বিদ্রোহীদের বসিয়ে দিতে চেষ্টা করছে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ বলেন, দল করতে হলে দলের সিদ্ধান্ত মানতে হবে। যারা ইউপি নির্বাচনে দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে বিদ্রোহী প্রার্থী হবে তারা সাংগঠনিক সর্বোচ্চ শাস্তি পাবেন।
 
 
 
০০০০০০০০
 
আতঙ্কে বিএনপি প্রার্থীরা
 
g আনোয়ার আলদীন
 
আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়ে বিএনপির তৃণমূলে যে উত্সাহ উদ্দীপনা দেখা দিয়েছিল তা ম্লান হয়ে গেছে। মনোনয়নপত্র জমা দিতে গিয়ে সহিংস প্রতিবন্ধকতা, হুমকি-ধামকি, হামলা-মামলা আর হয়রানির শিকারের পর সর্বশেষে তুচ্ছ কারণ দেখিয়ে প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিলের ঘটনা ঘটেছে। এর ফলে প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকের এই নির্বাচন অনেক এলাকায় বিএনপির প্রার্থীদের কাছে আতঙ্কে পরিণত হয়েছে।
 
দলের দায়িত্বশীল একজন নেতা বলেন, যারা প্রার্থী হয়েছেন তাদের বেশিরভাগই ভীত ও শংকিত। নির্বাচন করবে কী, কখন কি হয় এমন আতঙ্কে অনেক প্রার্থী পলাতক রয়েছেন।
 
বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, প্রথম ধাপের নির্বাচনে ১১৪টি ইউপিতে প্রার্থী শূন্য হয়ে পড়েছে। কারণ, ক্ষমতাসীনরা বিএনপির প্রার্থীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করতে দেয়নি। অনেক জায়গায় মনোনয়নপত্র জমা দিতে দেয়নি। কোথাও আবার মনোনয়নপত্র ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। বিএনপির প্রার্থীর সমর্থনকারীকে অপহরণ করা হয়েছে। অন্তত ৫১টি ইউপিতে মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেননি দলীয় প্রার্থীরা। প্রার্থীর সমর্থক ও প্রস্তাবকারীকে জোর করে সমর্থন প্রত্যাহার এবং ফাইল থেকে কাগজপত্র সরিয়ে বাতিল করা হয় অনেকের প্রার্থিতা। কিছু জায়গায় সব নিয়ম-কানুন মেনে মনোনয়নপত্র জমা দিলেও সেটার প্রাপ্তি স্বীকার করছে না স্থানীয় রিটার্নিং কর্মকর্তা।
 
 বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, প্রথম ধাপের আতঙ্কজনক অবস্থা দেখে দ্বিতীয় ধাপে নির্বাচনে অংশগ্রহণের আগ্রহই হারিয়ে ফেলেছেন অনেক যোগ্য-জনপ্রিয় প্রার্থী। অনেক এলাকায় চাপা আতঙ্ক বিরাজ করছে। এখনই এই অবস্থা হলে নির্বাচনের দিন কি হবে তা সবাই বুঝে গেছে। কিন্তু দলীয়ভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ায় সম্ভাব্য পরিণতি জেনেও দলের প্রতি আনুগত্য দেখিয়ে তারা মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করছেন।
 
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, প্রথম দফায় মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করলেও দলের প্রত্যয়নসহ সেটা জমা দিতে পারেননি অনেকেই। জমা দিতে পারেননি জামানতের টাকা। নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়ার পর থেকেই বিএনপি প্রার্থীদের লোকজন, প্রার্থীর বাড়ি ও তাদের আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িঘর এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা করা হচ্ছে। মিথ্যা মামলায় জড়ানোর ভয়সহ নানামুখী হয়রানি করা হচ্ছে। পুলিশ প্রশাসনকে ব্যবহার করা হচ্ছে। অনেক প্রার্থী এলাকাতেই যেতে পারছেন না। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে কিভাবে তারা নির্বাচন করবেন সেটাই বুঝতে পারছেন না। নির্বাচন কমিশনের কাছে অভিযোগ করেও প্রতিকার নেই।
 
এদিকে দলের একটি সূত্র জানিয়েছে, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমাদানে বাধা এবং জোর করে প্রার্থিতা বাতিলের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তৃণমূল থেকে সংগ্রহ করে কূটনীতিকদের কাছে তুলে ধরার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি।
 
দ্বিতীয় ধাপে অনুষ্ঠেয় ৬৭২টি ইউপি নির্বাচনের মধ্যে গতকাল পর্যন্ত পাঁচ শতাধিক মনোনয়নপত্র বিতরণ করেছে বিএনপি। ঠাকুরগাঁও জেলার প্রার্থীদের দিয়ে শুরু হওয়া এ প্রক্রিয়া আজকের মধ্যেই সম্পন্ন হবে বলে জানা গেছে। গত দুদিন ধরে মনোনয়নপত্র বিতরণ করা হলেও কৌশলগত কারণে প্রার্থীদের নামের তালিকা আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমে প্রকাশ করেনি দলটি।
 
প্রার্থী মনোনয়নে অন্যতম সমন্বয়ক বিএনপির সহ-প্রচার সম্পাদক এমরান সালেহ প্রিন্স জানান, নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমাদানে বাধা এবং জোর করে প্রার্থিতা বাতিলের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তৃণমূল থেকে সংগ্রহ করার লক্ষ্যে চিঠি পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। বেশির ভাগ জায়গায় সরকারি দলের লোকজন বিএনপির প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দিতে বাধা দিয়েছে। তুচ্ছ কারণে প্রার্থিতা বাতিল করেছে। এসব তথ্য সঠিকভাবে জানতে চিঠি পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। পরে তা কূটনীতিকদের কাছে তুলে ধরা হবে।